সম্পাদকীয়
জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষয়ক্ষতি বলতে আমরা সাধারণত ভেঙে যাওয়া বাঁধ, প্লাবিত জনপদ, নষ্ট ফসল কিংবা হারিয়ে যাওয়া বসতভিটার হিসাব বুঝি। কিন্তু এই হিসাবের বাইরে থেকে যায় মানুষের দীর্ঘশ্বাস, বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া পরিবার, নিঃসঙ্গ প্রবীণ, বিপন্ন নারীর জীবন এবং হারিয়ে যেতে বসা লোকজ সংস্কৃতি। সাতক্ষীরার আশাশুনি, শ্যামনগর ও গাবুরার বাস্তবতা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, জলবায়ু সংকট কেবল পরিবেশের বিপর্যয় নয়; এটি মানুষের জীবন, জীবিকা, মর্যাদা ও অস্তিত্বের সংকট।
সুবর্ণভূমিতে প্রকাশিত দুটি প্রতিবেদনে উঠে আসা শাহজাহান আলী ও রাবেয়া বেগমের জীবনের দিকে তাকালে এই সংকটের মানবিক গভীরতা উপলব্ধি করা যায়। একসময় সচ্ছল পরিবার, জমিজমা ও স্বজনদের নিয়ে তাদের সংসার ছিল পরিপূর্ণ। ২০২০ সালের ঘূর্ণিঝড় আম্পানের পর বাঁধ ভেঙে নোনা পানির প্রবেশ সেই জীবন তছনছ করে দেয়। জীবিকার সন্ধানে ছেলেরা দূরে চলে গেছেন, সঙ্গে নিয়ে গেছেন সন্তানদেরও। এখন বার্ধক্য ও অসুস্থতার ভার নিয়ে নিঃসঙ্গ জীবন কাটছে এই দম্পতির। এটি বিচ্ছিন্ন কোনো পরিবারের গল্প নয়; উপকূলের বহু মানুষের জীবনে একই সংকটের প্রতিচ্ছবি।
লবণাক্ততা কৃষির সম্ভাবনা সংকুচিত করছে, নদীভাঙন কেড়ে নিচ্ছে বসতভিটা, আর কর্মসংস্থানের অভাব মানুষকে বাধ্য করছে ভিটেমাটি ছেড়ে অন্যত্র যেতে। গাবুরার অভিজ্ঞতা দেখায়, ধান চাষের মৌসুমে যেখানে বহু শ্রমিকের কাজের সুযোগ ছিল, সেখানে লবণপানির মাছ বা চিংড়ি চাষে শ্রমিকের প্রয়োজন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে। ফলে কর্মক্ষম তরুণেরা শহরমুখী হচ্ছেন; গ্রামে থেকে যাচ্ছেন প্রবীণ বাবা-মায়েরা। এই স্থানান্তরকে শুধু মানুষের স্থান পরিবর্তন হিসেবে দেখলে চলবে না। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পারিবারিক দায়িত্বের পুনর্বণ্টন, সামাজিক নিরাপত্তার দুর্বলতা এবং একাকিত্বের বিস্তার।
সংকটের আরেকটি গভীর দিক হলো সংস্কৃতি ও সামাজিক বন্ধনের ক্ষয়। বনবিবির পূজা, কবিগান, নৌকাবাইচ কিংবা স্থানীয় উৎসব কেবল বিনোদনের আয়োজন নয়; এগুলো উপকূলের মানুষের ইতিহাস, বিশ্বাস ও পারস্পরিক নির্ভরতার বাহক। জীবিকার তাগিদে মানুষ যখন বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, তখন এসব ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতাও ভেঙে যায়। তাই জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি নিরূপণে শুধু আর্থিক লোকসানের হিসাব যথেষ্ট নয়। হারানো সংস্কৃতি, মানসিক যন্ত্রণা ও সামাজিক সম্পর্কের অপূরণীয় ক্ষতিকেও গুরুত্ব দিতে হবে।
এ পরিস্থিতিতে সাময়িক ত্রাণ দিয়ে দায়িত্ব শেষ করার সুযোগ নেই। প্রয়োজন ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধের টেকসই নির্মাণ ও সংস্কার, সুপেয় পানির নিশ্চয়তা, কৃষিজমির লবণাক্ততা মোকাবিলায় কার্যকর উদ্যোগ এবং উপকূলের উপযোগী বিকল্প কর্মসংস্থান। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য পরিকল্পিত পুনর্বাসন, সহজ শর্তে কৃষিঋণ ও স্থানীয় উদ্যোক্তা তৈরির ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি প্রবীণদের সামাজিক সুরক্ষা, নারীদের সহায়তা এবং দুর্যোগ-পরবর্তী মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা জরুরি। যারা বাস্তুচ্যুত হতে বাধ্য হয়েছেন, তাদের নিরাপদ আবাসন ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনের অধিকারও রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনায় অগ্রাধিকার পেতে হবে।
জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য বাংলাদেশের দায় তুলনামূলকভাবে কম হলেও এর অভিঘাত বহন করতে হচ্ছে দেশের উপকূলের মানুষকে। তাই আন্তর্জাতিক জলবায়ু তহবিল ও ক্ষতিপূরণ আদায়ের প্রচেষ্টার পাশাপাশি সেই অর্থের স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও ন্যায্য ব্যবহার নিশ্চিত করা প্রয়োজন। বিশেষত সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
উপকূল রক্ষা মানে শুধু বাঁধ রক্ষা নয়; মানুষের শিকড়, সংস্কৃতি, পারিবারিক বন্ধন ও ভবিষ্যৎ রক্ষা করা। আজ কার্যকর ও সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া না হলে আগামী দিনে আরও মানুষ ভিটেমাটি হারাবে, আরও প্রবীণ নিঃসঙ্গ হবেন, আরও ঐতিহ্য হারিয়ে যাবে বিস্মৃতির অতলে। নোনা পানির বিস্তার ঠেকানোর পাশাপাশি এই নীরব মানবিক বিপর্যয় ঠেকানোও এখন রাষ্ট্র, সমাজ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জরুরি দায়িত্ব।