সুবর্ণভূমি ডেস্ক
ড. আসিফ নজরুল বাংলাদেশের একজন আইন বিশেষজ্ঞ, রাজনৈতিক বিশ্লেষক, লেখক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষক। গণঅভ্যুত্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী আসিফ নজরুল ২০২৪ সালের আগস্টে বাংলাদেশে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হওয়ার পর আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন। আফিস নজরুল তার উপদেষ্টা জীবনের গল্প তুলে ধরছেন সামাজিক মাধ্যমে। সুবর্ণভূমির পাঠকদের জন্য তার লেখা তুলে ধরা হচ্ছে। আজ পড়ুন দ্বিতীয় পর্ব:
‘দেশের বাড়ি’
“স্যার, আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের। দেশের বাড়ি …”
আমি থামালাম তাকে। বললাম, “আমার কাছে দেশের বাড়ি বলা নিষেধ। মনে থাকবে?”
সে কিছুটা বিব্রত হলো। মাথা নাড়ল, “মনে থাকবে!”
আইন মন্ত্রণালয়ে পুরোপুরি অফিস করার প্রথম দিন ছিল সেটা। ১০ আগস্ট, শনিবার, ২০২৪ সাল। প্রচণ্ড ব্যস্ততা শেষে বিকেলে মন্ত্রণালয়ের অফিসারদের সঙ্গে বসেছি। এদের অনেকেই আমার প্রাক্তন ছাত্র। তবু আনুষ্ঠানিক পরিচয়পর্ব শুরু হলো। প্রথমজন যিনি দেশের বাড়ী বলতে চাইলো তাকেই আটকানো হলো। সবাই টের পেল, আমি সিরিয়াস এ বিষয়ে। দেশের বাড়ি কোথায়, তা আমার কাছে বলা যাবে না।
এর কারণ ছিল। বাংলাদেশের বহু মানুষের অদ্ভুত একটা স্বভাব আছে। তা হচ্ছে, দেশের বাড়ি কোথায়—পরিচয়পর্বের সঙ্গে সঙ্গে এটা নিয়ে আলাপ করা। অনেক সময়ই এর উদ্দেশ্য থাকে খাতিরের সম্পর্ক করা বা এমনকি অনৈতিক সুবিধা নেওয়া। মন্ত্রীর বাড়ি কোন জেলার হলে, সেই জেলার লোক চাকরিতে বাড়তি সুবিধা পাবে—এটাই যেন নিয়ম বাংলাদেশে। এমনকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কিছু ক্ষমতাবান শিক্ষকের মধ্যেও এমন প্রবণতা দেখেছি কমবেশি।
এই সংকীর্ণ আঞ্চলিকতা কতদূর গেছে, তার একটা উদাহরণ দিই। আমাদের সংবিধানে লেখা আছে, জন্মস্থানের ভিত্তিতে কারও সঙ্গে বৈষম্য করা যাবে না। এমন কথা পৃথিবীর খুবই কম সংবিধানে লেখা আছে। আমাদের মানুষের মধ্যে এই প্রবণতা আছে বলেই ১৯৭২ সালে এই অতি বিরল বিধান যুক্ত করা হয়েছিল সংবিধানে।
কিন্তু তাতে কি লাভ হয়েছে কোনো?
সাংবিধানিক আইনের ক্লাসে আমার ছাত্রদের প্রশ্ন করি: তোমাদের কী মনে হয়, আমাদের শাসকরা মানে এটা?
সবাই সমস্বরে বলে, “না স্যার! মানে না।”
আমি বলি, “আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকার সময় কোন জেলার মানুষ বেশি সুবিধা পেত?”
তারা বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে বলে, “গোপালগঞ্জ।”
“আর কোন জেলার লোকের বিরুদ্ধে বৈষম্য করা হতো?”
কেউ বলে ফেনী, কেউ বগুড়া।
অন্য দলগুলোর উদাহরণ নেই। কেউ ভুল করে না বলতে, কার আমলে কোন জেলার লোক সুবিধা পায়, কাদের বিরুদ্ধে বৈষম্য হয়।
আইন মন্ত্রণালয়ে আমার পূর্বসূরিরও এমন বদনাম ছিল। আমি তাই সতর্ক ছিলাম। দেশের বাড়ী নিয়ে আলাপ করা যাবে না-আমার অফিসারদের অনেকে এটা পছন্দও করেছিল। যতদিন মন্ত্রণালয়ে ছিলাম, কেউ আর দেশের বাড়ি কোথায় বলার চেষ্টা করেনি।
কিন্তু মন্ত্রণালয়ের বাইরের লোককে থামাতে পারিনি তাতে। প্রচণ্ড কর্মব্যস্ত একদিনে অনেক বলে-কয়ে দেখা করতে আসল এমন একজন। অল্প চুলের, মাঝবয়সী, আমুদে চেহারার একজন মানুষ।
আমি বললাম, “বসেন! কেন এসেছেন, প্লিজ তাড়াতাড়ি বলেন।”
তিনি বসলেন না। হালকা গা দোলাতে দোলাতে বললেন, “স্যার, আমার বাড়ি নেত্রকোনা।”
আমি তার আকস্মিক আনন্দের কারণ খুঁজে পেলাম না। তিনি আরও জোরে জোরে গা দোলাতে লাগলেন। লাজুক কণ্ঠে বললেন, “নেত্রকোনা, কেন্দুয়া থানা!”
এতক্ষণে রহস্য বুঝতে পারলাম আমি। হুমায়ূন আহমেদের বাড়ি সেখানে। কিন্তু আমাকে এটা বলার দরকার কী? কিছুটা অবাক হয়ে তার দিকে তাকালাম।
তিনি আরও অবাক হয়ে আমার দিকে তাকালেন। মনে হলো, তিনি বুঝতে পারছেন না, কেন তাকে এখনই খুশিতে জড়িয়ে ধরছি না!
এমন ঘটনা আরো ঘটতো। সবচেয়ে বেশি বিড়ম্বনা হতো আমার বাবার বাড়ির লোকদের নিয়ে। ঠিক সেখানকার এতো অসংখ্য মানুষ যে ঢাকায় থাকেন তা নতুন জানা হলো আমার উপদেষ্টা জীবনে।