যশোর, বাংলাদেশ || বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

যশোরকে যেমন দেখতে চাই

কর্নেল (অব.) মেহের মহব্বত হোসেন

প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর,২০২৬, ১২:০১ এ এম
যশোরকে যেমন দেখতে চাই

যশোর থেকে বর্তমানে ২৪টির মতো দৈনিক পত্রিকা অনুমোদিত ও নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে। প্রকাশনার দিক থেকে বিচার করলে ‘দৈনিক সুবর্ণভূমি’-কে বর্তমান সময়ের অন্যতম কনিষ্ঠ বা নতুন ধারা হিসেবে বিবেচনা করা যায়। ২০২৬ সালের ৬ অক্টোবর পত্রিকাটির প্রথম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পূর্ণ করলো। সে উপলক্ষে, আমি আমার স্বপ্নের যশোরের ঐতিহ্য ও গৌরব সংক্ষেপে তুলে ধরে ‘যশোরকে যেমন দেখতে চাই’ তা-ই উপস্থাপন করতে চাই পাঠকদের সামনে।

আমার স্বপ্নের যশোর: যেমন দেখতে চাই

বাংলার অন্যতম প্রাচীন জেলা যশোর, যা ১৭৮১ সালে ব্রিটিশ আমলে আনুষ্ঠানিকভাবে গঠিত হয়। ভৈরব ও কপোতাক্ষ নদের তীরে গড়ে ওঠা এই জেলাটি কেবল ভৌগোলিক কারণেই গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং এর রয়েছে হাজার বছরের এক গৌরবময় রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক ইতিহাস। ইতিহাসবিদদের মতে, রাজা বিক্রমাদিত্যের রাজধানী গৌড়ের যশ বা গৌরব হরণ করে এই অঞ্চলের সমৃদ্ধি এনেছিলেন বলে এর নামকরণ হয়েছিল ‘যশোহর’ বা ‘যশোর’।

ব্রিটিশ শাসনামলে নীল চাষের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে যশোর পরিচিতি পায়। ১৮৬০-৬১ সালের ঐতিহাসিক নীল বিদ্রোহের মূল কেন্দ্র ছিল এই জেলা, যেখানে অধিকারহারা কৃষকেরা ব্রিটিশ শোষকদের বিরুদ্ধে প্রথম রুখে দাঁড়িয়েছিল।

যশোরের মাটি ও মানুষ সবসময়ই জ্ঞান, সাহিত্য ও সমাজ সংস্কারে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। এই পুণ্যভূমিতেই জন্মগ্রহণ করেছিলেন ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রখ্যাত ইসলামি চিন্তাবিদ, সমাজ সংস্কারক ও দূরদর্শী বাগ্মী মুনসী মোহাম্মদ মেহেরউল্লাহ। ধর্মীয় মূল্যবোধ রক্ষা, কুসংস্কার দূরীকরণ এবং অবহেলিত মুসলিম সমাজের পুনর্জাগরণে তাঁর অবদান চিরস্মরণীয়। এছাড়া বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পূর্বপুরুষের আদি নিবাস যশোরে ভূমিতে। মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের স্মৃতিবিজড়িত কপোতাক্ষ নদ ও তাঁর জন্মস্থান সাগরদাঁড়ি এই জেলাতেই অবস্থিত।

বাঙালির মহান মুক্তিসংগ্রাম ও ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে যশোরের অবদান ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে। ১৯৭১ সালের ২৯ মার্চ যশোর সেনানিবাসের বাঙালি সেনারা বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। বীরত্বপূর্ণ লড়াইয়ের পর ১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর যশোর বাংলাদেশের প্রথম শত্রুমুক্ত জেলা হিসেবে স্বাধীন বাংলাদেশের মানচিত্রে আত্মপ্রকাশ করে।

স্থাপত্যশৈলী ও ঐতিহ্যের দিক থেকে চাঁচড়া রাজবাড়ি, ১৬৪৯ সালে নির্মিত মির্জানগর হাম্মামখানা, শেখপুরা শাহী মসজিদ এবং গদখালীর দেশের বৃহত্তম ফুলের বাজার যশোরের বড় আকর্ষণ। এছাড়া যশোরের বিখ্যাত খেজুরের গুড় এবং নলেন গুড়ের সন্দেশ দেশজুড়ে এর পরিচিতি ঘটিয়েছে। জ্ঞান-বিজ্ঞান, বিপ্লব আর সংস্কৃতির অনন্য মেলবন্ধনে ঐতিহ্যবাহী যশোর আজও বাংলাদেশের বুকে এক অনন্য উজ্জ্বল নক্ষত্র।

ঐতিহ্য, গৌরব আর বিপ্লবের সূতিকাগার যশোরকে শুধু ইতিহাসের পাতায় নয়, বরং আধুনিক বাংলাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও আধুনিক এক জনপদ হিসেবে দেখতে চাই। অতীত ঐতিহ্যের ভিত শক্ত রেখে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য, সমৃদ্ধ ও আধুনিক শহর হিসেবে যশোরকে গড়ে তোলার স্বপ্ন আমার চোখে।

