সুবর্ণভূমি ডেস্ক
ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে দিল্লিতে বড় ধরনের বিক্ষোভ মিছিল করেছে বিরোধী জোট ইন্ডিয়া ব্লক। মঙ্গলবার সংসদ ভবন থেকে নির্বাচন কমিশনের সদর দপ্তর অভিমুখে মিছিল শুরু হলে পুলিশ ব্যারিকেড দিয়ে তাদের আটকে দেয়।
পরে রাস্তায় অবস্থান নেন বিরোধী দলের নেতাকর্মীরা। এ সময় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কংগ্রেস নেতা ও লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী ও তৃণমূল কংগ্রেসের সংসদ সদস্য অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় পুলিশের ব্যারিকেডের ওপর উঠে যান। সড়কে বসে অবস্থান কর্মসূচি শুরু করলে রাহুল গান্ধী ও প্রিয়াঙ্কা গান্ধীসহ কয়েকজন বিরোধী সংসদ সদস্যকে বাসে তুলে নেয় পুলিশ। তবে সাময়িকভাবে আটক করার কয়েক মিনিটের মধ্যে তাদেরকে ছেড়ে দিয়েছে দিল্লি পুলিশ।
মঙ্গলবার সকালে সংসদ ভবনের মকরদ্বারে জড়ো হন ইন্ডিয়া জোটের সংসদ সদস্যরা। তাদের হাতে ছিল ‘গণতন্ত্র বাঁচাও’ ও ‘আমার ভোট বাঁচাও’ লেখা প্ল্যাকার্ড। সেখান থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে নির্বাচন কমিশনের সদর দপ্তর নির্বচন সদনের দিকে মিছিল নিয়ে যাওয়ার কর্মসূচি ছিল। বিরোধী জোটের ১৯টি দলের দেড় শতাধিক সংসদ সদস্য এতে অংশ নেন। তবে দিল্লি পুলিশ ওই মিছিলের অনুমতি দেয়নি।
রাহুল গান্ধী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জ্ঞানেশ কুমারকে উদ্দেশ করে লেখেন, ‘জ্ঞানেশ, এটা শেষ। এবার পদত্যাগের সময়।’ বিরোধীদের অভিযোগ, নির্বাচন কমিশনের সাম্প্রতিক কার্যক্রমে ভোটার তালিকা নিয়ে গুরুতর অনিয়মের সুযোগ তৈরি হয়েছে এবং এতে কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
ইন্ডিয়া জোটের এই আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন (এসআইআর)। বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, এসআইআরের নামে ভোটার তালিকা থেকে বৈধ ভোটারদের নাম বাদ পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। তারা এসআইআর প্রক্রিয়া বাতিল এবং বাদ পড়া ভোটারদের নাম পুনর্বহালের দাবি জানাচ্ছে। একই সঙ্গে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগও দাবি করছে তারা।
বিরোধীদের অভিযোগের মধ্যে নতুন করে গুরুত্ব পেয়েছে ভোটার হিসেবে নাম অন্তর্ভুক্তির জন্য ব্যবহৃত ফর্ম-৬। গত সোমবার ভারতের সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট করেছে, নির্বাচন কমিশনের সংশোধিত ফর্ম-৬ আদালত অনুমোদন করেনি। প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ জানতে চেয়েছে, ফর্মটিতে পরিবর্তন কে করেছে এবং এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের নথি আদালতে উপস্থাপনের নির্দেশ দিয়েছে।
আদালত অবশ্য এ পর্যায়ে জ্ঞানেশ কুমারকে সাময়িকভাবে দায়িত্ব থেকে সরানোর আবেদন গ্রহণ করে কোনো অন্তর্বর্তী নির্দেশ দেয়নি। তবে নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া এবং ফর্ম-৬ পরিবর্তন সংক্রান্ত নথি চাওয়া হয়েছে। আদালতের এই পদক্ষেপকে নিজেদের অভিযোগের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ বলে তুলে ধরছে বিরোধীরা।
তবে বিরোধীদের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে নির্বাচন কমিশন। কমিশনের দাবি, বিহারে ২০২৫ সালের ২৪ জুন এসআইআর সংক্রান্ত যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, তা কমিশনের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত ছিল এবং ২০২৬ সালের ২৭ মে সুপ্রিম কোর্টের রায়েও সেটি বহাল রয়েছে। ফর্ম-৬ পরিবর্তনের বিষয়ে রাহুল গান্ধীর বক্তব্যকে কমিশন ‘বিভ্রান্তিকর’ বলেছে।
কমিশনের পক্ষ থেকে আরও বলা হয়েছে, মূল ফর্ম-৬ পরিবর্তন করা হয়নি; এসআইআর প্রক্রিয়ার আওতায় একটি অতিরিক্ত ঘোষণাপত্র যুক্ত করা হয়েছিল। নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য অনুযায়ী, এসআইআর শেষ হয়ে যাওয়া রাজ্যগুলোতে ওই অতিরিক্ত ঘোষণাপত্র অনলাইন ফর্ম-৬ থেকে সরিয়েও নেওয়া হয়েছে।
ইন্ডিয়া জোটের মিছিলকে কেন্দ্র করে দিল্লির সংসদ এলাকা ও নির্বাচন কমিশনের কার্যালয়ের আশপাশে ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়। বিভিন্ন স্থানে ব্যারিকেড বসানো হয় এবং বিপুলসংখ্যক পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়। গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি সড়ক বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং সাধারণ মানুষকে ওই এলাকা এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়।
পুলিশের বাধার মুখে মিছিল নির্বাচন কমিশনের সদর দপ্তর পর্যন্ত পৌঁছাতে পারেনি। বিরোধী সংসদ সদস্যরা নীতি আয়োগ ও আকাশবাণী ভবনের মধ্যবর্তী সড়কে অবস্থান নিয়ে জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে স্লোগান দেন। পরে কয়েকজন নেতাকে আটক করে পুলিশ।
ইন্ডিয়া জোটের এই কর্মসূচি এমন সময়ে হলো, যখন নির্বাচন কমিশনের এসআইআর কার্যক্রম ও ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনে বিরোধ আরো তীব্র হয়েছে। একই সঙ্গে বিষয়টি সুপ্রিম কোর্টেও বিচারাধীন। ফলে জ্ঞানেশ কুমারকে ঘিরে রাজনৈতিক চাপ এবং নির্বাচন কমিশনের কার্যক্রম নিয়ে বিতর্ক সামনে আরো বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তথ্যসূত্র: ইন্ডিয়া টুডে, দ্য হিন্দু ও নিউ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস