সুবর্ণভূমি ডেস্ক
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার প্রথম রাষ্ট্রীয় সফরে মালয়েশিয়ার উদ্দেশে ঢাকা ছেড়েছেন। আজ রবিবার (২১ জুন) বেলা ৩টার দিকে তাকে বহনকারী বিমানটি কুয়ালালামপুরের উদ্দেশে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ত্যাগ করে। প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
প্রধানমন্ত্রীর এই সফরে সফরসঙ্গী হিসেবে রয়েছেন তার সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান। এ ছাড়া মন্ত্রিপরিষদের কয়েকজন সদস্য, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা, উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা এবং ব্যক্তিগত কর্মকর্তারাও এই সফরে তার সঙ্গে রয়েছেন। বিমানবন্দরে প্রধানমন্ত্রীকে বিদায় জানান স্থানীয় সরকার মন্ত্রী এবং বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ।
মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের বিশেষ আমন্ত্রণে প্রধানমন্ত্রী দুই দিনের জন্য এ সফরে যাচ্ছেন। সফরসূচি অনুযায়ী, আগামীকাল ২২ জুন রাতে তিনি কুয়ালালামপুর থেকে সরাসরি চার দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে চীনে যাবেন। আগামী ২৩ থেকে ২৬ জুন পর্যন্ত এই চীন সফর অনুষ্ঠিত হবে এবং ২৬ জুন বেইজিংয়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে মিলিত হবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
চীন সফরে দুই দেশের মধ্যে অন্তত ১৩টি সমঝোতা স্মারক, দুটি চুক্তি, একটি অ্যাকশন প্ল্যান এবং প্রটোকল-সংক্রান্ত একটি নোট সই হওয়ার কথা রয়েছে। এ ছাড়া শীর্ষ নেতাদের এই বৈঠকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা হবে বাংলাদেশের ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা’ নিয়ে। গতকাল শনিবার প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া ও চীন সফর নিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম এসব তথ্য জানান।
প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের বিবরণ তুলে ধরে সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্র সচিব বলেন, ২৬ জুন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের আগে ২৫ জুন দেশটির প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের সঙ্গেও তার একটি আনুষ্ঠানিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে।
পররাষ্ট্র সচিব আরও জানান, মালয়েশিয়া সফর শেষে সেখান থেকে ২২ জুন বিকেলে রওনা দিয়ে সন্ধ্যায় চীনের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় বন্দরনগরী ডালিয়ানে পৌঁছাবেন প্রধানমন্ত্রী। পরদিন ২৩ জুন ডব্লিউইএফের (WEF) প্রেসিডেন্ট ও সিইওর সঙ্গে তার বৈঠক করার কথা রয়েছে। একই সঙ্গে সেখানে অনুষ্ঠিত ‘সামার দাভোসে’ অংশগ্রহণকারী কাজাখস্তান, মঙ্গোলিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়াসহ অন্যান্য দেশের সরকারপ্রধানদের সঙ্গেও তার দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হতে পারে। ওই দিন সন্ধ্যায় চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং আয়োজিত স্বাগত নৈশভোজে যোগ দেবেন তিনি।
২৪ জুন সকালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সামার দাভোসের ১৩তম বার্ষিক সভার মূল উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করবেন। এবারের সম্মেলনের প্রতিপাদ্য হলো ‘ইনোভেটিং অ্যাট স্কেল’। ওই দিনের অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের পর দুপুরে তিনি বুলেট ট্রেনযোগে বেইজিংয়ের উদ্দেশে যাত্রা করবেন এবং সেখানে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন ‘দিয়াওউথাই স্টেট গেস্ট হাউসে’ অবস্থান করবেন।
২৫ জুন সকালে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে চীনের মিনিস্টার অব ইন্টারন্যাশনাল ডিপার্টমেন্ট অব সিপিসি সেন্ট্রাল কমিটি, বাণিজ্যমন্ত্রী, সিআইডিসিএর চেয়ারম্যান এবং এক্সিম ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তাদের আলাদাভাবে বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। এরপর বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) আয়োজিত ‘বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট ফোরাম’ নামক বিনিয়োগ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখবেন এবং চীনা ব্যবসায়ীদের সামনে বাংলাদেশে বিনিয়োগের পরিবেশ ও সম্ভাবনা তুলে ধরে বিনিয়োগের আহ্বান জানাবেন।
