যশোর, বাংলাদেশ || বুধবার, ৭ অক্টোবর ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

এলপিজি বাজারে অরাজকতা

রাব্বি আল-আমিন

, যশোর

প্রকাশ : বুধবার, ৭ অক্টোবর,২০২৬, ১০:০০ এ এম
এলপিজি বাজারে অরাজকতা

তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) নতুন দাম ঘোষণা করা হয়েছে। ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ২৫২ টাকা বাড়িয়ে এক হাজার ৮৩৭ টাকা নির্ধারণ হলেও সাধারণ ক্রেতার কাছে তা কেবলই ‘কাগুজে হিসাব’।

রাজধানী থেকে শুরু করে জেলা শহরের অলিগলিতে কোথাও মিলছে না নির্ধারিত মূল্যের এই গ্যাস। সরকারি নির্দেশনা উপেক্ষা করে খুচরা বাজারে এক একটি ১২ কেজির সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে দুই হাজার ২০০ টাকা থেকে আড়াই হাজার টাকায়। অর্থাৎ, বিইআরসির নির্ধারিত দামের চেয়ে প্রতি সিলিন্ডারে চার থেকে পাঁচশ’ টাকা পর্যন্ত বাড়তি গুণতে হচ্ছে ভোক্তাদের।

আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বৃদ্ধি ও আমদানিকৃত প্রোপেন-বিউটেনের মূল্যবৃদ্ধির কারণ দেখিয়ে প্রতি কেজি এলপিজির দাম ১৫৩ টাকা ০৬ পয়সা নির্ধারণ করা হয়। যার ভিত্তিতে অটো গ্যাস প্রতি লিটার ৮৪ টাকা ৬২ পয়সা করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে সরকারনির্ধারিত দামে এলপিজি কিনতে পারছেন না সাধারণ গ্রাহকরা।

গত দুই সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে দেশের বাজারে তীব্র সরবরাহ সংকট দেখা দিয়েছে। বসুন্ধরা ও বেক্সিমকোর মতো শীর্ষস্থানীয় ব্র্যান্ডগুলোর গ্যাস বাজারে পাওয়া যাচ্ছে না বললেই চলে।

তবে, অনুসন্ধানে উঠে এসেছে চমকপ্রদ তথ্য। আমদানিতে বড় কোনো ঘাটতি নেই। এলপিজি ব্যবসায়ীদের সংগঠন ‘লোয়াব’-এর তথ্য মতে, গত আগস্ট মাসে এক লাখ ৫৮ হাজার মেট্রিক টন এবং সেপ্টেম্বরে এক লাখ ৫৬ হাজার টন এলপিজি আমদানি করা হয়েছে। অর্থাৎ, আমদানির চিত্র স্বাভাবিক থাকা সত্ত্বেও রহস্যজনকভাবে বাজারে তৈরি করা হয়েছে কৃত্রিম সংকট।

গত জানুয়ারিতে ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ছিল এক হাজার ২৫৩ টাকা। ফেব্রুয়ারিতে ১০৩ টাকা বাড়লেও মার্চে দাম অপরিবর্তিত থাকে। ইরান যুদ্ধ শুরুর পর এপ্রিলে দুই দফায় ৫৯৯ টাকা দাম বাড়ে। এরপর জুনে ৫৫ টাকা ও জুলাইয়ে ৩৫৭ টাকা কমানো হয়। আগস্টে আবার ৭০ টাকা বাড়িয়ে সেপ্টেম্বরে কমানো হয় ১৩ টাকা। এবার মূল্য বৃদ্ধিতে বড় উল্লম্ফন দেখা গেছে। এপ্রিলেও সরবরাহ-সংকটের শঙ্কা দেখিয়ে দাম বাড়িয়েছিলেন ব্যবসায়ীরা। এর আগে গত ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে এক দফা বড় রকমের সরবরাহ সংকট তৈরি হয় এলপিজির।

২০২১ সালের এপ্রিল থেকে এলপিজির দাম নির্ধারণ করে আসছে বিইআরসি। তবে অভিযোগ আছে, বাজারে নির্ধারিত দামে বিক্রি হয় না। মাঝেমধ্যেই সরবরাহ-সংকটের নামে এটি অনেক বেড়ে যায়। বাড়তি দাম দিয়েও এলপিজি পান না ভোক্তারা।