স্মার্ট ও জ্ঞানভিত্তিক যশোর

মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত এবং সমাজ সংস্কারক মুনসী মেহেরউল্লাহর এই জন্মভূমি দেশের অন্যতম প্রধান শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক হাব হিসেবে গড়ে উঠুক—সেটি আমার কামনা। এখানে গড়ে উঠবে উন্নত বিজ্ঞান গবেষণাগার, বিশ্বমানের লাইব্রেরি এবং তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক স্মার্ট সিটি। যশোরের তরুণ প্রজন্ম যাতে আইটি সেক্টরে সারা দেশকে নেতৃত্ব দিতে পারে, সেজন্য শহরের সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্কটি আন্তর্জাতিক মানের আইটি হাব হিসেবে গড়ে উঠুক।

যানজটমুক্ত ও পরিকল্পিত নগরী

ধূলিময় আর যানজটের শহর নয়, আমি যশোরকে দেখতে চাই একটি সুপরিকল্পিত ও পরিবেশবান্ধব ‘গ্রিন সিটি’ হিসেবে। ভৈরব নদকে পুরোপুরি দূষণমুক্ত ও পুনরুজ্জীবিত করে এর দুই পাড়ে গড়ে উঠবে সুন্দর ওয়াকওয়ে ও বিনোদন কেন্দ্র। প্রশস্ত রাস্তা, উন্নত গণপরিবহন ব্যবস্থা এবং আধুনিক ড্রেনেজ ব্যবস্থার মাধ্যমে শহরটি হবে সম্পূর্ণ পরিচ্ছন্ন ও পরিবেশবান্ধব।

পর্যটন ও ঐতিহ্যের আন্তর্জাতিক কেন্দ্র

কপোতাক্ষ নদের তীরে মধুসূদনের সাগরদাঁড়ি, মুনসী মেহেরউল্লার স্মৃতিবিজড়িত স্থানসমূহ, চাঁচড়া রাজবাড়ি এবং মির্জানগর হাম্মামখানাকে চমৎকারভাবে সংরক্ষণ করে আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হোক। গদখালীর ফুলের বাজারকে আরও আধুনিকায়ন করে বিশ্বের বুকে ‘ফুলের রাজধানী’ হিসেবে ব্র্যান্ডিং করা দেখতে চাই।

অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও শিল্পায়ন

যশোরের অর্থনৈতিক সক্ষমতা হতে পারে অনেক সুদৃঢ়। বেনাপোল স্থলবন্দরের আধুনিকায়নের মাধ্যমে ব্যবসা-বাণিজ্যের ব্যাপক প্রসার ঘটানো হোক। যশোরের ঐতিহ্যবাহী ‘খেজুরের গুড়’ এবং ‘যশোরের জামদানি’ বা বুটিক শিল্প যাতে সরাসরি আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি হতে পারে, তেমন একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক কাঠামো আমি দেখতে চাই।

সুবর্ণভূমির সফল পথচলা মসৃণ হোক

বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার অন্যতম অগ্রযাত্রী, স্থানীয় পাঠকপ্রিয় সংবাদপত্র ‘দৈনিক সুবর্ণভূমি’-র নতুন আঙ্গিকে প্রিন্ট সংস্করণ প্রকাশের প্রথম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে পত্রিকাটির প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক, সাংবাদিক, কলাকুশলী এবং সকল পাঠক ও শুভানুধ্যায়ীদের জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা ও উষ্ণ অভিনন্দন।

২০২৪ সালের ৬ অক্টোবর নতুন উদ্যমে প্রিন্ট সংস্করণে যাত্রা শুরু করার পর থেকে অত্যন্ত অল্প সময়ে সুবর্ণভূমি যশোরের স্থানীয় মানুষের সুখ-দুঃখ, অধিকার ও সম্ভাবনার কথা তুলে ধরে পাঠকদের আস্থার প্রতীক হয়ে উঠেছে। নিরপেক্ষ সংবাদ পরিবেশন এবং সৃজনশীল উপস্থাপনার মাধ্যমে গণমাধ্যমটি স্থানীয় সাংবাদিকতার মানদণ্ডকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।

প্রথম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এই মাহেন্দ্রক্ষণে সুবর্ণভূমির উত্তরোত্তর সাফল্য, সমৃদ্ধি ও দীর্ঘায়ু কামনা করি। আশাবাদ ব্যক্ত করছি, আগামী দিনগুলোতেও গণমাধ্যমটি তার নীতি ও আদর্শে অবিচল থেকে সমাজ পরিবর্তনের অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে যাবে।

লেখক: মুনসী মেহেরউল্লার প্রপৌত্র ও সাবেক সেনা কর্মকর্তা

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)