ঝিনাইদহ প্রতিনিধি
, মাগুরা থেকে ফিরে
চলমান এসএসসি পরীক্ষার মধ্যেই মাগুরায় মাসব্যাপী বাণিজ্যমেলা আয়োজনকে ঘিরে ব্যাপক আলোচনা সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। বিকেল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলা এই মেলায় লটারি টিকিট বিক্রি, উচ্চস্বরে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং অতিরিক্ত বিদ্যুৎ ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। বিষয়টি নিয়ে সচেতন মহলে উদ্বেগ বাড়ছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত ২৫ এপ্রিল থেকে শহরের আইডিয়াল বালিকা বিদ্যালয়ের সীমানা-সংলগ্ন 'শিশু মাঠে' মাগুরা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির উদ্যোগে 'মাগুরা শিল্প ও বাণিজ্যমেলা-২০২৬' অনুষ্ঠিত হচ্ছে। মেলায় প্রবেশের জন্য বাধ্যতামূলকভাবে ২০ টাকার লটারি টিকিট কিনতে হচ্ছে, যা প্রবেশ টিকিট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
সরেজমিনে মেলা ঘুরে ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মেলায় শতাধিক দোকান বসানো হলেও এর অধিকাংশই জেলার বাইরের ব্যবসায়ীদের দখলে। প্রতিটি দোকানের জন্য দৈনিক এক হাজার থেকে পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত ভাড়া নেওয়া হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে আগাম অর্থও আদায় করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
মেলার অন্যতম আকর্ষণ লটারি কার্যক্রম। জেলার বিভিন্ন এলাকায় গাড়িতে ছোট টিনের ড্রাম নিয়ে ঘুরে আকর্ষণীয় পুরস্কার এর নাম ঘোষণা করে প্রতিদিন ২০ টাকা মূল্যের কয়েক লাখ টিকিট বিক্রি করা হচ্ছে। এতে অংশ নিয়ে অনেকেই আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। মেলায় বিকেল থেকে গান-বাজনার মাধ্যমে দর্শনার্থীদের আকৃষ্ট করা হয় এবং রাত সাড়ে ১০টার পর অনুষ্ঠিত হয় লটারির ড্র। কোনো দিন প্রথম পুরস্কার হিসেবে এক ভরি স্বর্ণালংকার, আবার কোনো দিন ইজিবাইক বা একাধিক মোটরসাইকেলসহ মোট ৪৫টি পুরস্কার ঘোষণা করা হচ্ছে।
আয়োজকদের দাবি, প্রতিদিন প্রায় ১০০ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ ব্যবহার হচ্ছে এবং জেলার বিভিন্ন স্থানে ২০৮টি ড্রামের মাধ্যমে লটারি টিকিট বিক্রি চলছে। পুরস্কারের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ড্রামের সংখ্যাও দিন দিন বাড়ানো হচ্ছে। তবে এই লটারিকে কেন্দ্র করে দরিদ্র মানুষের আর্থিক ক্ষতির অভিযোগও উঠেছে।
মেলায় ঝালমুড়ি দোকানের মালিক টগর মিয়া জানান, তিনি ৩৫ হাজার টাকা অগ্রিম দিয়ে দোকান নিয়েছেন। পরবর্তীতে আরও কত টাকা দিতে হবে, তা এখনো তাকে জানানো হয়নি। 'কাকা-ভাতিজা টি স্টোর'-এর মালিক স্বাক্ষর সিকদার জানান, তার চাচা আয়োজক কমিটিতে থাকায় তিনি ৩০ হাজার টাকায় দোকান পেয়েছেন। তিনি বলেন, অধিকাংশ দোকানি বাইরের জেলা থেকে এসে নিয়মিত বিভিন্ন মেলায় ব্যবসা করেন।
শহরের এতিমখানা মোড় এলাকার বাসিন্দা পাখি খাতুন বলেন, ‘প্রতিদিন ৫-৬টি করে টিকিট কিনি, কিন্তু কিছু পাইনি। আজও দশটি টিকিট কিনেছি, তবুও কিছু জোটেনি।’
এদিকে অভিভাবকদের অভিযোগ, উচ্চস্বরে গান ও মাইকিংয়ের কারণে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটছে। অনেক শিক্ষার্থী সন্ধ্যায় পড়তে না বসে মেলায় ঘুরতে যাচ্ছে।
স্টেডিয়াম এলাকার বাসিন্দা সদরুল আমিন বলেন, ‘আমার মেয়ে এসএসসি পরীক্ষা দিচ্ছে। কিন্তু রাত পর্যন্ত শব্দদূষণের কারণে সে মনোযোগ দিতে পারছে না।’
অন্যদিকে, সরকারের বিদ্যুৎ সাশ্রয় নীতির সঙ্গে মেলার কার্যক্রমের অসঙ্গতি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। যেখানে শহরের দোকানপাট ও শপিংমল সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে বন্ধ রাখার নির্দেশনা রয়েছে, সেখানে মেলায় রাতভর আলোকসজ্জা ও বৈদ্যুতিক রাইড চালু রাখা হচ্ছে।
মেলার কর্তৃপক্ষ মো. রিয়াজ হোসেন বলেন, জেলা প্রশাসনের অনুমতি নিয়েই এক মাসের জন্য এই আয়োজন করা হয়েছে। লটারি টিকিটকে তিনি প্রবেশমূল্যের অংশ হিসেবে উল্লেখ করেন।
মাগুরা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সহসভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম নান্টু বলেন, ‘জেলায় বিনোদনের তেমন সুযোগ নেই। মানুষের চাহিদা মেটাতেই এই আয়োজন। অনেক দরিদ্র মানুষও এখানে পুরস্কার জিতছেন।’
তবে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. আব্দুল কাদের বলেন, ‘মেলার বিষয়ে আমি কিছু জানি না। স্থানীয় সরকার বিভাগের উপপরিচালকের সঙ্গে কথা বলতে পারেন।’
পরে মাগুরা স্থানীয় সরকার বিভাগের উপপরিচালক (উপসচিব) ইমতিয়াজ হোসেন ফোনে বলেন, ‘সংস্কৃতিবিষয়কমন্ত্রী ও স্থানীয় সংসদ সদস্য সবাই বিষয়টি জানেন। টিকিটের বিষয়ে আমি কিছু বলিনি। ডিসি স্যার ঢাকায় আছেন। পুলিশ বিভাগ, স্থানীয় সংসদ সদস্য, মন্ত্রী মহোদয়দের সাথে কথা বলেই এভাবে চলছে। নিউজ করতে চাইলে করতে পারেন, কোনো সমস্যা নেই।’