যশোর, বাংলাদেশ || বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

সম্পাদকীয়

উপকূলে লবণাক্ততার চ্যালেঞ্জ: কৃষিতে নতুন সম্ভাবনা আনতে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ

প্রকাশ : বুধবার, ২৮ অক্টোবর,২০২৬, ০৯:০০ এ এম
উপকূলে লবণাক্ততার চ্যালেঞ্জ: কৃষিতে নতুন সম্ভাবনা আনতে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ

বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের কৃষি দীর্ঘদিন ধরে লবণাক্ততা, জলবায়ু পরিবর্তন, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত ও মিষ্টি পানির সংকটের মতো বহুমুখী প্রতিকূলতার মুখোমুখি। বিশেষ করে খুলনার পাইকগাছা উপজেলার সোলাদানা ইউনিয়নে বছরের দীর্ঘ সময় লবণাক্ত পানির উপস্থিতি প্রচলিত কৃষি ব্যবস্থাকে কঠিন করে তুলেছে। এমন বাস্তবতায় ঘেরের অনাবাদি উঁচু ভেড়িতে অসময়ের তরমুজ ও বিভিন্ন ধরনের সবজি চাষে স্থানীয় কৃষকদের সাফল্য নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক। এটি শুধু কৃষিতে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলছে না, বরং প্রতিকূল পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে টিকে থাকার এক কার্যকর দৃষ্টান্তও স্থাপন করছে।

সুবর্ণভূমিতে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, সোলাদানা ইউনিয়নে মাছের ঘেরের পাড়ে গত বছর প্রায় ৪০ বিঘা জমিতে অফ-সিজন তরমুজ চাষ হয়েছিল। চলতি মৌসুমে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১২৫ বিঘায়। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে চাষের জমি বেড়েছে প্রায় তিন গুণ। এই পরিসংখ্যান কৃষকদের ক্রমবর্ধমান আগ্রহ এবং উদ্যোগটির সম্ভাবনাকে স্পষ্ট করে। বিশেষত, যে জমি একসময় অনাবাদি পড়ে থাকতো, তা এখন তরমুজ, পুঁইশাক, শসা, মিষ্টিকুমড়া ও উচ্ছের মতো ফসল উৎপাদনে ব্যবহৃত হচ্ছে। একই জমিতে একাধিক ফসল চাষের এই উদ্যোগ সীমিত সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহারের একটি প্রশংসনীয় উদাহরণ।

এই সাফল্যের পেছনে কৃষকদের উদ্ভাবনী চিন্তা, পরিশ্রম এবং কৃষি বিভাগের কারিগরি সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ছালুবুনিয়া গ্রামের কৃষক হিমাদ্রি ঢালীর অভিজ্ঞতা এখানে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি পরীক্ষামূলকভাবে এক বিঘা জমিতে তরমুজ চাষ করে ২০ থেকে ২২ হাজার টাকা ব্যয়ে ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকা আয় করেছিলেন বলে জানিয়েছেন। তার সাফল্য অন্য কৃষকদেরও বাণিজ্যিকভাবে এই চাষে আগ্রহী করেছে। ফলে বলাই যায়, যথাযথ পরিকল্পনা, উপযোগী প্রযুক্তি ও মাঠপর্যায়ের পরামর্শ পেলে প্রান্তিক কৃষকেরা নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনা তৈরি করতে পারেন।

তবে এই উদ্যোগকে কেবল তাৎক্ষণিক সাফল্য হিসেবে দেখলে চলবে না। এর দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব নিশ্চিত করাও জরুরি। ঘেরের পাড়ে তরমুজ চাষের ক্ষেত্রে মিষ্টি পানির সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা, মাটির লবণাক্ততা পর্যবেক্ষণ, উন্নত বীজের প্রাপ্যতা এবং রোগবালাই দমনে পরিবেশবান্ধব পদ্ধতির ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। অফ-সিজনে বাজারে তুলনামূলক বেশি দাম পাওয়া গেলেও বাজারদরের ওঠানামা, পরিবহন ব্যয়, সংরক্ষণের সীমাবদ্ধতা এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি কৃষকের লাভ কমিয়ে দিতে পারে। তাই উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি বাজারসংযোগ, ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতকরণ ও কৃষিপণ্য বিপণনের কার্যকর ব্যবস্থাও গড়ে তুলতে হবে।

এ ক্ষেত্রে কৃষি বিভাগের দায়িত্ব অনেক। কৃষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ, প্রদর্শনী খামার স্থাপন, মানসম্মত বীজ সরবরাহ এবং ফসলের উৎপাদন ব্যয় ও লাভের তথ্য সংরক্ষণের মাধ্যমে এই চাষকে আরও পরিকল্পিত করা সম্ভব। পাশাপাশি কৃষিঋণ, শস্যবিমা এবং কৃষক সমবায়ের মতো উদ্যোগ সম্প্রসারণ করা গেলে উৎপাদনঝুঁকি মোকাবিলায় কৃষকের সক্ষমতা বাড়বে। স্থানীয় পর্যায়ে সফল কৃষকদের অভিজ্ঞতা অন্য এলাকায় ছড়িয়ে দেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ।

সবচেয়ে বড় কথা, উপকূলীয় কৃষিকে টিকিয়ে রাখতে হলে প্রতিকূলতাকে অস্বীকার নয়, বরং বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কৃষিপদ্ধতি উদ্ভাবন করতে হবে। পাইকগাছার সোলাদানা ইউনিয়নের অভিজ্ঞতা সেই পথই দেখাচ্ছে। যথাযথ সরকারি সহায়তা, বৈজ্ঞানিক গবেষণা এবং কৃষকের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে ঘেরের অনাবাদি ভেড়ি শুধু তরমুজ চাষের ক্ষেত্রেই নয়, উপকূলীয় কৃষির বহুমুখীকরণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এই সম্ভাবনাকে পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগানো গেলে কৃষকের আয় বাড়বে, জমির ব্যবহার কার্যকর হবে এবং লবণাক্ততাপ্রবণ অঞ্চলে খাদ্য উৎপাদন ও গ্রামীণ অর্থনীতির ভিত আরও শক্তিশালী হবে।

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)