যশোর, বাংলাদেশ || সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

‘কোচিং বাণিজ্যের’ আরেক নাম ‘অতিরিক্ত ক্লাস’

পার্থিব আহসান

প্রকাশ : সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর,২০২৬, ১০:০০ এ এম
‘কোচিং বাণিজ্যের’ আরেক নাম ‘অতিরিক্ত ক্লাস’

শ্রেণিকক্ষে নিয়মিত পাঠদানকে সংকুচিত করে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের কোচিং বাণিজ্যে যুক্ত শিক্ষকরা জিম্মি করে ফেলেছেন; যার নতুন নাম ‘অতিরিক্ত ক্লাস’। স্কুলের শ্রেণিভিত্তিক সাধারণ পাঠদানের বদলে অতিরিক্ত ক্লাসে ভর্তি হওয়া একপ্রকার বাধ্যতামূলক করে ফেলা হয়েছে।

সম্প্রতি যশোরের মধুসূদন তারাপ্রসন্ন (এমএসটিপি) বালিকা বিদ্যালয় ও কলেজে পঞ্চম শ্রেণির এক ছাত্রীকে শারীরিক নির্যাতন এবং শিক্ষার্থীদের সঙ্গে অশোভন আচরণের অভিযোগের ভিত্তিতে সুবর্ণভূমি একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন করে। ওই প্রতিবেদনটি দেখিয়ে দিয়েছে, অর্থলোভী কিছু শিক্ষকের কাছে কীভাবে নিপীড়িত হচ্ছে শিক্ষার্থীরা। বিদ্যালয়ে কোচিং বাণিজ্য ও প্রতি সপ্তাহে ৩০০ টাকা করে শিট বিক্রির মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হতো।

বর্তমানে অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই নিয়মিত শিট বিক্রি এবং অতিরিক্ত ক্লাসের ভর্তির জন্য শিক্ষার্থীদের বাধ্য করার অভিযোগ আছে। দেখার বিষয়, এই ‘অতিরিক্ত ক্লাস’ কি শিক্ষার্থীদের জন্য সম্পূর্ণ ঐচ্ছিক নাকি এতে ভর্তি হওয়া বাধ্যতামূলক?

শ্রেণিকক্ষে পাঠদানে অবহেলা

স্কুলের নির্ধারিত ক্লাসের ওপর জোর না দিয়ে অতিরিক্ত ক্লাসের ‍ওপর জোর দেওয়া হয়, নির্ধারিত সিলেবাসের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো এড়িয়ে গিয়ে সংক্ষেপে পাঠদান শেষ করা হয়। যার ফলে নিয়মিত ক্লাসের কার্যকারিতা ও গুরুত্ব কমে যায়। তাই বাড়তি পড়ার জন্য শিক্ষার্থীরা অতিরিক্ত ক্লাসে যেতে বাধ্য হয়।

মানসিক চাপ সৃষ্টি: অতিরিক্ত ক্লাসে ভর্তি হওয়ার জন্য শিক্ষার্থীদের ওপর স্কুল ও শিক্ষকদের পক্ষ থেকে বিভিন্নভাবে মানসিক চাপ প্রয়োগ করা হয়। যারা এই অতিরিক্ত ক্লাসে ভর্তি হয় না, নিয়মিত ক্লাসে তাদের বিভিন্নভাবে হেনস্তা করা হয় এবং পরীক্ষার খাতায় ফেল করিয়ে দেওয়ার ভয় দেখানো হয়। পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়ার অনিশ্চয়তা এবং শিক্ষকদের এই চাপের কারণে শিক্ষার্থীরা মানসিক আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটায়।

