যশোর, বাংলাদেশ || বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় সৃজনশীলতা

সাইফুর রহমান সাইফ

প্রকাশ : বুধবার, ২৮ অক্টোবর,২০২৬, ০১:০০ এ এম
প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় সৃজনশীলতা

ইট ইজ আ (এ) কাউ। ইংরেজি এ বাক্যের অর্থ কী? প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক খুব সহজে এর উত্তর দেবেন, ‘ইহা হয় একটি গাভী’। প্রাথমিকের একটা শিশুর কাছে কি বাংলা এই বাক্যটা পরিচিত? উত্তর ‘না’। কারণ কোনো শিশু তার মায়ের কাছ থেকে কখনো ‘ইহা’, ‘হয়’, ‘গাভী’ ধরনের শব্দ শেখে না। এমনকি শিশুর মা যদি একজন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা হন, তাহলেও না। তাই যদি হয়, তবে ইংরেজি শিখতে গিয়ে কী শিখছে শিশুরা? এর সরাসরি উত্তর—কিছুই না। কারণ ইংরেজি শিখতে গিয়ে তাদের নতুন করে বাংলা শিখতে হচ্ছে। ‘ইহা হয় একটি গাভী’ দিয়ে ‘ইট ইজ আ (এ) কাউ’-এর যে অনুবাদ করা হয়েছে, সে বাংলাটা শিশুকে নতুনভাবে শিখতে হচ্ছে।

শিশু যখন বুঝতে শেখে, মা তখন তার শিশুকে গাভী কিংবা ষাঁড় বা বাছুর দেখিয়ে বলেন, ‘ওই দেখ গরু’। মা কিংবা অন্য কারো সাথে ঘুরতে বেরিয়ে শিশু জাতপাত না বুঝে শুধু ‘গরু’ শেখে। গাভী বা অন্যকিছু শেখে না। তাকে কেউ বলে না, ‘ইহা হয় একটি গাভী’। কিন্তু বিদ্যালয়ে গিয়ে শিশুকে এটাই শিখতে হচ্ছে। অর্থাৎ তাকে ইংরেজি শিখতে গিয়ে বাংলা মুখস্থ করতে হচ্ছে। একটি ইংরেজি শিখতে গিয়ে তাকে ইংরেজির পাশাপাশি বাংলাও মুখস্থ করতে হচ্ছে। ফলে যা হওয়ার তাই হচ্ছে। শিশুর ইংরেজির প্রতি এক ধরনের ভয় সৃষ্টি হচ্ছে। অথচ মায়ের কাছ থেকে শেখা ভাষায় তাকে যদি বলা হতো, ‘এটা একটা গরু’, তবে সে খুব সহজে বুঝে যেত। নতুন করে তাকে আর বাংলা শিখতে হতো না।

বাংলায় কথা বলতে গিয়ে আমরা কখনো কি ‘হই’, ‘হয়’, ‘হও’ শব্দগুলো বলি? যেমন, ‘আমি হই ভালো আছি’ ধরনের বাক্য। না, এভাবে তো আমরা বলি না। তাহলে শিশু যখন ইংরেজি থেকে কোনো কিছুর বাংলা করছে তখন কেন এগুলো ব্যবহার করতে হবে? হ্যাঁ, এগুলোও জানার দরকার আছে। তবে তা কেবল যারা ভাষা শিখতে শুরু করেছে, তাদের জন্যে না। ব্যাকরণ বা গ্রামার শেখার সময় তারা এমনি এমনি এগুলো শিখে যাবে। তখন আর মুখস্থ করতে হবে না। কারণ ছোটবেলা থেকে সহজভাবে শিখলে বড় হয়ে কারো ইংরেজির প্রতি ভয় থাকবে না।

