হিজরি বর্ষের দ্বিতীয় মাস হলো সফর। আমাদের সমাজে সফর মাসকে কেন্দ্র করে নানা ধরনের কুসংস্কার ও ভিত্তিহীন বিশ্বাস প্রচলিত রয়েছে। কেউ মনে করেন, এ মাস অশুভ; কেউ নতুন কাজ, ব্যবসা, বিবাহ বা ভ্রমণ শুরু করতে ভয় পান। অথচ কুরআন ও সহিহ হাদিসে সফর মাসকে অশুভ বা দুর্ভাগ্যের মাস বলা হয়নি। বরং ইসলাম এসব কুসংস্কারকে কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে।
সফর মাস সম্পর্কে কুরআনের দৃষ্টিভঙ্গি
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহর নিকট মাসের সংখ্যা বারোটি।’ সুরা আত-তাওবা: ৯:৩৬
এই আয়াতে আল্লাহ বারো মাসের কথা উল্লেখ করেছেন। কোথাও কোনো মাসকে অশুভ বা অমঙ্গলজনক বলা হয়নি।
আল্লাহ আরও বলেন, ‘আল্লাহর অনুমতি ছাড়া কোনো বিপদই আসে না।’ আত-তাগাবুন: ৬৪:১১
অতএব, কোনো মাস নিজে শুভ বা অশুভ নয়; সবকিছু আল্লাহর ইচ্ছাতেই সংঘটিত হয়।
সফর মাস সম্পর্কে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ঘোষণা
১. সফর মাসকে অশুভ মনে করা জাহেলিয়াতের বিশ্বাস
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘সংক্রামক রোগ (স্বতন্ত্রভাবে প্রভাব ফেলে- এমন বিশ্বাস), কুসংস্কার, হা-মা (জাহেলি বিশ্বাস) এবং সফর (মাসকে অশুভ মনে করা) কোনোটিই সত্য নয়। বুখারি: ৫৭৫৭; মুসলিম: ২২২০
ইমাম নববি (রহ.) বলেন, এখানে ‘ওয়ালা সফরা’ দ্বারা জাহেলি যুগে সফর মাসকে অশুভ মনে করার বিশ্বাসকে বাতিল করা হয়েছে। মুসলিম, ইমাম নববি
জাহেলি যুগে সফর সম্পর্কে ধারণা
ইসলামপূর্ব আরবরা বিশ্বাস করতো, সফর মাসে ভ্রমণ করলে অমঙ্গল হবে। বিয়ে করলে সংসারে অশান্তি হবে। নতুন ব্যবসা শুরু করলে ক্ষতি হবে। বিভিন্ন দুর্যোগ সফর মাসেই বেশি আসে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এসব ধারণাকে সম্পূর্ণ বাতিল করে দিয়েছেন।
সফর মাসে বিয়ে বা নতুন কাজ অবশ্যই করা যাবে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিংবা সাহাবায়ে কেরাম (রা.)-এর যুগে সফর মাসে বিয়ে, ব্যবসা বা সফর নিষিদ্ধ ছিল- এমন কোনো সহিহ দলিল নেই।
বরং ইসলাম শিক্ষা দেয়, ‘কুসংস্কার বলে কিছু নেই।’ বুখারি: ৫৭৫৩; মুসলিম: ২২২৪
সফর মাসের শেষ বুধবারের বিশেষ আমল
সমাজে প্রচলিত আছে যে, সফরের শেষ বুধবার বিশেষ নামাজ, রুটি, দোয়া বা বিশেষ ইবাদত করতে হয়।
এ ব্যাপারে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে কোনো সহিহ হাদিস নেই।
হাফেজ ইবনে হাজার (রহ.) ও অন্যান্য মুহাদ্দিসরা এসব বর্ণনাকে ভিত্তিহীন বা জাল বলেছেন। আল-মাকাসিদুল হাসানাহ; ইমাম সাখাবি; আল-আসরারুল মারফুআহ; মুল্লা আলি কারি
সফর মাসে বেশি বিপদ আসে—-ধারণারও কোনো শরয়ি ভিত্তি নেই।
আল্লাহ বলেন, ‘বলুন, আমাদের ওপর আল্লাহ যা নির্ধারণ করেছেন, তা ছাড়া কিছুই আপতিত হবে না।’ আত-তাওবা: ৯:৫১
সফর মাসে করণীয়
পাঁচ ওয়াক্ত সালাত যথাযথভাবে আদায় করা। কুরআন তিলাওয়াত করা। বেশি বেশি ইস্তিগফার ও দোয়া করা। আল্লাহর ওপর পূর্ণ তাওয়াক্কুল রাখা। কুসংস্কার ও শিরক থেকে বেঁচে থাকা। যেকোনো বৈধ কাজ আল্লাহর নামে শুরু করা।
বর্জনীয়
সফর মাসকে অশুভ মনে করা। সফরের কারণে বিয়ে, ব্যবসা বা ভ্রমণ বন্ধ রাখা। সফরের শেষ বুধবারকে বিশেষ ফজিলতের দিন মনে করা। জাল হাদিস বা ভিত্তিহীন আমল প্রচার করা। ভাগ্য গণনা, অশুভ লক্ষণ বা কুসংস্কারে বিশ্বাস করা।
সফর মাসে সংঘটিত ইতিহাসের উল্লেখযোগ্য ঘটনাবলি
সফর মাসকে কেন্দ্র করে বিশেষ কোনো শুভ বা অশুভ ঘটনার বিশ্বাস ইসলামে নেই। তবে ইসলামের ইতিহাসে এ মাসে কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। এগুলো ঐতিহাসিক তথ্য; এগুলোর কারণে সফর মাসের বিশেষ ফজিলত বা অশুভতা প্রমাণিত হয় না।
১. রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অসুস্থতার সূচনা (১১ হিজরি)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওফাতের পূর্বে সফর মাসের শেষ দিকে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। এরপর প্রায় ১৩ দিন অসুস্থ থাকার পর ১২ রবিউল আউয়াল ১১ হিজরিতে ইন্তিকাল করেন। ইবন হিশাম; আস-সীরাহ আন-নাবাবিয়্যাহ: ৪/২৯৮; ইবন কাসির; আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ: ৫/২২৭; আর-রাহিকুল মাখতুম
২. উসামা ইবন জায়েদ (রা.)-এর বাহিনী প্রস্তুত
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার জীবনের শেষ সময়ে রোমান সীমান্তে অভিযানের জন্য উসামা ইবন জায়েদ (রা.)-কে সেনাপতি নিযুক্ত করেন। সফর মাসে এ বাহিনী প্রস্তুত হয়। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অসুস্থতার কারণে যাত্রা বিলম্বিত হয় এবং আবু বকর (রা.)-এর খেলাফতের শুরুতে অভিযান সম্পন্ন হয়। ইবন কাসির; আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ: ৬:৩০৫; আত-তাবারি; তারিখুত তাবারি: ৩/২২৬
৩. আবওয়া (ওয়াদ্দান) অভিযান (২ হিজরি)
হিজরতের পর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রথম সামরিক অভিযান (গাজওয়া) ছিল গাজওয়াতুল আবওয়া বা ওয়াদ্দান অভিযান; যা অধিকাংশ সীরাতবিদের মতে সফর মাসে সংঘটিত হয়। এ অভিযানে যুদ্ধ হয়নি; বরং বানু দামরাহ গোত্রের সঙ্গে শান্তিচুক্তি সম্পাদিত হয়। ইবন হিশাম; আস-সিরাহ: ২/২৫১; ইবন সা’দ; আত-তাবাকাতুল কুবরা: ২/৭)
৪. বিয়রে মা’উনার মর্মান্তিক ঘটনা (৪ হিজরি)
অনেক ঐতিহাসিকের মতে, সফর ৪ হিজরিতে ৭০ জন কুরআনের হাফিজ সাহাবিকে দাওয়াতের উদ্দেশ্যে পাঠানো হলে বিশ্বাসঘাতকতার মাধ্যমে তাদের শহীদ করা হয়।
শিক্ষা: দাওয়াতের পথে ত্যাগ, ধৈর্য ও আল্লাহর ওপর ভরসা। বুখারি: ৪০৯০; ইবন কাসির; আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ: ৪:৭৪
৫. খায়বার অভিযানের যাত্রা (৭ হিজরি)
কিছু ঐতিহাসিক বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুহাররমের শেষ বা সফরের শুরুতে খায়বারের উদ্দেশে যাত্রা করেন। যদিও এ বিষয়ে বর্ণনায় মতভেদ রয়েছে। ইবন কাসির; আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ: ৪/১৮৫; আর-রাহিকুল মাখতুম
৬. খালিদ ইবন ওয়ালিদ (রা.)-এর ইয়ামামার অভিযানের প্রস্তুতি
রিদ্দাহ যুদ্ধের ধারাবাহিকতায় সফর ১১ হিজরিতে মুসলিম বাহিনীর বিভিন্ন সামরিক প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়, যা পরবর্তীতে ইয়ামামার যুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আত-তাবারি; তারিখুত তাবারি ইবন কাসির; আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ
গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা
ইতিহাসে কিছু ঘটনা সফর মাসে ঘটেছে বলে এ মাসকে অশুভ বলা যাবে না। আবার কোনো বিজয় বা সফলতা সংঘটিত হয়েছে বলে একে বিশেষ বরকতময় মাসও বলা যাবে না।
সফর মাসে সংঘটিত ঐতিহাসিক ঘটনাগুলো থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা উচিত; কিন্তু এগুলোকে কেন্দ্র করে বিশেষ ফজিলত, অশুভতা, বিশেষ আমল বা কুসংস্কার তৈরি করা শরিয়তসম্মত নয়। ইসলামের দৃষ্টিতে সব মাসই আল্লাহর সৃষ্টি, আর কল্যাণ-অকল্যাণ একমাত্র তাঁরই ফয়সালায় নির্ধারিত হয়।
মোদ্দাকথা, একজন মুমিনের কর্তব্য হলো, কুরআন-সুন্নাহর অনুসরণ করা এবং সব অবস্থায় আল্লাহর ওপর ভরসা রাখা। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘অশুভ লক্ষণে বিশ্বাস করা শিরকের অন্তর্ভুক্ত।’ আবু দাউদ: ৩৯১০; তিরমিজি: ১৬১৪ (অর্থগত সমর্থনসহ)
লেখক: সিনিয়র মুহাদ্দিস, আল জামিয়াতুল ইসলামিয়া দড়াটানা মাদরাসা, যশোর