যশোর, বাংলাদেশ || শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

ধর্ম

ইসলামের দৃষ্টিতে বৃদ্ধ পিতামাতার যত্ন ও সঙ্গ

মুফতি আরিফুল ইসলাম ফয়সাল

প্রকাশ : শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর,২০২৬, ১২:৩০ এ এম
ইসলামের দৃষ্টিতে বৃদ্ধ পিতামাতার যত্ন ও সঙ্গ

একদিন যে হাতটি ধরে আমরা প্রথম হাঁটতে শিখেছিলাম, সময়ের স্রোতে একদিন সেই হাতই কাঁপতে শুরু করে। যে বাবা সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়তে নিজের যৌবন, স্বপ্ন ও স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়েছেন, একদিন তিনিই হয়তো ধীর পায়ে ঘরের এক কোণে বসে থাকেন কারও সঙ্গে দুটো কথা বলার অপেক্ষায়। যে মা সন্তানের কান্না শুনে গভীর রাতে ঘুম ভেঙে ছুটে যেতেন, বার্ধক্যে এসে হয়তো তিনিই অপেক্ষা করেন—সন্তানটি আজ একটু পাশে বসবে কি না। কিন্তু আমরা কি সেই অপেক্ষার ভাষা বুঝতে পারি?

আধুনিক জীবনের ব্যস্ততায় আমরা প্রবীণদের প্রয়োজন মেটানোর চেষ্টা করি। খাবার দিই, ওষুধ কিনে দিই, প্রয়োজনীয় অর্থ দিই। অথচ অনেক সময় ভুলে যাই, মানুষের প্রয়োজন শুধু বেঁচে থাকা নয়; ভালোবাসা, সম্মান ও আপনজনের সঙ্গও তার বেঁচে থাকার শক্তি।

বিশেষ করে বার্ধক্যে একজন মানুষের সবচেয়ে বড় কষ্ট অনেক সময় শারীরিক নয় বরং একাকিত্ব। একই বাড়িতে থেকেও সন্তানদের ব্যস্ততা, প্রযুক্তিনির্ভর জীবন ও পারিবারিক দূরত্বের কারণে অনেক প্রবীণ মানুষ নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েন। অথচ তাদের জীবনের এই শেষ অধ্যায়টি হতে পারতো ভালোবাসা, মর্যাদা ও সান্নিধ্যে ভরা।

ইসলাম প্রবীণদের এই অবস্থাকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখেছে। বিশেষ করে বাবা-মায়ের বার্ধক্যকে সন্তানের জন্য বোঝা নয়, বরং আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি বড় দায়িত্ব ও জান্নাত অর্জনের সুযোগ হিসেবে তুলে ধরেছে। তাই প্রশ্ন শুধু এই নয়, আমরা প্রবীণদের জন্য কী করছি? বরং প্রশ্ন হলো, যারা আমাদের জীবন গড়েছেন, জীবনের শেষ প্রান্তে এসে আমরা কি তাদের জীবনে একটু আলো হয়ে দাঁড়াতে পারছি?

মানুষের জীবন শৈশব, যৌবন ও বার্ধক্যের বিভিন্ন পর্যায় অতিক্রম করে। শৈশবে মানুষ যেমন অন্যের ওপর নির্ভরশীল থাকে, বার্ধক্যেও তেমনি তাকে অন্যের সাহায্য নিতে হয়। আজ যে বাবা-মা শক্ত হাতে সন্তানকে লালন-পালন করছেন, একদিন তাদেরই হাত কাঁপবে, চলাফেরা ধীর হবে এবং সন্তানের সহযোগিতার প্রয়োজন হবে। তাই প্রবীণদের যত্ন নেওয়া শুধু সামাজিক দায়িত্ব নয়; এটি ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।

আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আল্লাহ তোমাদের দুর্বল অবস্থায় সৃষ্টি করেছেন; অতঃপর দুর্বলতার পর শক্তি দিয়েছেন; তারপর শক্তির পর আবার দুর্বলতা ও বার্ধক্য দিয়েছেন।’ সুরা আর-রূম: ৫৪

অর্থাৎ বার্ধক্য মানুষের জীবনের স্বাভাবিক পরিণতি। তাই প্রবীণদের দুর্বলতাকে অবজ্ঞা করার কোনো সুযোগ নেই।

বাবা-মায়ের বার্ধক্য সন্তানের পরীক্ষা

বৃদ্ধ বাবা-মায়ের ব্যাপারে কুরআনের নির্দেশ অত্যন্ত হৃদয়স্পর্শী। আল্লাহ বলেন, ‘‘তাদের একজন অথবা উভয়েই যদি তোমার কাছে বার্ধক্যে উপনীত হয়, তবে তাদের ‘উফ’ পর্যন্ত বলো না, তাদের ধমক দিও না এবং তাদের সঙ্গে সম্মানজনক কথা বলো।” সুরা আল-ইসরা: ২৩

