মুফতি আরিফুল ইসলাম ফয়সাল
সমাজে মানুষের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদগুলোর একটি হলো তার ইজ্জত ও সম্মান। ইসলাম এই সম্মান রক্ষাকে ইমানের অংশ হিসেবে বিবেচনা করেছে। অথচ দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, আজ গুজব, সন্দেহ ও যাচাইহীন কথার ভিত্তিতে মানুষ সহজেই অন্যের বিরুদ্ধে জেনা বা ব্যভিচারের অপবাদ আরোপ করছে। ইসলামি শরিয়তে এ অপরাধকে বলা হয় কজফ- যার শাস্তি ও পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ।
কজফ কী
শরিয়তের পরিভাষায়, কোনো পবিত্র মুসলিম নারী বা পুরুষের বিরুদ্ধে চারজন গ্রহণযোগ্য সাক্ষী ছাড়া জেনা বা ব্যভিচারের অভিযোগ তোলাকেই কজফ বলা হয়। এটি সাধারণ নৈতিক অপরাধ নয়; বরং কুরআন-সুন্নাহ দ্বারা নির্ধারিত একটি কবিরা গুনাহ।
কুরআনের বিধান
আল্লাহ তাআলা সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন, ‘আর যারা পবিত্র নারীদের বিরুদ্ধে অপবাদ দেয়, অতঃপর চারজন সাক্ষী উপস্থিত করতে পারে না, তাদেরকে ৮০ বেত্রাঘাত করো এবং কখনো তাদের সাক্ষ্য গ্রহণ করো না। তারাই ফাসিক।’ সুরা নুর: ৪
এই একটি আয়াত থেকেই কজফকারীর জন্য তিনটি কঠিন শাস্তি নির্ধারিত হয়েছে। ১. ৮০ বেত্রাঘাত ২. আজীবন সাক্ষ্যে অযোগ্যতা ৩. ফাসিক হিসেবে সামাজিকভাবে চিহ্নিত হওয়া।
মানুষের ইজ্জত ও সম্মান রক্ষা ইসলামের মৌলিক উদ্দেশ্যগুলোর অন্যতম। ইসলাম এমন সব কার্যকলাপ নিষিদ্ধ করেছে, যা মানুষের চরিত্র ও সামাজিক নিরাপত্তা ধ্বংস করে। কজফ অর্থাৎ কোনো পবিত্র মুসলিম নারী বা পুরুষের বিরুদ্ধে ব্যভিচারের অপবাদ আরোপ এমনই এক ভয়াবহ অপরাধ, যাকে কুরআন স্পষ্টভাবে কবিরা গুনাহ ঘোষণা করেছে এবং কঠোর শাস্তির বিধান দিয়েছে।
কজফ বিষয়ে ইসলামের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও শিক্ষণীয় ঘটনা হলো হাদিসে ইফক। এ ঘটনায় মুনাফিকদের একটি দল উম্মুল মুমিনীন আয়েশা (রা.)-এর বিরুদ্ধে অপবাদ ছড়ায়। এতে মদিনার সমাজ সাময়িকভাবে আলোড়িত হয়।
রাসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবেগপ্রবণ হয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেননি; বরং তিনি আল্লাহর নির্দেশের অপেক্ষা করেন। পরে কুরআনের আয়াত নাজিল হয়ে আয়েশা (রা.)-এর পবিত্রতা ঘোষণা করে এবং অপবাদদাতাদের নিন্দা করে। সুরা নুর: ১১-২৬; সহিহ বুখারি, কিতাবুশ শাহাদাত, সহিহ মুসলিম, কিতাবুত তাওবা
আইন সবার জন্য সমান
হদে কজফ (অপবাদের শাস্তি) কার্যকর হাদিসে ইফকের ঘটনায় কিছু সাহাবি অসতর্কভাবে গুজবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। সত্য উদ্ঘাটনের পর রাসুল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের সামাজিক মর্যাদা বিবেচনা না করে শরই আইন অনুযায়ী হদে কজফ কার্যকর করেন।
এটি প্রমাণ করে, ইসলামে আইন প্রয়োগে আত্মীয়তা বা মর্যাদার কোনো স্থান নেই। সুনানে আবু দাউদ, কিতাবুল হুদুদ, সুনানে তিরমিজি
