তসলিম শিমুল
আমরা কেন জানি এক অদ্ভুত অস্থির সময় পার করছি। সবাই ছুটছি, কিন্তু কোথায় যাচ্ছি, কেন যাচ্ছি—তা নিয়ে ভাবার সময় যেন আমাদের নেই। আমাদের ছুটে চলার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য এখন বিখ্যাত হওয়া। কে কতটা পরিচিত, কে কত বেশি মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারছে, কে কতটা আলোচনায় থাকছে—এসবই যেন সাফল্যের মাপকাঠি হয়ে উঠেছে। অথচ এই দৌড়ে আমরা ক্রমেই হারিয়ে ফেলছি স্বাভাবিক জীবন, মূল্যবোধ, মনুষ্যত্ব এবং নিজেদের স্বকীয়তা।
একসময় মানুষের পরিচয় তৈরি হতো তার সততা, যোগ্যতা, মানবিকতা ও কাজের মধ্য দিয়ে। এখন অনেক ক্ষেত্রেই সেই জায়গা দখল করেছে বাহ্যিক পরিচিতি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এই যুগে জনপ্রিয়তা অর্জনের প্রতিযোগিতা এতটাই তীব্র যে, মানুষ কী করছে তার চেয়ে মানুষ তাকে কতটা দেখছে, সেটাই যেন বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ভালো কাজের চেয়ে প্রচার, যোগ্যতার চেয়ে পরিচিতি, আর আত্মতৃপ্তির চেয়ে অন্যের স্বীকৃতি পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা বড় হয়ে উঠছে।
কিন্তু পরিচিতি আর গ্রহণযোগ্যতা এক নয়। অনেক মানুষ আমাদের চিনতে পারে, অথচ আমাদের শ্রদ্ধা নাও করতে পারে। আলোচনায় থাকা মানেই মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নেওয়া নয়। প্রকৃত সম্মান অর্জন করতে হয় সততা, দায়িত্ববোধ ও মানবিক আচরণের মাধ্যমে। খ্যাতির মোহে যখন আমরা এই সত্য ভুলে যাই, তখন অন্যকে ছোট করে নিজেকে বড় প্রমাণ করার প্রবণতা বাড়ে, সম্পর্কের জায়গায় স্বার্থ প্রাধান্য পায়, আর মানবিকতার জায়গা দখল করে আত্মপ্রচার।
এই প্রবণতা শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সীমাবদ্ধ নয়; এর প্রভাব পড়ছে আমাদের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনেও। অন্যের সাফল্যের সঙ্গে নিজের জীবনকে তুলনা করতে গিয়ে আমরা নিজেদের প্রাপ্তিগুলো উপভোগ করতে ভুলে যাচ্ছি। পরিবারকে সময় দেওয়া, বন্ধুর সঙ্গে আন্তরিক সম্পর্ক বজায় রাখা কিংবা বিপদে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মতো স্বাভাবিক বিষয়গুলোও যেন ক্রমে গুরুত্ব হারাচ্ছে। আমরা অনেকের কাছে পরিচিত হচ্ছি, কিন্তু সত্যিকারের সম্পর্ক ও আন্তরিকতার জায়গাটি কতটা সমৃদ্ধ হচ্ছে, সেই প্রশ্ন থেকেই যায়।
অথচ জীবনের সার্থকতা বিখ্যাত হওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একজন সৎ শিক্ষক, দায়িত্বশীল অভিভাবক, নিষ্ঠাবান কর্মী কিংবা নিঃস্বার্থ সমাজকর্মী হয়তো সবার কাছে পরিচিত নন, কিন্তু তাঁদের কাজ মানুষের জীবনে গভীর প্রভাব ফেলে। তাঁদের অবদান প্রমাণ করে, মানুষের মূল্য তার পরিচিতির ব্যাপ্তিতে নয়, বরং তার কাজ ও চরিত্রে।
খ্যাতি অর্জন করা দোষের নয়, উচ্চাকাঙ্ক্ষাও অস্বাভাবিক নয়। সমস্যা তখনই, যখন বিখ্যাত হওয়ার আকাঙ্ক্ষা আমাদের জীবনের মূল উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়ায় এবং সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য আমরা মূল্যবোধের সঙ্গে আপস করি। অন্যের চোখে বড় হতে গিয়ে নিজের বিবেকের কাছে ছোট হয়ে পড়ার চেয়ে বড় ব্যর্থতা আর কী হতে পারে?
একটি সমাজের প্রকৃত অগ্রগতি শুধু অর্থনৈতিক উন্নতি কিংবা মানুষের পরিচিতি দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। সেই সমাজের মানুষ কতটা মানবিক, কতটা ন্যায়পরায়ণ এবং কতটা দায়িত্বশীল, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তাই বিখ্যাত হওয়ার প্রতিযোগিতার পাশাপাশি ভালো মানুষ হয়ে ওঠার চর্চাও জরুরি। কারণ, জনপ্রিয়তা সাময়িক হতে পারে, কিন্তু সততা ও মানবিকতার মূল্য কখনো ফুরিয়ে যায় না।
এখন সময় নিজেদের দিকে ফিরে তাকানোর। আমরা কী অর্জন করছি, তার পাশাপাশি কী হারাচ্ছি, সেটিও ভাবতে হবে। পরিচিতির আগে যোগ্যতা, প্রচারের আগে কাজ এবং ব্যক্তিস্বার্থের আগে মানবিকতাকে গুরুত্ব দিতে হবে। মনে রাখতে হবে, পৃথিবীতে সবাই বিখ্যাত হবে না, হওয়ার প্রয়োজনও নেই। কিন্তু প্রত্যেকেরই একজন ভালো মানুষ হয়ে ওঠার সুযোগ রয়েছে।
দিন শেষে মানুষ আমাদের কতটা চিনল, তার চেয়ে বড় প্রশ্ন—আমরা মানুষ হিসেবে কতটা ভালো হতে পারলাম?
বিখ্যাত হতে গিয়ে যদি মূল্যবোধ হারাই, মনুষ্যত্ব বিসর্জন দিই এবং নিজের স্বকীয়তা ভুলে যাই, তাহলে পরিচিতি হয়তো অর্জন করব, কিন্তু হারিয়ে ফেলব নিজেদের অস্তিত্ব। আর নিজের অস্তিত্ব হারিয়ে বিখ্যাত হওয়ার মধ্যে বাহ্যিক সাফল্য থাকলেও প্রকৃত সার্থকতা নেই।