মো. মিজানুর রহমান
পুরুষ মানুষ দুটো কারণে নেশা করে- অত্যধিক দুঃখে এবং অত্যধিক সুখে। সুখে-দুঃখে মানুষের পাশে যারা থাকে তারাই প্রকৃত বন্ধু। নেশাদ্রব্যও মানুষের সময়ে-অসময়ে সান্ত্বনা হিসেবে পাশে থাকে। খেয়াল করবেন তুমুল বৃষ্টিতে যখন বাজারের সবাই অস্থির হয়ে আশ্রয় খুঁজি তখন বৃষ্টিতে ভিজে সবজিওয়ালা চাচা আয়েশ করে পান খান। এর থেকে উৎসাহব্যঞ্জক আর কী হতে পারে? দুনিয়ার সকল প্রতিকূল পরিস্থিতি তার কাছে তুচ্ছ যদি আঙুলের ডগায় চুন থাকে। আর যখন বৃষ্টি না থাকে তখন বেচাকেনা ভালো হলে আনন্দে চাচা পান খান।
ফল বিক্রেতা বৃষ্টিতে গুটিসুটি হয়ে বসে সমানে বিড়ি ফুঁকতে থাকেন। বৃষ্টিতে তাদের ব্যবসা সাময়িক বন্ধ থাকে। যিনি বিড়ি খান তাকে দেখলে বুঝা যায় যে তিনি অতিরিক্ত চিন্তায় বিড়ি খাচ্ছেন। তখন তিনি নেশা করেন না, বরং নেশাই ওনাকে এনজয় করে।
যাই হোক নেশাদ্রব্য মানুষ দুটি কারণেই গ্রহণ করে—অত্যধিক সুখে এবং দুঃখে। উল্লেখ্য, যাদের ভালো বন্ধু আছে দয়া করে তারা নেশা করবেন না। নেশা সে যেটাই হোক, ভালো না। বন্ধুদের নিয়ে মেতে থাকুন। ঘরের রমণীরা বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেওয়াটাকেও পুরুষের নেশা হিসেবে গণ্য করেন। অবশ্য বন্ধুদেরকেও পুরুষেরা নেশার মতো সুখে-দুখে পাশে চান। যে বন্ধু বিপদে পাশে থাকেন তিনি নেশা হিসেবে একটু বেশি কড়া। কাজেই বন্ধুর নেশাকে অনায়াসে মেনে নেওয়া যায়। তবে হ্যাঁ, কোনো অবস্থাতেই মোমে-আগুনে (নারী-পুরুষে) বন্ধুত্ব নয়। নারী-পুরুষে বন্ধুত্ব বেশিদিন থাকে না। স্বাভাবিকভাবে বন্ধুত্ব দিয়ে শুরু হলেও সুযোগ পেলেই তা দাউ-দাউ করে জ্বলে উঠে মোম-আগুন উভয় ফুরিয়ে গিয়ে শুধু স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে সংসারে কয়লা হয়ে পড়ে থাকে অথবা বেস্ট ফ্রেন্ড পরিচয়ে ভিন্ন সংসারে আরেক প্রদীপে জ্বলতে থাকে।
নেশার আলোচনায় যেহেতু নারী এলো সেহেতু পুরুষের জীবনে নারীর প্রয়োজনীতা নিয়েও আলোচনা করা যেতে পারে। পুরুষ দুটো কারণে নারীসঙ্গ খোঁজেন—অত্যধিক সুখে এবং অত্যধিক দুঃখে। পুরুষের সুখ প্রকাশের যত স্থান আছে তার মধ্যে ব্যক্তিগত নারী অন্যতম। যদি কারো ব্যক্তিগত নারী না থাকে তবে তা খুঁজে ফেরেন। মনে সুখ থাকলে নারী নদী মনে হয়। তারপর ‘মাঝি বাইয়া যাও... অকূল দরিয়া.....।’