আমাদের দেশে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় কথিত সৃজনশীলতার গলদটার শুরু এখান থেকে। ওপরের শ্রেণিতে যেখানে সৃজনশীলতার নামে মুখস্থবিদ্যার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে, সেখানে এ সমস্যা আরো প্রকট। সেখানে শিক্ষা পদ্ধতিটা এমনভাবে করা হয়েছে, যা গাইড ও ব্যক্তিগত শিক্ষকনির্ভরতা বাড়াচ্ছে। শিক্ষার্থী নিজের মতো করে কিছু শিখতে পারছে না। অন্য কথায় শিখতে দেওয়া হচ্ছে না। বাংলা, ইংরেজি, অংক বা এরকম অন্য কোনো বিষয়ে শিক্ষার্থী তার নিজের মতো করে সঠিক উত্তর লিখলেও অনেক সময় পরীক্ষক তাকে প্রাপ্য নম্বর দেন না। কারণ ওই পরীক্ষক নিজের শেখা পদ্ধতির বাইরের অন্যসব সঠিক পদ্ধতিকে ভুল বলে মনে করেন। ফলে হোঁচট খায় শিক্ষার্থীর সৃজনশীলতা।

বাংলা একাডেমির অভিধান অনুযায়ী ‘সৃজন’ শব্দটির অর্থ হলো সৃষ্টি, নির্মাণ বা রচনা। এটি বিশেষ্য পদ। সমার্থক শব্দ: সৃষ্টি, রচনা, নির্মাণ, উৎপাদন, উদ্ভাবন। শব্দটি সংস্কৃত সৃজ্ ধাতু থেকে এসেছে।
আর ‘সৃজনশীল’ শব্দের অর্থ হলো সৃজনীশক্তিবিশিষ্ট বা সৃষ্টিশীল। যেমন—সৃজনশীল প্রতিভা।

এটি বিশেষণ পদ। এর সাথে জড়িত বিশেষ্য রূপটি হলো ‘সৃজনশীলতা’, যার অর্থ নতুন কিছু তৈরি বা উপস্থাপন করার সহজাত বা অনুশীলনলব্ধ ক্ষমতা।

বাংলা একাডেমির ভাষায় সৃজনশীল হলো এমন এক গুণ যা ব্যক্তি নিজে সৃষ্টি করে। কোনো মুখস্থবিদ্যা দিয়ে তা অর্জিত হয় না। অথচ আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় যে সৃজনশীলতা শেখানো হচ্ছে, তা কোন মানদণ্ডে সৃজনশীল তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। যদিও বলা হয়ে থাকে শিক্ষার্থীদের মুখস্থ বিদ্যার ওপর নির্ভরতা কমিয়ে তাদের চিন্তাভাবনা, বোধগম্যতা এবং প্রায়োগিক দক্ষতার মূল্যায়নের জন্যে শিক্ষাব্যবস্থায় সৃজনশীলতা যোগ করা হয়েছে। ২০০৮ সাল থেকে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে প্রচলিত এই পদ্ধতিতে একটি উদ্দীপক দেওয়া থাকে এবং সেটির ওপর ভিত্তি করে চারটি স্তরে মোট দশ নম্বরের একটি প্রশ্ন তৈরি করা হয়। এই সৃজনশীল প্রশ্নের কাঠামোতে মূলত চারটি মূল দক্ষতা বা স্তর থাকে: ১. জ্ঞানমূলক স্তর— ১ নম্বর। উদ্দেশ্য: শিক্ষার্থীর স্মৃতিশক্তি বা পাঠ্যবই থেকে তথ্য মনে রাখার ক্ষমতা যাচাই করা। যা থাকে: এটি সরাসরি তথ্যভিত্তিক প্রশ্ন। এর উত্তর উদ্দীপকে থাকে না, সরাসরি পাঠ্যবই থেকে দিতে হয়। সাধারণত ‘কী’, ‘ কে’, ‘কখন’, ‘ কোথায়’ প্রভৃতি দিয়ে প্রশ্ন করা হয়। যেমন: ‘মুক্তিযুদ্ধ কত সালে হয়েছিল?’

২. অনুধাবনমূলক স্তর—২ নম্বর। উদ্দেশ্য: শিক্ষার্থী পাঠ্যবইয়ের কোনো একটি বিষয় বা ধারণা কতটা বুঝতে পেরেছে, তা যাচাই করা। যা থাকে: এখানে কোনো বিষয় ব্যাখ্যা বা বর্ণনা করতে বলা হয়। এর উত্তরও মূলত পাঠ্যবইয়ের ধারণার ওপর ভিত্তি করে লিখতে হয়।

