যশোর, বাংলাদেশ || শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফের মৃত্যু নিয়ে যে কারণে এতো আলোচনা

সজল দাস

প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর,২০২৬, ১১:২৫ পিএম
সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফের মৃত্যু নিয়ে যে কারণে এতো আলোচনা

বন্ধুস্থানীয় ছোট ভাইয়ের ডাকে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ঢাকায় উত্তরার বাসা থেকে বের হন বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফ সাউরি। এরপর আর বাসায় ফেরেননি তিনি।

বুধবার সন্ধ্যায় পুলিশের ফোনে সাউরির মরদেহ উদ্ধারের বিষয়টি জানতে পারেন তার পরিবারের সদস্যরা।

বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর সাবেক এই কর্মকর্তার মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা ব্যাপক কৌতূহল ও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। এটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড কি না এ নিয়েও নানা আলোচনা চলছে।

জুলাই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নানা সময় আলোচনায় এসেছিলেন বিমানবাহিনীর সাবেক এই কর্মকর্তা।

বিশেষ করে জুলাই আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের চূড়ান্ত মুহূর্তে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর দেশত্যাগের একটি ভিডিও ধারণ ও প্রচারের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা থাকা, না থাকার বিষয়টি নিয়ে নানা আলোচনা রয়েছে।

এছাড়া বিমানবাহিনী থেকে কেন তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছিল, তা নিয়েও সামাজিক মাধ্যমে কথা বলতে দেখা গেছে অনেককে।

তুরাগ নদ থেকে মরদেহ উদ্ধার করা হলেও কীভাবে মি. সাউরির মৃত্যু হয়েছে—এ নিয়ে এখনও বিস্তারিত তথ্য জানায়নি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

যদিও নিহতের সুরতহাল প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, তার শরীরে কোনো আঘাতের চিহ্ন না থাকলেও নাক দিয়ে রক্ত বের হতে দেখা গেছে।

এদিকে ঘটনাটিকে হত্যাকাণ্ড হিসেবেই উল্লেখ করেছে নিহতের পরিবার। মি. সাউরির বাবা দাবি করেছেন, তার ছেলেকে হত্যা করা হয়েছে।

তবে, কে বা কারা এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত এ নিয়ে কোনো মন্তব্য করেননি তিনি।

নিখোঁজ হন একদিন আগে

ঢাকার উত্তরার বাসা থেকে বের হওয়ার একদিন পর তুরাগ নদে পানিতে ভাসমান অবস্থায় তাহসিফ সাউরির মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

টঙ্গী নৌ পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ ফিরোজ উদ্দিন জানান, বুধবার বিকেল সাড়ে চারটার দিকে তুরাগ নদের রাজাবাড়ি ঘাট এলাকা থেকে মরদেহটি কচুরিপানার মধ্য থেকে উদ্ধার করা হয়। এসময় তার পরনে ছিল সাদা ট্রাউজার এবং কালো জামা।

যদিও এর আগের দিন অর্থাৎ মঙ্গলবারও সারাদিন পরিবারের সঙ্গেই সময় কাটিয়েছিলেন মি. সাউরি।

নিহতের বাবা কে এম এনায়েতুল করিম বৃহস্পতিবার দুপুরে সাংবাদিকদের জানান, পরিচিত এক ছোটভাইয়ের ডাকে মঙ্গলবার সন্ধ্যার দিকে বাসা থেকে বের হয়েছিলেন সাউরি।

‘২৭ তারিখ সারাদিন তার মায়ের সঙ্গে ছিল, শপিং করেছে, আমার জন্যও কিছু শপিং করেছে। সন্ধ্যার পরে ওর এক বন্ধু স্থানীয় ছোট ভাই নিচ থেকে ডাকে। ওর মাকে বলে, আমার ছেলে বের হয়,’ গণমাধ্যমকে বলেন মি. করিম।

এরপর থেকেই বাসার বাইরে ছিলেন তাহসিফ সাউরি। বারবার তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাননি পরিবারের সদস্যরা।

রাত একটার পরে তার ফোন থেকে সবশেষ বার্তা এসেছিল বলেও উল্লেখ করেন মি. করিম।

“রাত ১টা ৩৫ এ সে মেসেজ দিয়েছে যে সে আসছে। ‘আম্মু আমি আসছি’ এরকম একটা ব্যস্ত ম্যাসেজ দিয়েছে। এরপর থেকে তাকে আমরা আর লোকেট করতে পারিনি।”

খোঁজ না পেয়ে ২৮ অক্টোবর দুপুরে থানায় যোগাযোগ করেছিলেন পরিবারের সদস্যরা। পরে, সন্ধ্যার দিকে তাহসিফ সৌরির মরদেহ উদ্ধারের বিষয়টি তার পরিবারকে জানান ঢাকার উত্তরখান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা।

মি. করিম বলছেন, ‘রাজাবাড়ি ঘাট (তুরাগ নদের যে অংশে মরদেহ উদ্ধার হয়েছে), আটিপাড়া দিয়ে যেতে হয়, ওই এলাকায় আমার ছেলে কখনও যায়নি। এখন কারা বা কে তাকে হত্যা করেছে এটা আমরা জানি না।’

