লোহাগড়া (নড়াইল) প্রতিনিধি
নীল আকাশে ভেসে বেড়াচ্ছে সাদা মেঘ। শরতের শান্ত-স্নিগ্ধ হাওয়ায় মাঠজুড়ে দোল খাচ্ছে ধানের চারা। নদীতীরের কাশফুল আর বাড়ির আঙিনায় ফুলের সুবাস জানান দিচ্ছে দেবী দুর্গার আগমনী বার্তা।
দেবী দুর্গার আগমন ঘিরে এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন নড়াইলের মৃৎশিল্পীরা। খড় ও মাটির কাজ শেষ করে এখন প্রতিমায় কেউ দিচ্ছেন রং-তুলির টান, কেউ বা মাটির প্রলেপ দিয়ে প্রতিমায় রং লাগানোর চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
সোমবার (৫ অক্টোবর) নড়াইল সদর ও লোহাগড়া উপজেলার কয়েকটি মন্দির ঘুরে দেখা গেছে, দুর্গাপূজার আয়োজকদের ব্যস্ততার যেন শেষ নেই। পূজা উপলক্ষে গঠিত কমিটির নেতারা অর্থ সংগ্রহের পাশাপাশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের নিমন্ত্রণপত্র বিলি করছেন। মণ্ডপের সাজসজ্জা, আলোকসজ্জা ও পূজার উপকরণ সংগ্রহসহ অন্যান্য কাজ নিয়ে দিনরাত পার করছেন আয়োজকরা।
বসে নেই প্রতিমা শিল্পীরাও। দীর্ঘ দুই মাসেরও বেশি সময় ধরে শিল্পীরা বিভিন্ন মণ্ডপে প্রতিমা তৈরিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন। কাদামাটির প্রলেপ দিয়ে প্রতিমাকে করে তুলছেন দৃষ্টিনন্দন। অনেক মণ্ডপেই ইতিমধ্যে প্রতিমার রঙের কাজ শেষ হয়েছে। কোনো কোনো মণ্ডপেন আবার প্রতিমার অবয়বে পড়ছে রং-তুলির শেষ আঁচড়। এরপর সাজসজ্জা আর অলংকারে পূর্ণতা পাবে দেবী দুর্গার প্রতিমা। শিল্পীর হাতের নিপুণ ছোঁয়ায় ফুটিয়ে তোলা হচ্ছে দুর্গা ছাড়াও অন্যান্য দেব-দেবীর অবয়ব। নড়াইলে শুধু স্থানীয় শিল্পীরাই নন, দুর্গাপূজাকে সামনে রেখে বিভিন্ন জেলা থেকেও দক্ষ মৃৎশিল্পীরা এসেছেন প্রতিমা তৈরির কাজে।
উপকরণের দাম বাড়লেও বাড়েনি মজুরি
এদিকে সময় যত ঘনিয়ে আসছে, বাড়ছে শিল্পীদের ব্যস্ততা। তবে ব্যস্ততা বাড়লেও আগের মতো লাভ হচ্ছে না বলে জানান প্রতিমাশিল্পীরা। মাটি, খড়, রং ও অন্যান্য উপকরণের দাম অনেক বেড়েছে। কিন্তু সে অনুযায়ী বাড়েনি প্রতিমা গড়ার পারিশ্রমিক। ফলে জীবনযাত্রার ব্যয় ও কঠোর পরিশ্রমের তুলনায় আয় কমেছে তাদের।
নড়াইল টাউন কালীবাড়ি দুর্গা মন্দিরে খুলনা থেকে এসেছেন প্রতিমাশিল্পী দেবদাস সরদার। ছোটবেলা থেকেই কাদামাটি ও রং-তুলির সঙ্গে বেড়ে ওঠা তার। এ বছর নড়াইলের তিনটি মণ্ডপে প্রতিমা গড়ার কাজ করছেন তিনি। তার তৈরি প্রতিমা নিখুঁত ও নান্দনিক হওয়ায় পারিশ্রমিকও কিছুটা বেশি। তিনি জানান, প্রতিটি প্রতিমা আড়াই লাখ থেকে তিন লাখ টাকা চুক্তিতে নির্মাণ করছেন।
দেবদাস সরদার বলেন, ‘প্রতিমা গড়ার জন্য মাটি, খড়, রং এবং অন্যান্য উপকরণ কেনা ও সহযোগীদের বেতন দেওয়ার পর আর তেমন লাভ থাকে না। লাভ না হওয়ায় অনেকেই এখন এই পেশা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন।’
নড়াইল সর্বজনীন মন্দিরে দুর্গা প্রতিমা তৈরি করছেন শিল্পী উজ্জ্বল পাল। এ বছর তিনি পাঁচটি মণ্ডপে প্রতিমা নির্মাণের দায়িত্ব নিয়েছেন। তিনি বলেন, "অন্য বছরের তুলনায় এবার প্রতিমার সাজসজ্জার সামগ্রীর দাম অনেক বেশি। এছাড়া কিছু কিছু রং এ দেশে পাওয়া যায় না, ভারত থেকে আমদানি করতে হয়। এ কারণে প্রতিমা তৈরির উপকরণ ও শ্রমিকের মজুরি মিলিয়ে তেমন লাভ হয় না। তবে বংশপরম্পরায় এ কাজ করে আসছি, তাই কেবল ঐতিহ্যের টানেই এই পেশা ধরে রাখা।" তিনি জানান, প্রতিমার আকার ও সৌন্দর্য অনুযায়ী ৩০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত পারিশ্রমিক নিচ্ছেন তিনি।
আয়োজকদের প্রস্তুতি সাড়ম্বর
আয়োজকরা জানান, অন্য বছরের তুলনায় এ বছর প্রতিমা নির্মাণের খরচ অনেক বেশি। দশ হাজার টাকা থেকে শুরু করে প্রতিমার কারুকাজ অনুযায়ী সাড়ে তিন লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ হচ্ছে।
নড়াইল কেন্দ্রীয় টাউন কালীবাড়ি দুর্গামন্দিরের সাধারণ সম্পাদক অশোক কুমার কুণ্ডু বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে এই মন্দিরে শারদীয় দুর্গোৎসব হয়ে আসছে। এ বছরও উৎসব সাড়ম্বর করার প্রস্তুতি চলছে। গত বছরের চেয়ে এবার প্রতিমা শিল্পীদের পারিশ্রমিক দিতে হচ্ছে অনেক বেশি। আশা করছি, অত্যন্ত শান্তিপূর্ণ ও সুশৃঙ্খল পরিবেশে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হবে।’
বেড়েছে মণ্ডপের সংখ্যা
জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের তথ্যমতে, এ বছর নড়াইল জেলায় মোট ৫৪৩টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এর মধ্যে সদর উপজেলায় ২৪৯টি, কালিয়া উপজেলায় ১৪৪টি ও লোহাগড়া উপজেলায় ১৫০টি মণ্ডপ রয়েছে। জেলায় গত বছরের তুলনায় এবার মণ্ডপের সংখ্যা বেড়েছে ১৯টি।
নড়াইল জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি অ্যাডভোকেট পংকজ বিহারী ঘোষ অন্ন বলেন, ‘আমরা পূজা উদযাপন পরিষদের পক্ষ থেকে দুর্গোৎসব শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে সম্পন্ন করতে চাই। এজন্য সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে এবং মন্দিরে মন্দিরে গিয়ে নিয়মিত খোঁজখবর রাখা হচ্ছে। জেলায় সামগ্রিক শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় থাকায় এবার মণ্ডপের সংখ্যাও বৃদ্ধি পেয়েছে।’