৩. প্রয়োগমূলক স্তর—৩ নম্বর। উদ্দেশ্য: পাঠ্যবই থেকে শেখা জ্ঞান ও অনুধাবন নতুন কোনো পরিস্থিতিতে (উদ্দীপকে) প্রয়োগ করার ক্ষমতা যাচাই করা। যা থাকে: এখানে উদ্দীপকের চরিত্রের বা ঘটনার সাথে পাঠ্যবইয়ের কোনো বিষয়ের মিল বা অমিল খুঁজে বের করতে বলা হয়। শিক্ষার্থীকে দেখাতে হয় যে, বইয়ের তত্ত্বটি উদ্দীপকের ঘটনার সাথে কীভাবে মিলে যাচ্ছে।

৪. উচ্চতর চিন্তন দক্ষতা—৪ নম্বর। উদ্দেশ্য: শিক্ষার্থীর বিশ্লেষণ, মূল্যায়ন এবং নিজস্ব মতামত প্রকাশের ক্ষমতা যাচাই করা। যা থাকে: এটি সৃজনশীল প্রশ্নের সবচেয়ে জটিল অংশ। এখানে উদ্দীপক এবং পাঠ্যবইয়ের সামগ্রিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করে কোনো একটি বক্তব্যের সত্যতা যাচাই, সার্থকতা বিচার বা সিদ্ধান্তমূলক মন্তব্য করতে বলা হয়। যেমন: উদ্দীপকের করিমের সিদ্ধান্তটি কি যথার্থ ছিল? তোমার উত্তরের সপক্ষে যুক্তি দাও।

সারকথা: বাংলাদেশের অ্যাকাডেমিক সৃজনশীলতার মূল কাঠামো হলো—উদ্দীপকের মাধ্যমে একটি বাস্তব বা কাল্পনিক প্রেক্ষাপট তৈরি করা এবং শিক্ষার্থীকে তার বইয়ের অর্জিত জ্ঞান দিয়ে সেই প্রেক্ষাপটটিকে চেনা, বোঝা, প্রয়োগ করা ও বিশ্লেষণ করতে বাধ্য করা।

এই হলো অ্যাকাডেমিক সৃজনশীলতার পক্ষে যুক্তি। এ যুক্তিগুলো শুনতে ও পড়তে যেকারো বেশ ভালো লাগবে। কিন্তু যে শিক্ষার্থী এ সৃজনশীলতার ভেতর দিয়ে যাচ্ছে, সে কোন বাস্তবতার মুখোমুখি হচ্ছে তা কি আমরা কখনো ভেবে দেখেছি? হ্যাঁ, দেখেছি। আমরা যারা অভিভাবক তারা কথিত এ সৃজনশীলতার যে কী জ্বালা তা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি!

আমরা যারা কথিত সৃজনশীলতার ভেতর দিয়ে শিক্ষা অর্জন করিনি তাদের অধিকাংশেরই কোনো ব্যক্তিগত শিক্ষক ছিল না। কেউ কেউ ইংরেজি বা অংক পড়েছে ব্যক্তিগত শিক্ষকের কাছে। তাও সারা বছর না, বছরের কিছু সময়। ‘গাইড’ নামে যে কিছু একটা থাকতে পারে, তা ছিল অজানা। এভাবে অ্যাকাডেমিক শিক্ষার সর্বোচ্চ স্তর পার করেছি আমাদের যুগের শিক্ষার্থীরা। কিন্তু এখন?

এখন মাধ্যমিক স্তরের একজন শিক্ষার্থীর গাইডে একটি কক্ষ ভরে যায়। আর ব্যক্তিগত বা গৃহশিক্ষক? তা না বলাই ভালো। প্রতিটি বিষয়ের জন্যে একজন করে না হলে চলে না। রয়েছে কোচিং। যদিও সরকারিভাবে এসবের বিরুদ্ধে ক্ষীণ প্রচারণা আছে।

এ প্রচারণার বিপরীতে বাস্তবতা ভিন্ন। দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে স্বৈরাচার শেখ হাসিনার সরকার এমনভাবে সাজিয়েছে যে, গাইড, গৃহশিক্ষক ও কোচিং ছাড়া এক শ্রেণি থেকে অন্য শ্রেণির সিঁড়ি মাড়ানো একেবারেই অসম্ভব।

২০১৫ সালের ১৮ নভেম্বর দৈনিক প্রথম আলোতে প্রতীক বর্ধন নামে এক সাংবাদিকের এ নিয়ে একটি লেখা বেরিয়েছিলো। লেখাটির শিরোনাম ছিলো, ‘সৃজনশীল কি সৃজনশীল থাকছে?’