দিশেহারা মধ্যবিত্ত

দেশের প্রায় এক কোটি পরিবার ও প্রতিষ্ঠান রান্নাবান্না, শিল্প ও পরিবহনে এলপিজির ওপর নির্ভরশীল। এর মধ্যে ৮০ শতাংশই ব্যবহৃত হয় গৃহস্থালির কাজে। চাল, ডাল, তেলসহ নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতির মধ্যে এলপিজির এই আকাশছোঁয়া দামে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর নাভিশ্বাস উঠে গেছে।

মতিয়ার রহমান নামের এক ভুক্তভোগী আক্ষেপ করে বলেন, ‘‘১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডার এক হাজার ৮৩৭ টাকা নির্ধারিত করে দেওয়া মূল্যে আমরা গ্যাস পাচ্ছি না। গ্যাস বিক্রেতারা বাসা বাড়িতে গ্যাস পৌঁছে দিয়ে দুই হাজার ২০০ থেকে আড়াই হাজার টাকা নিচ্ছে। তাদের কাছে দাম বেশি নেওয়ার কথা জিজ্ঞেস করলে বলে, ‘আমরা ডিলারদের কাছে বেশি দামে কিনছি। সেজন্য আপনাদের কাছে বেশি দামে বিক্রি করা লাগছে।’ সরকার যদি বাজার কন্ট্রোল না করতে পারে তাহলে আমরা চলবো কীভাবে? তেল, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সবকিছু দিনদিন মূল্যবৃদ্ধি পাচ্ছে। আমাদের মধ্যবিত্তের জীবন দিন দিন দুর্বিষহ হয়ে উঠছে।”

আরেক ক্রেতা ফারজানা হাবিব রেমি জানান, তিনি বসুন্ধরা কোম্পানির গ্যাস ব্যবহার করেন। গত এক সপ্তাহ এই কোম্পানির গ্যাস পাচ্ছেন না। যদিও একটা-দুইটা দোকানে পাওয়া যায়, তাও আবার দুই হাজার ৩০০ থেকে দুই হাজার ৪০০ টাকা দিয়ে কিনতে হচ্ছে। সরকার মূল্য বাড়াচ্ছে ব্যবসায়ীরা বেশি লাভ করছে, কিন্তু মধ্যবিত্ত বেসরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ছে না। জীবন চালানো দায় হয়ে পড়েছে।

এদিকে খুচরা বিক্রেতাদের দাবি, ডিলাররা নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বাড়তি দামে গ্যাস সরবরাহ করছেন। বাধ্য হয়েই পরিবহন খরচ সামলে বাড়তি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে।

শহরের হজরত গরিব শাহ্ সড়কের বকুলতলায় গ্যাস বিক্রেতা কাদের এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী সাজ্জাদ অর্ণব বলেন, ‘ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী গ্যাসের সিলিন্ডার পাচ্ছি না। ওমেরা, সেনাসহ কয়েকটি কোম্পানির গ্যাস সীমিত পরিসরে মিলছে। তাও আবার বেশি দামে ডিলাররা সাপ্লাই দিচ্ছে। এসব কোম্পানির ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডার গ্যাসগুলো আমরা ডিলারের কাছ থেকে এক হাজার ৮১০ টাকা থেকে এক হাজার ৮২০ টাকা মূল্যে সাপ্লাই পাচ্ছি। আর বসুন্ধরা ও বেক্সিমকো কোম্পানির গ্যাস গত ২০ দিন ধরে ডিলাররা সাপ্লাই করছে না। দোকান থেকে ভোক্তাদের কাছে সরকারের নির্ধারণ করা এক হাজার ৮৩৭ টাকা মূল্যে বিক্রি করছি। আর বাসা বাড়িতে পৌঁছে দিলে পথ অনুযায়ী ক্যারিং খরচ বাবদ এক হাজার ৯০০ টাকা থেকে এক হাজার ৯৫০ টাকায় ভোক্তার কাছে পৌঁছে দিচ্ছি। এতে আমাদের ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডার প্রতি ১০ থেকে ২০ টাকা লাভ হচ্ছে। আগে আমাদের লাভ হতো প্রায় ১০০ টাকা লাভ হতো।’

