বেনাপোলে গাড়িবহরে হামলা, আহত অন্তত ৪
স্টাফ রিপোর্টার
, যশোর
যশোরের বেনাপোল বাজারে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর গাড়িবহরে অতর্কিতে হামলা হয়েছে। সীমান্তের যে স্থান দিয়ে তিন দিন আগে বিএসএফ ৮-১০ জন কথিত বাংলাদেশিকে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করে, পাটওয়ারী সেই স্থান পরিদর্শন শেষে বেনাপোল শহরে ফেরার পথে স্থলবন্দরের কাছে এই হামলার ঘটনা ঘটে। তবে কারা, কী উদ্দেশ্যে এই হামলার ঘটনা ঘটিয়েছে, সে সম্পর্কে এখনও বিস্তারিত জানা যায়নি।
বুধবার (৩ জুন) দুপুরে এই হামলার ঘটনায় দলটির অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের অন্তত চার নেতাকর্মী আহত হন। আহতদের মধ্যে জাতীয় ছাত্রশক্তি নেতা খান মিফতাহুল মোস্তাফিজ অমিত, তাসকিন আহমেদ তাজিম এবং জাতীয় যুবশক্তি নেতা রুপম আহসান অর্ণবের নাম নিশ্চিত করেছেন এনসিপি নেতা খালেদ সাইফুল্লাহ জুয়েল। তিনি জানান, এছাড়াও বেশ কয়েকজন সামান্য আহত হয়েছেন। গাড়ির দরজা খুলে অজ্ঞাত দুর্বৃত্তরা মারপিট করায় আহত নেতাকর্মীদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে বলে জানান জুয়েল।
হামলায় বহরে থাকা গাড়িগুলোর বেশ ক্ষতি হলেও নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী এবং যুগ্ম সদস্য সচিব ফরিদুল হকসহ কেন্দ্রীয় অন্য নেতারা অক্ষত ও নিরাপদে রয়েছেন বলে দলের পক্ষ থেকে নিশ্চিত করা হয়েছে।
সার্বিক পরিস্থিতি জানতে বেনাপোল পোর্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ আশরাফ হোসেনের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি গাড়িবহরে হামলা বা গাড়ি ভাঙচুরের ব্যাপারে সরাসরি কোনো মন্তব্য না করে বলেন, এনসিপি নেতা নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী সাংগঠনিক কাজ ও সীমান্ত পরিদর্শনের জন্য বেনাপোলে এসেছিলেন এবং তিনি সম্পূর্ণ নিরাপদে এলাকা ত্যাগ করেছেন।
যশোরের শার্শা উপজেলার বেনাপোল থানার সাদিপুর সীমান্ত এলাকায় ‘কথিত পুশ-ইন’ ও সীমান্ত পরিস্থিতি পরিদর্শনে বুধবার সকালে আকাশপথে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ও তার সহযোগীরা যশোর আসেন। যশোর বিমানবন্দর থেকে সড়কপথে সীমান্তের সংশ্লিষ্ট এলাকায় গিয়ে তিনি পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা ছাড়াও গণমাধ্যমকর্মী ও স্থানীয়দের সাথে কথা বলেন।
সীমান্ত এলাকায় দাঁড়িয়ে ভারতের ‘আগ্রাসী নীতির’ কড়া সমালোচনা করেন নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। জিরো লাইনের সার্বিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ শেষে গণমাধ্যমের সামনে তিনি ভারতকে ‘খুনি রাষ্ট্র’ এবং ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীকে (বিএসএফ) ‘খুনি বাহিনী’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন।
তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, দিনের পর দিন বিএসএফ সীমান্তে অন্যায় ও অমানবিক উপায়ে নিরপরাধ বাংলাদেশি নাগরিকদের হত্যা করে চলেছে। অথচ এই সীমান্ত হত্যা ও কথিত পুশ-ইনের মতো চরম জাতীয় সংকটের বিরুদ্ধে বর্তমান সরকারের পক্ষ থেকে যে ধরনের কঠোর ও আপসহীন অবস্থান নেওয়া প্রয়োজন ছিল, তা দৃশ্যমান হচ্ছে না। একই সাথে তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সাম্প্রতিক একটি বক্তব্যের তীব্র সমালোচনা করে বলেন, সরকারের দায়িত্বশীল পর্যায় থেকে আসা ওই বক্তব্যটি সীমান্তবর্তী সাধারণ ও নিরপরাধ মানুষের মনে গভীর উদ্বেগ, আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতা সৃষ্টি করেছে। পাটওয়ারী অবিলম্বে তার ভাষায়, ওই বিতর্কিত বক্তব্য প্রত্যাহারের দাবি জানান।