এই ঘটনাটিকে হত্যাকাণ্ড হিসেবেই উল্লেখ করেছেন তিনি।

পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, শৃঙ্খলাজনিত কারণে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশ বিমানবাহিনী থেকে বরখাস্ত করা হয় ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফ সাউরিকে।

বরখাস্ত হওয়ার পর থেকে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড এবং নেত্র নিউজসহ বেশ কয়েকটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে তিনি চাকরি করেছেন বলেও জানান তার বাবা।
মি. সাউরিকে কেউ হুমকি-ধামকি দিচ্ছিল কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে মি. করিম বলেন, ‘ও রকম কিছু বলে নাই। তবে মাঝেমাঝে আমাকে বলতো যে, সে একটু শঙ্কিত।’

যেভাবে আলোচনায় আসেন

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণআন্দোলনের মুখে দেশ ছাড়েন বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ওই সময় তার দেশ ছাড়ার মুহূর্ত দাবি করে একটি ভিডিও ব্যাপকভাবে প্রচার করা হয়।

সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া ওই ভিডিওটি কে বা কারা ছড়িয়েছিল সেই প্রশ্নও সামনে এসেছিল।

পরবর্তীতে ওই ভিডিও ধারণ করা বা ছড়িয়ে দেওয়ার বিষয়ে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর দুই কর্মকর্তা জড়িত বলে অভিযোগ ওঠে। স্থানীয় একটি গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ওই দুই কর্মকর্তার একজন ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফ সাউরি।

অভিযুক্ত দুই কর্মকর্তাকে বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার সাথে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয় বলেও দাবি করা হয়েছিল পত্রিকাটির ওই প্রতিবেদনে।

যদিও এই সংবাদের প্রেক্ষিতে ২০২৫ সালের ৪ আগস্ট গণমাধ্যমে একটি প্রতিবাদলিপি পাঠিয়েছিল আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর বা আইএসপিআর। যেখানে বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার সাথে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ বিভ্রান্তিকর হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

প্রতিবাদলিপিতে বলা হয়, ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট রিফাত আশরাফী ও ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফ সাউরি নামে দুই কর্মকর্তাকে ভিন্ন প্রেক্ষাপটে বিমানবাহিনীর প্রচলিত আইন ও বিধিমালার আওতায় যথাযথ প্রক্রিয়ায় অবসর প্রদান করা হয়েছে।

মি. সাউরি নিজেও ভিডিও ধারণ কিংবা পোস্ট করার বিষয়টিকে অভিযোগ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। তিন মাস আগে একটি ইউটিউব চ্যানেলে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এই অভিযোগ নিয়ে পাল্টা প্রশ্ন তোলেন তিনি।

‘আমি যদি ভিডিওটি করেও থাকি বা ছড়িয়েও থাকি, মানে হোয়াট ইজ দ্যা প্রুভ দে আর হ্যাভিং (তাদের কাছে কী প্রমাণ আছে?), আমি এটা জিজ্ঞেস করতে পারি। আর এটাও হতে পারে যে, এজন্যই আজকে আমি হয়তো এয়ারফোর্সে নেই,’ ওই সাক্ষাৎকারে বলেন মি. সাউরি।

এছাড়া ভিডিও করার দাবিকে শুধু ‘অভিযোগ’ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন বিমানবাহিনীর সাবেক এই কর্মকর্তা।

এদিকে, বুধবার তাহসিফ সাউরির মরদেহ উদ্ধারের পর, তার চাকরিচ্যুত হওয়ার কারণ এবং সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে মন্তব্য করতে দেখা গেছে তার স্বজন ও পরিচিতজনদের অনেককেই।

চাকরি হারানোর বিষয়ে মি. সাউরির বাবা গণমাধ্যমকে জানান যে, শৃঙ্খলা ভঙ্গের বিষয়টিকেই সে সময় কারণ হিসেবে দেখিয়েছিল বিমানবাহিনী।

‘ওকে শৃঙ্খলাজনিত কারণে বরখাস্ত করা হয় বলে বাহিনীর পক্ষ থেকে আমাদেরকে জানানো হয়,’ গণমাধ্যমকে বলেন মি. করিম।

চাকরি হারানো এবং গণমাধ্যমে প্রকাশ হওয়া বিভিন্ন সংবাদের কারণে মি. সাউরি গত কয়েকমাস যাবৎ বেশ মানসিক চাপে ছিলেন বলেও দাবি করেছেন তার স্বজন ও সহপাঠীদের অনেকে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তার এক বন্ধু জানান, চাকরি হারানোর পর থেকেই কিছুটা মানসিক চাপে ছিলেন মি. সাউরি।

‘‘বিমানবাহিনীর একজন পাইলট হিসেবে সে দুইশ’ ঘণ্টা ফ্লাই করেছে। এটি তার স্বপ্নের কাজ ছিল। সেখান থেকে সরিয়ে দেওয়ার কারণে মানসিকভাবে ধাক্কা খেয়েছিল সে,” বলেন তিনি।

এছাড়া আরেকটি গণমাধ্যমে মি. সাউরির বিরুদ্ধে বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার সাথে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তোলার পর তাকে সামাজিকভাবে হেনস্তার শিকার হতে হয়েছিল বলেও দাবি করেন তার বন্ধু।

সূত্র: বিবিসি

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)