পুরুষ অত্যধিক দুঃখ পেলে চন্দ্রমুখী খোঁজেন। নারীর দরদ খোঁজেন। পুরুষের জীবনে নারীর গুরুত্ব অপরিসীম। তাদেরকে পুরুষেরা সৃষ্টিকর্তার পুরস্কার হিসেবেই গ্রহণ করেন, অনেক ক্ষেত্রে নারীকে জয় করে নেন। পুরুষ যা কিছুই করে শুধু পেটের ক্ষুধায় করে না। মন ও মানের ক্ষুধাটিই তার কাছে আগে গুরুত্ব পায়। আর মন বলতে শিমুল-পারুলের (নায়ক-নায়িকা) মন। সকল শিমুল তাদের মন পারুলের কাছে জমা করে নিজে নিঃস্ব হয়ে যান। শিমুলের হাতে তখন আর কোনো ক্ষমতা থাকে না, সকল ক্ষমতা পারুলের হাতে। ওদিকে পারুল তার বাবাকে বোঝাতে থাকেন যে, তার বলতে কিচ্ছুটি আর নেই, সব শিমুলের কাছে। কে কাকে ক্ষমতা হস্তান্তর করেছে তা বুঝতে সাধারণের দৃষ্টিভ্রম হয়।
ক্ষমতার কথা যখন এলো তখন ক্ষমতা নিয়েও কিছুটা আলোচনা করাই যায়। মাদক এবং নারীতে যেমন পুরুষের নেশা আছে, ক্ষমতার প্রতিও। যে কোনো উপায়ে পুরুষ ক্ষমতা অর্জন এবং প্রকাশ করতে চায়। আর ক্ষমতার কেন্দ্রে আছে রাজনৈতিক ক্ষমতা। এর থেকে অধিক ক্ষমতার স্থান বা পাত্র পৃথিবীতে নেই। সেই রাজনীতিতেও মানুষ মানুষের ওপর দুটি কারণেই ক্ষমতা প্রদর্শন করেন—রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় থাকলে এবং রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় না থাকলে। দল ক্ষমতায় থাকলে দলীয় ক্ষমতা কোথায় কার ওপরে দেখাবে এই ভাবনাই মাথার মধ্যে চক্কর খাইতে থাকে। ক্ষমতা প্রদর্শনের জন্য ক্ষমতাহীনের প্রতি আক্রমণ করেন। দল ক্ষমতায় না থাকলে কে কখন কোথায় তার ওপর ক্ষমতা দেখাবেন—এই ভাবনায় অস্থিরতায় ভোগেন এবং অনেক ক্ষেত্রেই ক্ষমতাবানকে আগেই আক্রমণ করে বসেন। রাজনীতির একটিই নীতি—সরিয়ে দেওয়া। ক্ষমতায় যেতে সরিয়ে দেয়া এবং ক্ষমতায় গিয়ে সরিয়ে দেয়া। অর্থাৎ সরিয়ে দিতে এবং টিকে থাকতে উভয় কাজেই পুরুষের ক্ষমতা থাকা চাই। এই ক্ষমতার নেশা মাদক এবং নারী অপেক্ষা বড়।
উল্লেখ্য, নারী বলতে এখানে পুরুষের নারী বুঝিয়েছি, যে নিজে পুরুষের চোখে নেশা হয়ে ধরা দিতে চান, পুরুষের মনে মাদকতা ছড়াতে চান। নারী যখন পুরুষের আপনজন তখন সকল নারীই পুরুষের নিকট অমূল্য সম্পদ। সেই সম্পদ রক্ষায় তারা প্রাণ দিতে প্রস্তুত থাকেন।
নারী এবং মাদকে শুধু নেশাখোর ক্ষতিগ্রস্ত হলেও ক্ষমতার নেশা পুরো সমাজ, দেশ এমনকি পৃথিবীকে টালমাটাল করে তোলে। বিড়ির ধোঁয়া নাক বন্ধ করে এড়িয়ে যাওয়া যায়, নারীকে চোখ বুজে এড়িয়ে যাওয়া যায়, ক্ষমতাকে এড়িয়ে যাওয়া অসম্ভব। ক্ষমতার দাপট, প্রভাব এবং পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থেকে বাঁচার জন্য ওই ক্ষমতা ছাড়া ভিন্ন কোনো পদ্ধতি নেই।
লেখক: কবি ও কথাসাহিত্যিক