সাতক্ষীরা প্রতিনিধি
কলেজছাত্র জাকারিয়া খাঁন—
ছবি:
সাতক্ষীরায় কলেজছাত্র জাকারিয়া খাঁনকে ছুরিকাঘাতে হত্যার ঘটনায় ১২ জনের নাম উল্লেখ করে মামলা হয়েছে।
মামলায় আরও সাতজনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে। নিহত জাকারিয়ার ভাই শাহারিয়ার খাঁন শনিবার (৩ অক্টোবর) রাতে সাতক্ষীরা সদর থানায় মামলাটি করেন।
মামলায় নাহিদ হাসানকে প্রধান আসামি করা হয়েছে। এ ঘটনায় গ্রেপ্তার মুহিদ হাসান বনিকে মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে রোববার আদালতে পাঠিয়েছে পুলিশ।
মামলার এজাহারে নাম থাকা অন্য আসামিরা হলেন—সাতক্ষীরা শহরের ইটাগাছা এলাকার মৃত গিয়াসউদ্দিনের ছেলে নাহিদ হাসান, ফিরোজউদ্দিনের ছেলে মুহিদ হাসান বনি ও তার ভাই জাকির হোসেন রনি, সিরাজুল ইসলামের ছেলে আরিজুল ইসলাম, আবুল হোসেন ওরফে বড় খোকার ছেলে ছোট ময়না, রবিউল ইসলামের ছেলে মো. জুয়েল, মো. হাসানের ছেলে সাগর, শাকিল চেয়ারম্যানের ছেলে সামি, জমিদার মুন্সির ছেলে মো. নাঈম, নজরুল ইসলাম সরদারের ছেলে রাশিদুজ্জামান রাশেদ, মো. মিঠুর ছেলে হুজাইফা এবং মিজানুর রহমানের ছেলে শরিফুল ইসলাম।
মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, শুক্রবার গভীর রাতে সাতক্ষীরা শহরের প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ের সামনে কদমগাছতলায় রবিউলের চায়ের দোকানে নাহিদসহ কয়েকজন চা খেতে যান।
তারা দ্রুত চা দিতে বললে চা পরিবেশন নিয়ে দোকানি রবিউলের সঙ্গে তাদের বাগ্বিতণ্ডা হয়। এ সময় রবিউলের প্রতিবেশী ভাইপো বাপ্পী হাসান এর প্রতিবাদ করলে তাকে মারধর এবং মাথায় ইট দিয়ে আঘাত করা হয়।
এ সময় ওই পথ দিয়ে যাওয়ার সময় বাপ্পীকে রক্ষা করতে এগিয়ে যান জাকারিয়া খাঁন। এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে, তখন তাকে মারধর করা হয়। একপর্যায়ে প্রধান আসামি নাহিদ হাসান হাতে থাকা ধারালো চাকু দিয়ে জাকারিয়ার বুকে আঘাত করেন। এতে তিনি গুরুতর আহত হয়ে মাটিতে পড়ে যান।
পরে চায়ের দোকানি রবিউলসহ স্থানীয়রা জাকারিয়াকে উদ্ধার করে সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালে ভর্তি করেন। অবস্থার অবনতি হলে তাকে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে নেওয়ার পর কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
নিহতের ফুফাতো ভাই ও সাতক্ষীরা পৌর বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক মাসুম বিল্লাহ শাহীন বলেন, সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, কিশোর গ্যাংয়ের নেতা নাহিদ হাসানের নেতৃত্বে এ হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। তিনি নাহিদসহ সব আসামিকে দ্রুত গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।
প্রধান আসামি নাহিদ হাসানকে ধরিয়ে দিতে তথ্য প্রদানকারীকে এক লাখ টাকা পুরস্কার দেওয়ার ঘোষণা করেছেন শেখ মাসুম বিল্লাহ শাহীন।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সাতক্ষীরা সদর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আলমগীর হোসেন বলেন, গ্রেপ্তার মুহিদ হাসান বনিকে রোববার সকালে আদালতে পাঠানো হয়েছে। তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সাত দিনের রিমান্ডের আবেদন করা হবে।
মামলা-সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, নাহিদ হাসানের বিরুদ্ধে ২০২৩ সালের ২৩ অক্টোবর বকচরা দাখিল মাদরাসার সুপার মো. রমজান আলীকে প্রকাশ্যে ছুরিকাঘাত করে গুরুতর জখম করার অভিযোগে সদর থানায় মামলা রয়েছে। ওই মামলায় অভিযোগপত্রও দেওয়া হয়েছে বলে সূত্রটি দাবি করেছে।
এ ছাড়া ২০২৬ সালের ১২ এপ্রিল শহরের ‘ফুচকা বাংলা’র পরিচালক আজিজুল ইসলামকে ছুরিকাঘাত করে জখম করার ঘটনায়ও নাহিদের বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। বাঁকাল-ইসলামপুর এলাকার এক যুবককে ছুরিকাঘাতসহ শহরের বিভিন্ন স্থানে ছুরিকাঘাত ও আঙুল কেটে দেওয়ার মতো অভিযোগেও তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে বলে সূত্রটি জানিয়েছে।
তথ্য অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০১৩ সালে ভোমরা সড়কের গাংনিয়া ব্রিজ এলাকায় চোরাকারবারিদের হামলায় নাহিদের বাবা গিয়াসউদ্দিন নিহত হন। এরপর নাহিদ অপরাধজগতে জড়িয়ে পড়েন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
চাঞ্চল্যকর এ হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে নাহিদের চাচা নাছির উদ্দীনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি অভিযোগগুলো অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, ‘আমার ভাইপো মুহিদ হাসান বনি ও জাকির হোসেন রনি এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত নয়। ঘটনার সময় নাহিদ নিজেও সেখানে ছিল না। আমাদের পরিবারকে সামাজিকভাবে হেয় করতে পরিকল্পিতভাবে হয়রানি করা হচ্ছে।’
নাহিদের অতীতের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের বিষয়ে জানতে চাইলে নাছির উদ্দীন বলেন, ‘তার বিরুদ্ধে আগের কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে পুলিশ তাকে ধরুক, তাতে আমাদের আপত্তি নেই। কিন্তু নিরীহ কাউকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে আটক করা ঠিক হবে না।’
তবে মামলায় আনা অভিযোগের বিষয়ে প্রধান আসামি নাহিদ হাসানসহ পলাতক অন্য আসামিদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সাতক্ষীরার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) মিথুন সরকার বলেন, কলেজছাত্র জাকারিয়া হত্যার ঘটনায় ইতোমধ্যে একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।