সম্পাদকীয়
নদীমাতৃক বাংলাদেশের মানুষের জীবনে নদী যেমন আশীর্বাদ, তেমনি কখনো কখনো তা হয়ে ওঠে সর্বনাশের কারণ। নদীভাঙনে বসতভিটা, ফসলি জমি ও জীবিকার অবলম্বন হারানোর ঘটনা এ দেশে নতুন নয়। কিন্তু বছরের পর বছর একই জনপদের মানুষকে ভাঙনের মুখে অসহায়ভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা শুধু প্রাকৃতিক দুর্যোগের বাস্তবতা নয়, বরং দুর্যোগ মোকাবিলায় পরিকল্পিত ও কার্যকর উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তার কথাও স্মরণ করিয়ে দেয়। নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলার জয়পুর ইউনিয়নের আমডাঙ্গা এলাকায় মধুমতী নদীর ভয়াবহ ভাঙন সেই বাস্তবতারই এক মর্মান্তিক উদাহরণ।
সুবর্ণভূমিতে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, আমডাঙ্গা এলাকায় প্রায় তিন কিলোমিটারজুড়ে নদীভাঙন ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। চলতি মৌসুমে শতাধিক পরিবারের বসতভিটা, কয়েকশ’ একর ফসলি জমি, গাছপালা ও বিভিন্ন স্থাপনা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। হারিয়ে গেছে এলাকার একটি বড় মসজিদও। এখন হুমকির মুখে রয়েছে আমডাঙ্গা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও গ্রামের পাকা সড়ক। অর্থাৎ, ভাঙনের পরিধি কেবল ব্যক্তিগত সম্পদের ক্ষতিতেই সীমাবদ্ধ নেই; এটি শিক্ষা, যোগাযোগ, ধর্মীয় স্থাপনা তথা জনপদের অস্তিত্বের জন্যও হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সবচেয়ে বেদনাদায়ক বিষয় হলো, এই দুর্ভোগ আমডাঙ্গার মানুষের কাছে নতুন নয়। স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, গত এক দশকে অব্যাহত ভাঙনে অসংখ্য পরিবার নিঃস্ব হয়েছে। কারও বসতভিটা একাধিকবার নদীতে বিলীন হয়েছে, কেউ হারিয়েছেন ফসলি জমি ও ঘরবাড়ি—যা ছিল তাদের জীবিকা ও নিরাপদ আশ্রয়ের অবলম্বন। নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য পুনর্বাসন ও বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থা না থাকলে তাদের দারিদ্র্য আরও গভীর হয়। তাই এই সংকটকে কেবল ভৌগোলিক পরিবর্তন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; এটি একই সঙ্গে মানবিক ও অর্থনৈতিক সংকট।
ভাঙন মোকাবিলায় পানি উন্নয়ন বোর্ড বালুভর্তি জিও ব্যাগ ফেলে অস্থায়ী প্রতিরোধের চেষ্টা করছে। জরুরি পরিস্থিতিতে এমন উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করা যায় না। তবে প্রায় তিন কিলোমিটার এলাকাজুড়ে তীব্র ভাঙনের বিপরীতে বিচ্ছিন্ন অস্থায়ী ব্যবস্থা কতটা কার্যকর, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। প্রতিবছর ভাঙন তীব্র হলে জরুরি ব্যবস্থা নেওয়া হবে, আর বর্ষা শেষে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলে স্থায়ী সমাধানের বিষয়টি অনিশ্চয়তায় পড়ে থাকবে—এভাবে চলতে পারে না। এতে সরকারি অর্থ ব্যয়ের পাশাপাশি মানুষের জীবন ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতিও বাড়তে থাকে।
নড়াইল পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলীর বক্তব্য অনুযায়ী, আমডাঙ্গা এলাকায় ভাঙন প্রতিরোধে এক হাজার ৭০০ মিটার স্থায়ী তীররক্ষা প্রকল্পের প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। এটি আশাব্যঞ্জক উদ্যোগ হলেও প্রস্তাব পাঠানো আর বাস্তবায়নের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। প্রকল্পটির চূড়ান্ত অনুমোদন, প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ এবং যথাসময়ে কাজ শুরু করার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। একই সঙ্গে নদীভাঙনের পেছনে বালু উত্তোলনের ভূমিকা থাকলে তা যাচাই করে অবৈধ বা ক্ষতিকর উত্তোলন বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
আমডাঙ্গা রক্ষায় এখন প্রয়োজন সমন্বিত ও সময়োপযোগী উদ্যোগ। স্থায়ী তীররক্ষা বাঁধ নির্মাণের পাশাপাশি ভাঙনপ্রবণ এলাকার বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন, নিয়মিত নদী পর্যবেক্ষণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনা সুরক্ষায় জরুরি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। যেসব পরিবার ইতিমধ্যে সর্বস্ব হারিয়েছে, তাদের পুনর্বাসন ও আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থাও নিশ্চিত করা দরকার। বিশেষ করে বিদ্যালয় ও সড়কের মতো গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো রক্ষায় বিলম্ব করা উচিত নয়।
নদীভাঙন পুরোপুরি বন্ধ করা সব ক্ষেত্রে সম্ভব না হলেও পরিকল্পিত প্রতিরোধ ও দ্রুত পদক্ষেপের মাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতি অনেকটাই কমানো যায়। আমডাঙ্গার মানুষ আর আশ্বাসের পুনরাবৃত্তি চান না; তারা চান নিরাপদ বসতভিটা, ফসলি জমি এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে নিশ্চয়তা। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মনে রাখা প্রয়োজন, প্রতিটি বিলীন হওয়া বাড়ির সঙ্গে হারিয়ে যায় একটি পরিবারের সঞ্চয়, স্মৃতি ও নিরাপদ জীবনের স্বপ্ন। তাই মধুমতীর ভাঙন রোধে স্থায়ী তীররক্ষা বাঁধ নির্মাণের প্রস্তাব দ্রুত বাস্তবায়নই হোক অগ্রাধিকার। সময়মতো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া গেলে হয়তো রক্ষা পাবে একটি জনপদ, বাঁচবে বহু মানুষের বেঁচে থাকার অবলম্বন।