তসলিম শিমুল
, যশোর
বিশ্বকাপ ফুটবলকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রীড়া উৎসব হিসেবে দেখা হয়। তবে এই আসরের ইতিহাসে কিছু অন্ধকার অধ্যায়ও রয়েছে। তেমনই একটি ঘটনা জড়িয়ে আছে হাইতির ফুটবলার আর্নস্ট ইয়ান-জোসেফকে ঘিরে, যিনি বিশ্বকাপ ইতিহাসের প্রথম ডোপিং-অপরাধে নিষিদ্ধ খেলোয়াড়।
লালচে চুলের এই ডিফেন্ডার ১৯৭২ সালে প্রথমবার হাইতির জাতীয় দলে সুযোগ পান। এরপর ১৯৭৪ সালের বিশ্বকাপ দলে স্থান করে নেন। সে বছর পশ্চিম জার্মানিতে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে হাইতির প্রথম ম্যাচ ছিল ইতালির বিপক্ষে। ম্যাচটি ৩-১ গোলে হারে হাইতি।
ম্যাচ শেষে নিয়মিত ডোপ পরীক্ষায় আর্নস্ট ইয়ান-জোসেফের নমুনায় নিষিদ্ধ উদ্দীপক ফেনমেট্রাজিন পাওয়া যায়। ফিফার তৎকালীন অ্যান্টি-ডোপিং কমিটির প্রধান ডা. গটফ্রিড শোয়েনহলজার তাকে তাৎক্ষণিকভাবে বিশ্বকাপ থেকে নিষিদ্ধ করেন। এটাই ছিল বিশ্বকাপ ইতিহাসে ডোপিংয়ের কারণে প্রথম নিষেধাজ্ঞার ঘটনা।
প্রথমে ইয়ান-জোসেফ দাবি করেছিলেন, হাঁপানির চিকিৎসার জন্য তিনি ওষুধটি নিয়েছিলেন এবং এতে নিষিদ্ধ উপাদান রয়েছে তা তিনি জানতেন না। তবে দলের চিকিৎসক জানান, তার হাঁপানির কোনো সমস্যা ছিল না। পরে ইয়ান-জোসেফ স্বীকার করেন যে পারফরম্যান্স বাড়ানোর উদ্দেশ্যেই তিনি ওই ওষুধ গ্রহণ করেছিলেন।
তবে তার আতঙ্কের কারণ শুধু ফিফার শাস্তি ছিল না। সেই সময় হাইতি ছিল ডুভালিয়ে পরিবারের স্বৈরশাসনের অধীনে। ১৯৫৭ থেকে ফ্রাঁসোয়া ডুভালিয়ে, যিনি ‘পাপা ডক’ নামে পরিচিত ছিলেন, এবং পরে তার ছেলে জাঁ-ক্লদ ডুভালিয়ে বা ‘বেবি ডক’ দেশ শাসন করেন। তাদের ক্ষমতার প্রধান ভিত্তি ছিল কুখ্যাত গোপন পুলিশ বাহিনী টঁটঁ মাকুত।
টঁটঁ মাকুতের বিরুদ্ধে বিরোধিতা বা অভিযোগ করার সুযোগ ছিল না। যাদের তারা ধরে নিয়ে যেত, অনেকেই আর ফিরে আসতেন না। ইয়ান-জোসেফ জানতেন হাইতির বিখ্যাত ফুটবলার জো গ্যাতজেঁসের পরিণতির কথা। ১৯৬৪ সালে রাজনৈতিক কারণে তাকে অপহরণ করা হয়েছিল এবং এরপর আর কখনও তার খোঁজ মেলেনি।
ডোপিং-কাণ্ড প্রকাশ্যে আসার পর মিউনিখে অবস্থানরত ইয়ান-জোসেফ ভয়ে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। জানা যায়, তিনি একজন জার্মান হোস্টেসের সাহায্য চেয়েছিলেন। পরে বিষয়টি ফিফার কর্মকর্তাদের কাছেও পৌঁছায়।
বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, বিশ্বকাপ চলাকালীন টঁটঁ মাকুতের সদস্যরা তাকে জার্মানির একটি স্পোর্টস সেন্টার থেকে নিয়ে গিয়ে একটি হোটেলে আটকে রাখে। পরদিন তাকে বিমানে করে হাইতিতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
হাইতিতে ফেরার পর তার সঙ্গে ঠিক কী ঘটেছিল, সে বিষয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায় না। ইয়ান-জোসেফ নিজেও এ বিষয়ে প্রকাশ্যে খুব বেশি কথা বলেননি। তবে দীর্ঘদিন ধরে গুঞ্জন ছিল, তাকে শাস্তি হিসেবে শারীরিক নির্যাতনের মুখে পড়তে হয়েছিল এবং তার একটি হাত ভেঙে দেওয়া হয়েছিল।
ফিফার এক বছরের নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ার পর ইয়ান-জোসেফ আবারও হাইতির জাতীয় দলে ফেরেন। তিনি ১৯৭৮ ও ১৯৮২ বিশ্বকাপের বাছাইপর্বেও খেলেন।
২০২০ সালের ১৪ আগস্ট আর্নস্ট ইয়ান-জোসেফ মৃত্যুবরণ করেন। তার জীবনকাহিনি বিশ্বকাপ ইতিহাসে প্রথম ডোপিং-কাণ্ড এবং স্বৈরশাসনের ভয়ের এক বিরল দলিল হয়ে আছে।