ডিলারদের অভিযোগ, কোম্পানি বা মূল ডিপো থেকে নির্ধারিত মূল্যে গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। বসুন্ধরার মতো বড় কোম্পানিগুলো গত ২০ দিন ধরে তাদের সরবরাহ বন্ধ বা নামমাত্র পর্যায়ে নামিয়ে এনেছে। ফলে ডিলারদের লাখ লাখ টাকার পুঁজি আটকে আছে। সেপ্টেম্বর মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে কোম্পানিগুলো একতরফাভাবে ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত সরবরাহ কমিয়ে দেয়। মাসের শেষভাগে দরবৃদ্ধির ঘোষণা আসার পর এখন ধীরে ধীরে ডিপো থেকে ট্রাক ছাড়তে শুরু করেছে।

সেনা, পেট্রোম্যাক্স ও জি গ্যাসের যশোরের ডিলার ফিরোজ আহমেদ বলেন, ‘খুচরা বিক্রেতাদের কাছে ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডার গ্যাস বিক্রি করছি সর্বোচ্চ এক হাজার ৮২০ টাকা দরে। খুচরা দোকানিরা সরকারি নির্ধারিত মূল্যে বিক্রি করলে লাভ হবে ১৫ থেকে ২০ টাকা। বাজারে গ্যাস সরবরাহ কম থাকায় খুচরা বিক্রেতাদের সরকারনির্ধারিত মূল্য অনুযায়ী লভ্যাংশ কম দিতে পারছি। গ্যাস সরবরাহ কম থাকায় কোম্পানি নির্দিষ্ট মূল্য বেঁধে দিচ্ছে। সে অনুযায়ী আমরা এক হাজার ৭৭২ টাকা দিয়ে কোম্পানির কাছ থেকে কিনছি। দোকান ও ট্রান্সপোর্ট খরচসহ আমাদের ৩০ থেকে ৪০ টাকা থাকছে। ভোক্তা পর্যায়ে যাতে কোনো প্রভাব না পড়ে, যাতে মার্কেটে অরাজকতা সৃষ্টি না হয়, সে জন্য আমাদের লস হলেও বিক্রি করছি।’

বসুন্ধরা কোম্পানির ডিলার এসএম নুরুউদ্দিন বলেন, ‘গত মাসের ১৮ তারিখ থেকে বসুন্ধরা কোম্পানি আমাকে গ্যাস দিচ্ছে না। আমরা লাখ লাখ টাকা পুঁজি খাটিয়ে বসে আছি। কিন্তু গ্যাস না পাওয়ার কারণে গ্রাহক যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, আমরাও ব্যবসায়ের দিক থেকে অনেক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছি। এই বসুন্ধরা কোম্পানির গ্যাসের সিলিন্ডার যেসব গ্রাহকরা ব্যবহার করে, তারা এখন বাধ্য হয়ে নতুন সিলিন্ডার কিনে অন্য কোম্পানির গ্যাস ব্যবহার করছে। এতে ক্রেতারাও আর্থিক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কোম্পানির সাথে প্রতিনিয়ত যোগাযোগ করছি, কিন্তু গ্যাস কবে পাবো তার সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য দিতে পারছে না।’

তদারকির অভাব

বিইআরসি এলপিজির দাম নির্ধারণ করে আসছে। কিন্তু দর নির্ধারণের পর তা বাজারে বাস্তবায়িত হচ্ছে কি না—তা নজরদারির ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থার ভূমিকা বরাবরই প্রশ্নের মুখে। অসাধু সিন্ডিকেট প্রতি মাসেই নির্ধারিত দামের চেয়ে অতিরিক্ত মুনাফা হাতিয়ে নিলেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না বলে ক্রেতাদের অভিযোগ।

সম্প্রতি বিইআরসি ১২টি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে দৈনিক ভিত্তিতে আমদানি ও সরবরাহের তথ্য পাঠাতে চিঠি দিয়েছে।

যশোর জেলা জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. সেলিমুজ্জামান বলেন, ‘খুচরা বিক্রেতারা ডিলারদের কাছ থেকে বেশি দামে গ্যাস কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। সে কারণে সরকারের নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে ট্রান্সপোর্ট খরচসহ ২০ থেকে ৫০ টাকা বেশি দামে ভোক্তাদের কাছে বিক্রি করছেন। গত ৫ তারিখে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় আমরা এ বিষয়ে মিটিং করেছি। তাদের সতর্ক করা হয়েছে, সরকার নির্ধারিতের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি করলে আইনের আওতায় আনা হবে।’

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)