যশোর, বাংলাদেশ || শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

সাতক্ষীরায় নদীর নেট-পাটা অপসারণ শুরু আজ

আসাদুজ্জামান সরদার

, সাতক্ষীরা

প্রকাশ : শুক্রবার, ১৭ জুলাই,২০২৬, ১১:২৩ পিএম
আপডেট : শনিবার, ১৮ জুলাই,২০২৬, ০২:১২ এ এম
সাতক্ষীরায় নদীর নেট-পাটা অপসারণ শুরু আজ

সাতক্ষীরায় আজ শনিবার (১৮ জুলাই) নেট-পাটা অপসারণে নামছে প্রশাসন।

নদ-নদী ও নৌ-খালগুলোর স্বাভাবিক গতিপ্রবাহ ফিরিয়ে আনতে এবং নাব্য রক্ষায় অবৈধ দখলদারদের চিহ্নিত করে একটি পূর্ণাঙ্গ উচ্ছেদ কর্মপরিকল্পনা প্রস্তুত করেছে সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসন।

জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের কঠোর নির্দেশনার প্রেক্ষিতে স্থানীয় সহকারী কমিশনারদের (ভূমি) সরেজমিন তদন্ত ও পুনরায় যাচাইয়ের ভিত্তিতে এই বিশেষ তালিকা চূড়ান্ত করা হয়েছে।

জেলা প্রশাসনের রাজস্ব (এসএ) শাখা থেকে ইতিমধ্যে এই দীর্ঘমেয়াদী কর্মপরিকল্পনাটি জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যানের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে পাঠানো হয়েছে। একই সাথে জনসচেতনতা বাড়াতে জেলা প্রশাসনের অফিসিয়াল ওয়েব পোর্টালে এই উচ্ছেদ রূপরেখা ও ৩০২ জন অবৈধ দখলদারের তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে।

জেলা প্রশাসনের প্রস্তুতকৃত প্রতিবেদন ও উচ্ছেদ পরিকল্পনা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, জেলার প্রধান ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নদী কপোতাক্ষ, ইছামতি, বেতনা এবং বিভিন্ন সংযোগ খাল দীর্ঘকাল ধরে স্থানীয় প্রভাবশালী ও ভূমিগ্রাসীদের অবৈধ দখলে রয়েছে। নদী অববাহিকার সরকারি জমি গ্রাস করে দখলদাররা গড়ে তুলেছে স্থায়ী ও অস্থায়ী টিনের ঘর, বিশাল সীমানা প্রাচীর, বাণিজ্যিক মাছের ঘের, পুকুর, আমবাগান ও ফসলি জমি। এমনকি কিছু কিছু মৌজায় নদীর বুক চিরে গড়ে তোলা হয়েছে পরিবেশবিধ্বংসী বাণিজ্যিক ইটভাটা এবং শিল্প-কারখানার শেড বা ছাউনি।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, সাতক্ষীরা সদর উপজেলার রাধানগর মৌজায় ইছামতি নদীর তীরবর্তী দশজন বড় দখলদারকে চিহ্নিত করা হয়েছে, যারা নদীর বিস্তীর্ণ জায়গা দখল করে আছেন। অন্যদিকে, বিনেরপোতা মৌজায় বেতনা নদীর মূল সীমানা গ্রাস করে অবৈধ সীমানা প্রাচীর এবং ফ্যাক্টরির বিশাল ছাউনি নির্মাণের তথ্য মিলেছে।
জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, বেতনা নদীর এই দখলদারদের উচ্ছেদের জন্য ইতিমধ্যে সর্বশেষ নোটিস প্রদান করা হয়েছে এবং উচ্ছেদ কার্যক্রম বর্তমানে মাঠ পর্যায়ে চলমান রয়েছে।

এছাড়া সদর উপজেলার বিভিন্ন মৌজায় ‘নৌ-খাল’ দখল করে অবাধে ধান ও মাছ চাষ করার প্রমাণ পাওয়া গেছে। বিশেষ করে বাবুলিয়া মৌজায় ‘কামরুল এসবিবি’ ও ‘মনির এসবিএল’ নামে দুটি ইটভাটা নদীর সীমানার ভেতরে গড়ে তোলার চূড়ান্ত প্রমাণ মিলেছে।

প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের নির্দেশনায় জেলার প্রতিটি নদ-নদীর অবৈধ দখলদারদের তালিকা মাঠ পর্যায়ে এসিল্যান্ডদের মাধ্যমে আবার যাচাই করা হয়েছে। নদী রক্ষায় জেলা প্রশাসন ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করেছে। বেতনা নদীতে উচ্ছেদ কার্যক্রম চলমান রয়েছে এবং অন্যান্য স্থানেও দ্রুত ভ্রাম্যমাণ উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হবে। চ্যালেঞ্জ থাকলেও নদী ও পরিবেশের স্বার্থে কোনো আপস করা হবে না। বর্ষা মৌসুম পুরোপুরি শুরু হওয়ার আগেই এসব অতি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা পুরোপুরি উদ্ধার করার জন্য সর্বোচ্চ ৫০ দিন পর্যন্ত সময়সীমা নির্ধারণ করে একটি ক্র্যাশ প্রোগ্রাম সাজানো হয়েছে।

