সুবর্ণভূমি ডেস্ক
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের এক নম্বর ইউনিটে পাইলট-অপারেটেড রিলিফ ভালভ জটিলতার কারণে নির্ধারিত সময়ে রূপপুরের বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে না বলে জানিয়েছেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম।
সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, প্রয়োজন হলে ইউনিট-২-এর ভালভ ইউনিট-১-এ প্রতিস্থাপন কিংবা বিদ্যমান ভালভ সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হবে। সমস্যা খতিয়ে দেখতে রাশিয়া থেকে একটি বিশেষজ্ঞ দলও আসছে।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী বলেন, বিষয়টি না লুকিয়ে বলতে চাই, এই ভালভে যেখানে সমস্যা আছে, সেখানেই সমাধান হবে। প্রয়োজন হলে ইউনিট-২-এর ভালভ ইউনিট-১-এ রিপ্লেস (প্রতিস্থাপন) করব অথবা তাদের সম্ভাব্য কম সময়ে সেটি ঠিক করতে বলবো।
পরমাণু শক্তি কমিশনের কর্মকর্তাদের ধারণা, বর্তমান পরিস্থিতিতে চলতি বছর প্রথম ইউনিট থেকে বাণিজ্যিকভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হওয়ার সম্ভাবনা কম।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের দুটি ইউনিট চালু হলে জাতীয় গ্রিডে মোট প্রায় দুই হাজার ৪০০ মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ যুক্ত হওয়ার কথা। এর ফলে দেশের বিদ্যুৎ ঘাটতি কমানোর পাশাপাশি গ্যাস ও তরল জ্বালানির ওপর চাপ এবং জ্বালানি আমদানির ব্যয় কমাতে সহায়তা করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
মূল পরিকল্পনা অনুযায়ী, রূপপুরের প্রথম ইউনিট ২০২২ সালের ডিসেম্বর এবং দ্বিতীয় ইউনিট ২০২৩ সালের অক্টোবরে চালু হওয়ার কথা ছিল। করোনা মহামারি ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধসহ বিভিন্ন কারণে প্রকল্পটির সময়সূচিতে কয়েক দফা পরিবর্তন হয়েছে। চলতি বছর প্রথম ইউনিট থেকে বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়ার আশা থাকলেও সেফটি ভালভের ত্রুটিতে সেই সময়সূচিও এখন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
এক নজরে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র
দেশের ক্রমবর্ধমান বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণ, বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়ানো এবং দীর্ঘমেয়াদে নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। পাবনার ঈশ্বরদীর রূপপুরে দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা অবশ্য নতুন নয়। এর যাত্রা শুরু হয়েছিল ছয় দশকেরও বেশি আগে।
১৯৬১ সালে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার রূপপুরে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ নেয়। ১৯৬২ থেকে ১৯৬৮ সালের মধ্যে কয়েক দফা সমীক্ষা, স্থান নির্বাচন ও জমি অধিগ্রহণসহ প্রাথমিক কাজ এগিয়ে নেওয়া হয়। বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য ২৬০ একর এবং আবাসিক এলাকার জন্য আরও ৩২ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছিল। তবে ১৯৬৯-৭০ সালে ২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার প্রকল্পটি বাতিল হয়ে যায়।
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ সরকার আবার রূপপুরে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ নেয়। পরবর্তী সময়ে ১৯৭৭-১৯৮৬ সালে ফিজিবিলিটি স্টাডি এবং ১৯৮৭-৮৮ সালে আরও একটি সমীক্ষায় রূপপুরে পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের কারিগরি ও আর্থিক যৌক্তিকতা প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৯৭-২০০০ সালেও প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রস্তুতি ও মানবসম্পদ উন্নয়নসহ বিভিন্ন কার্যক্রম নেওয়া হয়।
তবে প্রকল্পটি বাস্তব রূপ পেতে বড় অগ্রগতি আসে ২০০৯ সালের পর। ওই বছর পারমাণবিক অবকাঠামো উন্নয়ন ও বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের প্রাথমিক কার্যক্রম শুরু হয়। একই বছর বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন ও রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক শক্তি সংস্থা রোসাটমের মধ্যে পারমাণবিক শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহারে সমঝোতা হয়। ২০১০ সালে বাংলাদেশ ও রাশিয়ার মধ্যে ফ্রেমওয়ার্ক এগ্রিমেন্ট এবং ২০১১ সালে আন্তরাষ্ট্রীয় সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
২০১৩ সালে প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ের কাজের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। ২০১৬ সালে কেন্দ্রের সাইট লাইসেন্স দেওয়া হয় এবং একই বছর মূল প্রকল্প বাস্তবায়নে রাশিয়ার সঙ্গে স্টেট ক্রেডিট চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ২০১৭ সালের ৩০ নভেম্বর প্রথম ইউনিটের প্রথম কংক্রিট ঢালাইয়ের মধ্য দিয়ে মূল নির্মাণকাজ শুরু হয়।
রূপপুরে দুটি ইউনিটে মোট ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা থাকবে। প্রতিটি ইউনিটের ক্ষমতা এক হাজার ২০০ মেগাওয়াট। ২০২১ ও ২০২২ সালে প্রথম ও দ্বিতীয় ইউনিটের রিঅ্যাক্টর প্রেসার ভেসেল স্থাপন করা হয়। ২০২৩ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর প্রথম ইউনিটের জন্য ইউরেনিয়াম জ্বালানির প্রথম চালান বাংলাদেশে পৌঁছায়।
রূপপুরের উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হলে দেশের বিদ্যুৎ সরবরাহ সক্ষমতায় বড় সংযোজন হবে। ক্রমবর্ধমান বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণের পাশাপাশি বিদ্যুৎ উৎপাদনের উৎসে বৈচিত্র্য আসবে এবং বড় পরিসরে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের সক্ষমতা বাড়বে। একই সঙ্গে পারমাণবিক প্রযুক্তি ব্যবহারে বাংলাদেশের সক্ষমতা তৈরি হবে। দীর্ঘ ছয় দশকের নানা বাধা পেরিয়ে রূপপুর তাই শুধু একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নয়; দেশের জ্বালানি ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতার নতুন অধ্যায়ের সূচনাও।