সুবর্ণভূমি ডেস্ক
দেশে বর্তমানে পিক আওয়ারে বিদ্যুতের চাহিদা ১৮ হাজার মেগাওয়াটেরও বেশি। অথচ উৎপাদন হচ্ছে মাত্র ১৪ হাজার মেগাওয়াটের কাছাকাছি। দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের মোট সক্ষমতা ২৯ হাজার ৫৯৩ মেগাওয়াট হওয়া সত্ত্বেও চাহিদামতো বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাচ্ছে না। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) কর্মকর্তাদের মতে, এই বিপুল সক্ষমতা অব্যবহৃত থাকার প্রধান কারণ তীব্র অর্থ সংকট, বকেয়া বিলের পাহাড় এবং এর ফলে সৃষ্ট জ্বালানি সংকট।
পিডিবি সূত্রে জানা গেছে, সরকারি ও বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলোর কাছে পিডিবির বকেয়া পাওনার পরিমাণ প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে কেবল বেসরকারি খাতের তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোই পাবে ১৫ হাজার কোটি টাকারও বেশি। গত ৭-৮ মাস ধরে বিল বকেয়া থাকায় এই কোম্পানিগুলো নতুন করে জ্বালানি তেল কেনার তহবিল পাচ্ছে না।
বাংলাদেশ প্রাইভেট পাওয়ার প্রডিউসার অ্যাসোসিয়েশনের (বিপ্পা) সভাপতি ডেভিড হাসনাত জানান, বেসরকারি কোম্পানিগুলো দেশকে লোডশেডিংমুক্ত করতে সরকারকে সহায়তা করতে চায়, কিন্তু বকেয়া টাকা না পেলে কোম্পানিগুলো বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য তেল কিনবে কীভাবে?
দেশে সরকারি ও বেসরকারি খাতে ৪৩টি ছোট-বড় ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে। যার মধ্যে ডিজিটাল পাওয়ারের ১০২ মেগাওয়াট, দেশ অ্যানার্জি চাঁদপুরের ২০০ মেগাওয়াট, টাঙ্গাইলের ২২ মেগাওয়াট এবং ওরিয়ন খুলনার ১০৫ মেগাওয়াটের কেন্দ্রে বর্তমানে এক লিটার তেলও মজুত নেই।
এছাড়া নাটোরের রাজ লংকা পাওয়ার কেন্দ্রে মাত্র তিন টন, ইপিভির ঠাকুরগাঁও ১১৫ মেগাওয়াট কেন্দ্রে ৭৪ টন, নর্থ-ওয়েস্ট পাওয়ারের মোল্লারহাট কেন্দ্রে ৯৮ টন, কুমিল্লা ৫২ মেগাওয়াট কেন্দ্রে ৬ টন, ফেনী ১১৪ মেগাওয়াট কেন্দ্রে ৩৯ টন এবং ওরিয়ন মেঘনাঘাট কেন্দ্রে মাত্র ৩২ টন ফার্নেস অয়েল মজুত আছে, যা দিয়ে কেন্দ্র চালানো অসম্ভব। বাকি কেন্দ্রগুলোর অধিকাংশে ১০ থেকে ১৫ দিনের বেশি তেল নেই। পিডিবির নিজস্ব ১০টি তেলভিত্তিক কেন্দ্রের মধ্যে শুধু সান্তাহার কেন্দ্রে ১০ দিনের তেল আছে, বাকিগুলোতে আছে মাত্র ১ থেকে ৮ দিনের জ্বালানি। ফলে, ফার্নেস অয়েলভিত্তিক কেন্দ্রগুলো থেকে পাঁচ হাজার ৬৪১ মেগাওয়াট উৎপাদনের ক্ষমতা থাকলেও উৎপাদন হচ্ছে মাত্র ১ হাজার ৩ মেগাওয়াট। যেমন, পিডিবির কাছে ৪ হাজার কোটি টাকা বকেয়া থাকায় ময়মনসিংহে ইউনাইটেড গ্রুপের ৩৫০ মেগাওয়াটের দুটি কেন্দ্র থেকে মাত্র ১০০-১৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে।
কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ছয় হাজার ৯২৭ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষমতা থাকলেও বর্তমানে পাওয়া যাচ্ছে মাত্র পাঁচ হাজার মেগাওয়াটের মতো। রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের দ্বিতীয় ইউনিটটি টিউব সমস্যার কারণে সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। আর প্রথম ইউনিটটির ৬০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার বিপরীতে উৎপাদন হচ্ছে মাত্র ৪০০ মেগাওয়াট। অন্যদিকে, এক হাজার ২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার নরেনকো কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রটি এক হাজার মেগাওয়াটের বেশি উৎপাদন করতে পারছে না। বকেয়া বিল ও বিভিন্ন দাবির কারণে এস আলম গ্রুপের এসএস পাওয়ার কেন্দ্রটিও সব সময় পুরোদমে চালানো যাচ্ছে না।
গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন ক্ষমতা ১২ হাজার ৪৭২ মেগাওয়াট হলেও বর্তমানে উৎপাদন হচ্ছে মাত্র পাঁচ হাজার ১১১ মেগাওয়াট। অন্যান্য বছর এই খাতে ১০০ থেকে ১২০ কোটি ঘনফুট গ্যাস বরাদ্দ দেওয়া হলেও, বর্তমানে দেওয়া হচ্ছে মাত্র ৯১ কোটি ৫০ লাখ ঘনফুট। যদিও লোডশেডিং কমাতে চলমান জরুরি বৈঠকে বিদ্যুৎ খাতে অন্তত ১০০ কোটি ঘনফুট গ্যাস দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে জ্বালানি বিভাগের মতে, দেশের উৎপাদিত গ্যাসের ৬০ শতাংশই (ক্যাপটিভসহ) বিদ্যুৎ খাতে ব্যবহার করা হচ্ছে, যা গ্যাস সংকটের কারণে দেশের শিল্প খাতকে চরম ঝুঁকিতে ফেলছে।