সরকারি এই প্রতিবেদনে সবচেয়ে ভয়াবহ দখলদারত্বের চিত্র ফুটে উঠেছে তালা উপজেলার মাগুরা, জগদানন্দকাটি, পুটিয়াখালী, রাজেন্দ্রপুর ও জালালপুর মৌজায় কপোতাক্ষ নদের অববাহিকায়। এখানে শতাধিক ব্যক্তি নদীর মূল জায়গা দখল করে স্থায়ী ও অস্থায়ী টিনের ঘর তুলে বসবাস করছেন। জেলা প্রশাসন এই কপোতাক্ষ নদের দখলদারদের সরাতে ‘ভ্রাম্যমাণ উচ্ছেদ অভিযান’ বা মোবাইল কোর্ট পরিচালনার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কপোতাক্ষ নদের উচ্ছেদ পরিকল্পনার পথে বড় দুটি অন্তরায় বা চ্যালেঞ্জ সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করেছে জেলা প্রশাসন। প্রথমত, মাঠ পর্যায়ে উচ্ছেদ অভিযান জোরালো ও একযোগে পরিচালনা করার ক্ষেত্রে জনবলের প্রকট অভাব ও প্রয়োজনীয় লজিস্টিক সংকট রয়েছে। দ্বিতীয়ত, এই নদী অববাহিকা দখল করে যারা বসবাস করছেন, তাদের একটি বড় অংশই প্রকৃত ভূমিহীন পরিবার। ফলে মানবিক দিক বিবেচনা এবং তাদের পুনর্বাসনের জটিল বিষয়টি উচ্ছেদ অভিযানের অন্যতম মূল সামাজিক বাধা হিসেবে দেখা দিয়েছে।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)-এর সাতক্ষীরা জেলা সম্পাদক এবং নদী সুরক্ষা বিষয়ক জাতীয় কমিটির সদস্য মাধবচন্দ্র দত্ত বলেন, ‘প্রাক্টিক্যালি আমাদের যে নদী আইন এবং পরবর্তীতে সংশোধিত যে নদী আইনটি হয়েছে, সেটা যদি গুরুত্ব দিয়ে মাঠে সঠিকভাবে পালন করা হয়, তাহলে মানুষজন নদী দখল ও দূষণ থেকে পিছিয়ে আসবে। তবে তার আগে যেটি সবচেয়ে বেশি দরকার, সেটি হচ্ছে জনগণকে সচেতন করা। নদী আসলে একটি জীবন্ত সত্তা; নদী না বাঁচলে সাতক্ষীরা বাঁচবে না, নদী না বাঁচলে আমাদের প্রাণ-প্রকৃতি বাঁচবে না। ফলে নদীকে কখনো ব্যক্তিগত সম্পদ বা সম্পত্তি হিসেবে ব্যবহার করলে হবে না; এটি রাষ্ট্রীয় সম্পদ এবং রাষ্ট্রীয় আইন দ্বারা বিধিবদ্ধ। যারা দখল ও দূষণ করছেন, তাদের বিরুদ্ধে আইনের সঠিক প্রয়োগ করলেই নদী সুরক্ষিত হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা দেখেছি যে, প্রশাসনের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে সাতক্ষীরার প্রায় সাড়ে তিনশত নদী দখলকারীর তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। যদি তালিকাটি চূড়ান্ত হয়েই থাকে, তবে চিহ্নিত করার পরেও এই নদী দখলদারদের উচ্ছেদ করতে প্রশাসনের ব্যর্থতা বা দেরি কেন? আমি মনে করি, যেহেতু তারা চিহ্নিত, তাই প্রশাসনকে অবশ্যই আইনের প্রয়োগ করে তাদের দ্রুত উচ্ছেদ করতে হবে। আর এই আইন প্রয়োগ করতে গিয়ে যদি কোনো বাধা-বিঘ্ন আসে, তবে প্রশাসনকে অত্যন্ত কঠোর হাতে সেটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। নাগরিক কমিটির পক্ষ থেকে আমরা প্রশাসনের কাছে এটাই জোর দাবি জানাচ্ছি।’

সাতক্ষীরার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মইনুল ইসলাম মইন বলেন, ‘জেলা প্রশাসনের এই উচ্ছেদ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে আমরা ইতিমধ্যেই পুরোদমে কাজ শুরু করেছি। প্রথমত, উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনার জন্য ভূমি মন্ত্রণালয়ের কাছে প্রয়োজনীয় বাজেট বা বরাদ্দ চাওয়া হবে। বরাদ্দ পাওয়া গেলেই ক্রমান্বয়ে সব দখলদারদের উচ্ছেদে মূল অভিযান শুরু হবে। তবে আজ শনিবার (১৮ জুলাই) থেকেই আমরা নেটপাটার বিরুদ্ধে প্রাথমিক অভিযান শুরু করছি, এর পরপরই বড় দখলদারদের হাত থেকে নদীর জায়গা উদ্ধার করা হবে। পুরো প্রক্রিয়াটি জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন থেকে সরাসরি মনিটর বা তদারকি করা হচ্ছে, তাই উচ্ছেদের ক্ষেত্রে ছোট-বড় বা প্রভাবশালী কেউ কোনো ছাড় পাবেন না। এছাড়া নদী রক্ষা ও পুনঃদখল ঠেকাতে উদ্ধারকৃত জায়গাগুলোতে বনায়ন করার মূল পরিকল্পনা রয়েছে আমাদের।’

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)