সীমান্তে পুশ-ইনের মাধ্যমে জোরপূর্বক মানুষ ঠেলে দেওয়ার ভারতীয় কর্তৃপক্ষের অপচেষ্টার ব্যাপারে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে এনসিপির এই শীর্ষ নেতা আন্তর্জাতিক আইন ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন সামনে আনেন।
তিনি বলেন, ভারতের পক্ষ থেকে যদি আইনি বা কূটনৈতিক কোনো প্রক্রিয়ায় কোনো নাগরিককে ফেরত পাঠানোর প্রয়োজন থেকেও থাকে, তবে তা অবশ্যই দ্বিপাক্ষিক আলোচনা এবং আন্তর্জাতিক রীতিনীতি মেনে করতে হবে। কিন্তু রাতের আঁধারে সীমান্তের শূন্যরেখায় অসহায় মানুষকে ফেলে রেখে যাওয়ার এই নোংরা ও অগ্রহণযোগ্য প্রক্রিয়া কোনোভাবেই বাংলাদেশের মানুষ মেনে নেবে না।
তিনি বলেন, এনসিপির কাছে সুনির্দিষ্ট তথ্য রয়েছে যে, পুশ-ইনের উদ্দেশ্যে সীমান্তের ওপারে আরও বহু মানুষকে জড়ো করে রাখা হয়েছে। অতীতে সীমান্ত হত্যা, মাদক চোরাচালানসহ বিভিন্ন ইস্যুতে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে শক্ত অবস্থান নেওয়া হলে আজ ভারত এই ধরনের দুঃসাহস দেখানোর সুযোগ পেত না।
সীমান্তে বিএসএফের ‘অন্যায্য তৎপরতার’ তীব্র নিন্দা জানিয়ে এবং সার্বভৌমত্ব রক্ষার তাগিদ দিয়ে পাটওয়ারী বলেন, সীমান্তে নির্বিচারে বাংলাদেশিদের হত্যার দায়ে ভারতের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আদালতে অবিলম্বে মামলা করা উচিত। দেশের সীমান্ত নিরাপত্তা আরও জোরদার করা এখন সময়ের দাবি।
একই সাথে তিনি দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সীমান্তবাসীকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান। যেকোনো ধরনের পুশ-ইনের চেষ্টা বা সন্দেহজনক গতিবিধি দেখামাত্র বিজিবি ও পুলিশকে তা অবহিত করার অনুরোধ করেন পাটওয়ারী।
এর আগে দুই দিন ধরে সাদীপুর সীমান্তের শূন্যরেখায় ১০-১২ জন নারী, পুরুষ ও শিশুর একটি দল চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে খোলা আকাশের নিচে অবস্থান করছিল, যাদের ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বাংলাদেশ ভূখণ্ডের দিকে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু বিজিবির কঠোর অবস্থানের কারণে বিএসএফের সেই চেষ্টা সফল হয়নি। খোলা আকাশের নীচে থাকতে বাধ্য হওয়া ওই নারী-পুরুষ-শিশুর দলটিকে বুধবার সকালে আর সেখানে দেখা যায়নি। স্থানীয়দের ধারণা, বিজিবির কঠোর অবস্থান, সংবাদমাধ্যমের উপস্থিতি এবং পরিস্থিতি বেগতিক দেখে বিএসএফ রাতের আঁধারে ওই পরিবারগুলোকে নিজ দেশে সরিয়ে নিয়েছে।
নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী জানান, তারা মূলত সীমান্তের শূন্যরেখায় আটকে থাকা ওই অসহায় পরিবারগুলোর খোঁজ-খবর নিতে এবং তাদের পাশে দাঁড়াতে এসেছিলেন। কিন্তু তাদের আসার আগেই সুকৌশলে পরিবারগুলোকে সরিয়ে ফেলা হয়, যা সীমান্তে পুশ-ইনের ভারতীয় অপচেষ্টাকে আরও বেশি সন্দেহজনক করে তোলে। এই মানুষেরা কীভাবে শূন্যরেখা পর্যন্ত পৌঁছাল, সে বিষয়ে সরকারের কাছে জবাবদিহিতা দাবি করেন পাটওয়ারী।
পাটওয়ারীর সীমান্ত পরিদর্শনের সময় এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতাসহ যশোর ও শার্শা উপজেলার স্থানীয় বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।