বৈষম্য তৈরি

যেসব শিক্ষার্থী অতিরিক্ত ক্লাসে পড়ে না, তারা শিক্ষকের বিশেষ মনোযোগ থেকে বঞ্চিত হয়। অতিরিক্ত ক্লাস করা শিক্ষার্থীদের ক্লাসরুমে শিক্ষকরা আলাদাভাবে মূল্যায়ন করেন। অনেক সময় পরীক্ষার উত্তরপত্র মূল্যায়নে তাদের প্রতি পক্ষপাতিত্ব করা তথা তুলনামূলক বেশি নম্বর দেওয়া হয়। অন্যদিকে যারা অতিরিক্ত ক্লাসে পড়ে না, তারা ভালো পরীক্ষা দিয়েও প্রাপ্য নম্বর থেকে বঞ্চিত হয়। নিজেদের যোগ্যতা সঠিকভাবে মূল্যায়ন না হওয়ায় এবং শিক্ষকদের এই বৈষম্যমূলক আচরণের কারণে সাধারণ শিক্ষার্থীরা হীনম্মন্যতায় ভোগে।

প্রশ্নপত্র ফাঁসের আশঙ্কা

অতিরিক্ত ক্লাস নেওয়া শিক্ষকরাই সাধারণত বিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র তৈরি করে থাকেন। অতিরিক্ত ক্লাসে প্রশ্নপত্রের ধারণা কিংবা হুবহু পরীক্ষার প্রশ্ন জানিয়ে দেওয়ার মতো অভিযোগ ওঠে। ফলে যে সকল শিক্ষার্থী অতিরিক্ত ক্লাস করে তারা সহজে প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে এবং যারা সৎভাবে নিজে পড়ে পরীক্ষা দেয়, তারা বঞ্চিত হয় এবং পুরো মূল্যায়ন ব্যবস্থা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।

অভিভাবকের ওপর বাড়তি চাপ

নিয়মিত স্কুলের বেতন, সেশন ফি ও আনুষঙ্গিক খরচের পর ‘অতিরিক্ত ক্লাসের’ নামে কার্যত কোচিং বাণিজ্য এবং শিটের জন্য চড়া মূল্য দিতে বাধ্য হন অভিভাবকরা। নিম্নবিত্ত ও নির্দিষ্ট আয়ের মধ্যবিত্ত পরিবারের পক্ষে যা কঠিন হয়ে পড়ে। সন্তানের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে অভিভাবকরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এমন বাণিজ্যিক মনোভাব নীরবে মেনে নিতে বাধ্য হন।

কোচিং ব্যবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য সরকার ২০১২ সালে ‘কোচিং বাণিজ্য বন্ধ নীতিমালা’ জারি করে। ওই নীতিমালা অনুযায়ী, কোনো শিক্ষক নিজ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীকে কোচিং করাতে পারবেন না। তবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানপ্রধানের অনুমতি নিয়ে অন্য প্রতিষ্ঠানের সর্বাধিক দশ শিক্ষার্থীকে প্রাইভেট পড়াতে পারবেন। কিন্তু কোচিংয়ের নাম বদলে সেটিকে এখন ‘অতিরিক্ত ক্লাস’ বলে চালানো হচ্ছে।

সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী, অভিভাবকদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিষ্ঠানপ্রধান শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নির্ধারিত সময়ের আগে বা পরে অতিরিক্ত ক্লাসের ব্যবস্থা করতে পারবেন। এক্ষেত্রে মহানগরী এলাকার প্রতি শিক্ষার্থীর কাছ থেকে মাসে তিনশ’, জেলা পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে দেড়শ’ টাকা নেওয়া যাবে। তবে প্রতিষ্ঠানপ্রধান ইচ্ছা করলে দরিদ্র শিক্ষার্থীদের এই টাকা কমাতে বা মওকুফ করতে পারবেন বলে নীতিমালায় বলা আছে।

কিন্তু দুর্ভাগ্য হলো, নীতিমালা কাগজ-কলমেই আটকে আছে। অতিরিক্ত ক্লাসের নামে চলা এই কোচিং বাণিজ্য বন্ধ করতে প্রয়োজন সরকারের কঠোর নজরদারি, নীতিমালা অনুযায়ী শাস্তি নিশ্চিত করা এবং বিদ্যালয়গুলোর কার্যক্রমে স্বচ্ছতা আনা।

লেখক: যশোর সরকারি মাইকেল মধুসূদন কলেজের একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)