মো. মিজানুর রহমান
জলাশয়ের সকল মাছ একই স্তরে অবস্থান করে না। তারা নিজেদের শারীরিক গঠন এবং খাদ্যাভ্যাস বিবেচনায় পানির বিভিন্ন স্তরে অবস্থান করে। অগভীর জলের মাছ (রুই, কাতল, মৃগেল, গ্রাস কার্প) নদী/পুকুরের উপরিভাগের খাবার বেশি খায় এবং উপরেই অবস্থান করে। তারা আকারেও বড় হয়ে থাকে। ডাঙায় তোলা হলে এরা লেজের দুই-চারটি বাড়ি দিয়েই পটলের ঝোলে নিজেদের মিলিয়ে নেয়। গভীর জলের মাছ (শিং, মাগুর) সাধারণত তলদেশের খাবার খায় এবং পুকুর/নদীর তলদেশেই অবস্থান করে। গভীর জলের মাছেরা কাদার উপরিভাগেই থাকে। চাপে পড়লেই কাদায় ঢুকে পড়ে। তারা আকারে ছোট এবং শক্ত প্রাণ। ডাঙায় এসেও তারা বীরের বেশে চলতে চেষ্টা করে। গিন্নির হাতের আছাড় অথবা লবণের ছ্যাঁকায় তাদের জীবন যায়। তারা ঝোলে ডুবে নিজ নামের তরকারি হয়। গভীরের গভীরে যেসকল মাছের (বাইন, কুঁচে) অবস্থান তারা থাকে কাদার ভেতরে অর্থাৎ অন্তরের অন্তস্তলে। তাদের সাইজ সব রকমেই হয়। গভীর-অগভীর উভয়ের সাইজেই তারা যেতে পারে। এর মধ্যে কুঁচের প্রাণ এতোই শক্ত যে, খাশির মতো গাছের ডালে ঝুলিয়ে এদের ছাল ছাড়াতে হয়। বাইন মাছ নারকেলের দুধে প্রকৃত স্বাদে ফেরে। কুঁচে নিয়ে ক্যাচালে যাওয়া উচিত হবে না।
জলাশয়ের পানি শুকিয়ে গেলে অন্যান্য মাছ যেমন হাত দিয়ে সহজে ধরা যায় বাইন, শিং, মাগুর ইত্যাদি সহজে ধরা যায় না। তারা অল্পেই কাদার মধ্যে নিজেকে লুকিয়ে ফেলতে সক্ষম। এ কারণে এসব মাছ হাত দিয়ে ধরতে চাইলে অবশ্যই কাদাসহ তুলতে হবে এবং মাছ ধরে ধুতে যাওয়া উচিত হবে না। তাতে হাত ফসকে বেরিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। তখন মনে হবে ‘ধোয়ার চেয়ে না ধোয়াই ছিল ভালো, ধুতে গিয়ে সব গেল।’ গভীর এবং গভীরের গভীরে অবস্থান করায় তাদেরকে খালি হাতে সামলাতে যাওয়া বোকামি। কাদাসহ তুলতে হয়। যেহেতু তাদের চারপাশে কাদা থাকে সেহেতু তারা ভাবে যে, তারা তাদের অবস্থানেই স্থির আছে। যাকে বলে মূলোৎপাটন। তবে বঁড়শিতে টোপ পছন্দসই হলে অন্তস্তল থেকেও মাছ বের হয়ে আসে। এক্ষেত্রে সব মাছের পরিচয় একই ছিপে বাঁধা মাছ বা টোপে ধরা মাছ। গভীরে ভাবলে দেখা যায় যে, সব মাছেই টোপ খায়, দোষ হয় টাকির।
এবার মূল আলোচনায় আসি। আমরা মনুষ্য জাতিতে জাত ভেদাভেদ বা ধর্ম ভেদাভেদ নানারকম হতে পারে। তবে অন্যায় কিন্তু জাতভেদে, ধর্মভেদে ভিন্ন হয় না। যেগুলোকে আমরা বড় অন্যায় বলে বিবেচনা করি তা যেমন ছোট জাতের মানুষ করতে পারে, তেমনি বড় জাতের মানুষও করতে পারে এবং সব ধর্মের মানুষই করতে পারে। কিন্তু বিপদ হয় ছোটদের ক্ষেত্রে, সংখ্যালঘুদের ক্ষেত্রে। এরা জাতে ছোট, সংখ্যায় ছোট, তাই সকল দায় এদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া সহজ হয়। এযাবৎকালে সমগ্র বিশ্বে যত বড় বড় অন্যায় হয়েছে তার অধিকাংশ বড়দের হাতেই হয়েছে এবং এই সব বড় বড় অন্যায়ে তারা বড় বড় টোপ ব্যবহার করেছে। যাদের টোপে পড়ার কথা নয়, তারাই ফেঁসে গেছে। মাঝখানে টাকির মতো ছোটরা দায় নিয়ে ছুটে বেড়ায়। বাংলাদেশের রাজনীতি, সমাজনীতি ও অর্থনীতিতে যে সকল বড় বড় পরিকল্পিত অন্যায় ঘটে তা গ্রামের অশিক্ষিত, গরিবের হাত ধরে হয় না; শহরের হকার, কর্মকার, চর্মকারের হাত ধরে হয় না। উচ্চ স্তরের মানুষেরা লোভ নামক টোপে আকৃষ্ট হয় এবং এই লোভকে ছোট ছোট আদার বা টোপ (মাছের) বানিয়ে ছোটদেরকে (প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষ) আকৃষ্ট করে নিজের উদ্দেশ্য অর্জন করে নেয়। বিপদের দিনে ‘ছোটলোক’ বলে আবার এদেরকেই ফাঁসিয়ে দেওয়া হয়, এদের ফাঁসি হয় এবং নিউজ মিডিয়ায় দেশ কলঙ্কমুক্ত হয়। বাস্তবে কালি যা থাকার তা থেকেই যায়। মানুষ ভুলে যায় যে, সব মাছে টোপ খায়, শুধু দোষ হয় টাকির। কাজেই বড় বড় অন্যায়কে রুখে দিতে চাইলে গভীর জলের মাছের মতো এসকল অন্যায়কারীকে মূলোৎপাটন করতে হবে। বড়দেরও বিচারের আওতায় আনতে হবে এবং শাস্তি বাস্তবায়ন করে দেশে আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
লেখক: কবি ও কথাসাহিত্যিক