লেখার শুরুটা ছিলো এরকম—দেশে এখন সৃজনশীল পদ্ধতিতে পাঠদান করা হচ্ছে, এ পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীদের ওপর চাপ সৃষ্টি হওয়ার কথা নয়। কিন্তু বাস্তবে এর উল্টোটাই ঘটছে। আবার এ পদ্ধতিতে গাইড বইয়ের ওপর নির্ভরশীলতা কমার কথা থাকলেও বৈপরিত্যমূলক ব্যাপার হচ্ছে, গাইডের ওপর নির্ভরশীলতা আরও বেড়েছে। এ ব্যাপারে অভিভাবকেরা অত্যন্ত উদ্বিগ্ন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে এই লেখায় হাত দেওয়া।

ওই লেখার মাঝামাঝি এসে বলা হয়, ইংরেজি আমাদের মাতৃভাষা নয়, বিদেশি ভাষা। প্রাথমিক স্তরে বিদেশি ভাষা শেখানোর প্রয়োজনীয়তা কতটুকু—সেটা নিয়েও প্রশ্ন আছে। ফলে ইংরেজির সৃজনশীল প্রশ্ন কেমন হবে, তা নিয়ে আমাদের বিস্তর চিন্তার অবকাশ আছে। কিন্তু সেটা না করে সমাপনীর নম্বর বিন্যাস করা হয়েছে এভাবে: সিন ৫০, আনসিন ৫০। ভাবখানা এমন, যেন ইংরেজি আমাদের মাতৃভাষা। মানে কি ভূতটা শর্শেতেই আছে?

আবার কমিউনিকেটিভ ইংরেজির নামে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের ইংরেজি ব্যাকরণ পড়ানো হচ্ছে না, এমনকি সাহিত্যও নয়। সাহিত্য না পড়লে কি ভাষা শেখা সম্ভব?

...সমস্যা হচ্ছে, সৃজনশীল পদ্ধতি প্রয়োগ করার আগে আমাদের যে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া দরকার ছিল, সেটা আমরা নিতে পারিনি। ...মোদ্দা কথা হলো, সৃজনশীল পদ্ধতিতে শিক্ষকদের সবচেয়ে বেশি সৃজনশীল হতে হবে। সেটা নিশ্চিত না করে এ ব্যবস্থা প্রবর্তন করলে তো হবে না।...

সৃজনশীল শিক্ষা পদ্ধতি নিয়ে ওই লেখকের মূল্যায়ন ছিলো এরকম।

এশিয়া প্যাসিফিক রিজিওনাল নেটওয়ার্ক ফর আর্লি চাইল্ডহুডের স্টিয়ারিং কমিটির সদস্য মাহমুদা আখতারের ‘শিশুর প্রারম্ভিক বিকাশ’ নিয়ে অনেক গবেষণা আছে। এক গবেষণায় তিনি দেখিয়েছেন, প্রতিটি শিশু ১০০ বিলিয়ন নিউরন নিয়ে জন্ম নেয়। প্রথমাবস্থায় তা শূন্য থাকে। আস্তে আস্তে তা পূরণ হতে থাকে। তার স্বাভাবিক বিকাশে তাই তার চারপাশের পরিমণ্ডলকে ইতিবাচক আচরণ করতে হয়। যার একটি বড় অংশ করে থাকে তার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। শিক্ষাব্যবস্থা তার উপযোগী না হলে সে শিশুর বিকাশ যেভাবে হওয়ার কথা সেভাবে হয় না। তাইতো আমাদের শিশুর চেয়ে উন্নত বিশ্বের শিশুর মেধার বিকাশ সাধারণত ভালো হয়ে থাকে।

পরিশেষে এটুকু বলবো, যে শিক্ষা শিশুকে আনন্দদানের মাধ্যমে বেড়ে উঠতে সাহায্য করে, আমাদের দেশে সে শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তন জরুরি হয়ে পড়েছে।

লেখক: সাংবাদিক, শিক্ষক

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)