লক্ষ করার বিষয় হলো, ইসলাম শুধু বাবা-মায়ের ভরণপোষণের নির্দেশ দেয়নি; তাদের সঙ্গে কীভাবে কথা বলতে হবে, সেটিও শিক্ষা দিয়েছে। অর্থাৎ খাবার, পোশাক ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করলেই দায়িত্ব শেষ নয়। তাদের প্রয়োজন সম্মান, ভালোবাসা, কোমল আচরণ এবং আপনজনের সঙ্গ।

বর্তমান সমাজে প্রবীণদের অন্যতম বড় সমস্যা একাকিত্ব। সন্তান কর্মব্যস্ত, নাতি-নাতনিরা মোবাইলে ব্যস্ত; ফলে একই বাড়িতে থেকেও একজন প্রবীণ মানসিকভাবে একা হয়ে পড়েন।

অনেক সময় তাদের কোনো দামি উপহার প্রয়োজন হয় না। প্রয়োজন শুধু একজন আপন মানুষ, যে পাশে বসে বলবে, ‘আব্বা, কেমন আছেন?’ ‘আম্মা, আজ শরীর কেমন?’

এই সামান্য সময়টুকুই তাদের জন্য অনেক বড় আনন্দের কারণ হতে পারে।

রাসুলুল্লাহ সা. বলেছেন, ‘যে আমাদের ছোটদের প্রতি দয়া করে না এবং আমাদের বড়দের সম্মান করে না, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।’ জামে তিরমিজি
অতএব প্রবীণদের সম্মান করা মুসলিমের চরিত্রের অংশ।

কীভাবে প্রবীণদের যত্ন নেব

প্রবীণদের যত্ন নেওয়ার জন্য বড় আয়োজন সবসময় প্রয়োজন হয় না। প্রতিদিন কিছু সময় তাদের পাশে বসা, মনোযোগ দিয়ে কথা শোনা, চিকিৎসা ও ওষুধের খোঁজ রাখা, পারিবারিক বিষয়ে তাদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া এবং নাতি-নাতনিদের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ করে দেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বয়সের কারণে তারা একই কথা বারবার বলতে পারেন, কিছু ভুলে যেতে পারেন বা ধীরে চলতে পারেন। তখন বিরক্ত না হয়ে ধৈর্য ধরতে হবে। মনে রাখতে হবে, আজ তিনি দুর্বল; একদিন আমরাও দুর্বল হবো।

বার্ধক্য যখন জান্নাতের সুযোগ

রাসুলুল্লাহ সা. বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি তার বাবা-মায়ের একজন অথবা উভয়কে বার্ধক্যে পেল, তারপরও জান্নাতে প্রবেশ করতে পারলো না, সে বড়ই হতভাগা।’ সহিহ মুসলিম

তাই বাবা-মায়ের বার্ধক্যকে বোঝা মনে না করে জান্নাত অর্জনের সুযোগ হিসেবে দেখা উচিত।

যারা বাবা-মাকে হারিয়েছেন, তারা তাদের জন্য দোয়া, সদকা এবং মাগফিরাত কামনা করতে পারেন। কুরআনের দোয়া: ‘রব্বিরহামহুমা কামা রব্বায়ানিস সগিরা’। অর্থাৎ ‘হে আমার রব! তাদের প্রতি রহম করুন, যেমন তারা শৈশবে আমাকে লালন-পালন করেছেন।’ সুরা আল-ইসরা: ২৪

সময় থাকতে পাশে দাঁড়াই

বৃদ্ধ বাবা-মা একদিন পৃথিবী থেকে চলে যাবেন। তখন তাদের ঘর থাকবে, স্মৃতি থাকবে; কিন্তু চির হিতাকাঙ্ক্ষী মানুষটি থাকবে না। তখন আফসোস করে লাভ হবে না।

তাই জীবিত অবস্থায় তাদের ভালোবাসি, সময় দিই, সম্মান করি এবং সেবা করি। যে হাত একদিন আমাদের ধরে হাঁটতে শিখিয়েছে, বার্ধক্যে সেই হাত ছেড়ে না দিয়ে শক্ত করে ধরে রাখাই হোক আমাদের অঙ্গীকার।

আজ তারা আমাদের প্রয়োজন; কাল আমরাও কারও প্রয়োজন হবো।

আল্লাহ আমাদের প্রবীণদের সম্মান ও সেবা করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

লেখক: ইমাম ও খতিব, নলডাঙ্গা রোড জামে মসজিদ, যশোর

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)