একই দিন বিকেলে চীনের গ্রেট হলে দেশটির প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে মিলিত হবেন বাংলাদেশের সরকারপ্রধান। সেখানে দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়াদি এবং ভবিষ্যতে এ সম্পর্ক আরও কীভাবে এগিয়ে নেওয়া যায়, সে বিষয়ে বিশদ আলোচনা হবে। বৈঠকের পর উভয় দেশের প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে বেশ কয়েকটি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হবে। এরপর তারেক রহমান তার সম্মানে চীনের প্রধানমন্ত্রী আয়োজিত এক রাষ্ট্রীয় ভোজসভায় অংশ নেবেন।
পরদিন ২৬ জুন সকালে চেয়ারম্যান অব দ্য স্ট্যান্ডিং কমিটি অব ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেসের (স্পিকার সমমর্যাদার পদ) প্রধান ঝাও লেজি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন। এরপর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে শীর্ষ দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে বসবেন। বৈঠকে দ্বিপক্ষীয়, আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে। এর ফাঁকে একই দিন বেইজিংয়ের তিয়েনআনমেন স্কয়ারে বীর যোদ্ধাদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাবেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। ২৬ জুন বিকেলে তিনি বেইজিং থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেবেন। বেইজিং সফরে প্রধানমন্ত্রীর মূল সফরসঙ্গীর সংখ্যা ২৮ জন।
তারেক রহমানের চীন সফরে তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম জানান, উজান থেকে আসা পানিপ্রবাহ ও সমন্বিত নদী ব্যবস্থাপনা নিয়ে বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় রয়েছে। সেখানে তিস্তা মহাপরিকল্পনা ও ওয়াটার ম্যানেজমেন্ট নিয়ে অনেক বিস্তৃত ও সম্প্রসারিত আলোচনা হবে বলে আমরা আশা করছি।
অপর এক প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্র সচিব জানান, চীনের প্রেসিডেন্ট ঘোষিত চারটি বৈশ্বিক উদ্যোগে যুক্ত হওয়ার বিষয়টি বাংলাদেশ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে। বিশ্ব নিয়ে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের নতুন চিন্তাভাবনাকে বাংলাদেশ প্রশংসনীয় মনে করে। বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগের প্রশ্নে সচিব বলেন, চীনের একটি সুনির্দিষ্ট অর্থনৈতিক অঞ্চল বাংলাদেশে গড়ে তোলার কাজ চলছে, যেখানে চীনা বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে বিভিন্ন প্রাইভেট সেক্টরের নেতাদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক হবে।
কুয়ালালামপুরকে কর্মী নেওয়ার অনুরোধ করবে ঢাকা: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া সফরকালে বাংলাদেশ থেকে আরও কর্মী নেওয়ার বিষয়টি জোরালোভাবে আলোচনায় আসবে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র সচিব। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সফরে আমরা অবশ্যই মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে বাংলাদেশ থেকে আরও বেশি জনশক্তি নেওয়ার বিষয়ে অনুরোধ করব। মালয়েশিয়া সরকার বর্তমানে বিদেশি শ্রমিক নিয়োগের পুরো প্রক্রিয়াটি পর্যালোচনা করছে। আমরা মনে করি এই পর্যালোচনা প্রক্রিয়া শেষ হলে বাংলাদেশ সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাবে।
পররাষ্ট্র সচিব আরও স্মরণ করিয়ে দেন যে, মালয়েশিয়া ছিল দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রথম মুসলিম দেশ, যারা বাংলাদেশকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিল। তা ছাড়া বিশ্বব্যাপী এবং আসিয়ান অঞ্চলে রোহিঙ্গা ইস্যুতে মালয়েশিয়া বাংলাদেশের একটি জোরালো সমর্থক। বাংলাদেশ আসিয়ানের ‘ডায়ালগ পার্টনার’ হতে আগ্রহী হওয়ায় এক্ষেত্রে মালয়েশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ককে কাজে লাগাতে চায় ঢাকা। তাই দ্বিপক্ষীয় এসব বিষয়ও প্রধানমন্ত্রীর এই সংক্ষিপ্ত সফরে অত্যন্ত গুরুত্ব পাবে।