উমর (রা.): ন্যায়বিচারের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত
খলিফা উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর শাসনামলে এক ব্যক্তি প্রমাণ ছাড়া ব্যভিচারের অভিযোগ তোলে। চারজন সাক্ষী হাজির করতে ব্যর্থ হওয়ায় অভিযুক্ত নয়, বরং অভিযোগকারীর ওপর হদে কজফ কার্যকর করা হয়। খলিফা উমর (রা.) বলতেন, ‘মানুষের সম্মান তার রক্তের মতোই পবিত্র।’ মুয়াত্তা ইমাম মালিক, কিতাবুল আকদিয়া, আল-বাইহাকি, আস-সুনানুল কুবরা
আলী (রা.): জবান সংযম ও সামাজিক নিরাপত্তা
খলিফা আলী ইবনু আবি তালিব (রা.) অপবাদ ও কটু কথার ব্যাপারে কঠোর সতর্কতা অবলম্বন করতেন। তিনি বলতেন, ‘মানুষের জিহ্বাই তাকে সম্মানিত অথবা অপমানিত করে।’ তার শাসনামলে প্রমাণ ছাড়া অভিযোগ তোলাকে বড় অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হতো। নাহজুল বালাগা, হিকমাহ অংশ, ইবনু আবি শাইবা, আল-মুসান্নাফ
কজফ বিধানের সামাজিক প্রভাব
ইসলামের সোনালি যুগে কজফের কঠোর বিধানের ফলে গুজব ও চরিত্রহনন দমিত হয়। নারী ও পরিবারের সম্মান সুরক্ষিত থাকে। সমাজে আস্থা ও নৈতিকতা প্রতিষ্ঠিত হয়।
এ শাস্তি কোনো নিষ্ঠুরতা নয়; বরং সমাজকে ব্যভিচার ও চরিত্রহননের চেয়েও বড় বিপর্যয় থেকে রক্ষা করার করুণাময় ব্যবস্থা।
আখিরাতের ভয়াবহতা
শাস্তি শুধু দুনিয়াতেই সীমাবদ্ধ নয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই যারা দুনিয়া ও আখিরাতে পবিত্র নারীদের বিরুদ্ধে অপবাদ দেয়, তাদের ওপর আল্লাহর লানত এবং তাদের জন্য রয়েছে মহা শাস্তি।’ সুরা নুর: ২৩
এ আয়াত প্রমাণ করে, জেনা-অপবাদ আল্লাহর রহমত থেকে দূরে সরিয়ে দেয়।
নবী করিম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ধ্বংসকারী ভয়ংকর গুনাহসমূহের বর্ণনায় বলেন, ‘সাতটি ধ্বংসকারী গুনাহ থেকে বেঁচে থাকো... তার মধ্যে একটি হলো পবিত্র, নিরপরাধ, ঈমানদার নারীর বিরুদ্ধে অপবাদ দেওয়া।’ সহিহ বুখারি; সহিহ মুসলিম
অর্থাৎ কজফ এমন গুনাহ, যা মানুষের দুনিয়া ও আখিরাত- উভয়ই ধ্বংস করে দেয়।
চারজন সাক্ষীর কঠোর শর্ত কেন
ইসলাম মানুষের সম্মান রক্ষায় এতটাই সতর্ক যে, সন্দেহ, শোনা কথা, সামাজিক মাধ্যমের পোস্ট, ছবি বা ভিডিও এসবকে শরিয়তের সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করে না, যতক্ষণ না চারজন ন্যায়পরায়ণ প্রত্যক্ষদর্শী একই ঘটনার সাক্ষ্য দেন। এটি অপবাদ, ব্ল্যাকমেইল ও চরিত্রহনন বন্ধ করার একটি অনন্য ব্যবস্থা।
সামাজিক বিপর্যয়
জেনা-অপবাদ সমাজে যে ভয়াবহ প্রভাব ফেলে, নিরপরাধ মানুষের মানসিক বিপর্যয়, পরিবারে ভাঙন ও আত্মহত্যা, সামাজিক অবিশ্বাস ও নৈতিক অবক্ষয়, গুজব ও অশ্লীলতার বিস্তার- এসব ক্ষতির কারণেই ইসলাম কজফের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তি নির্ধারণ করেছে।
মোটকথা, জেনা বা ব্যভিচারের অপবাদ কোনো তুচ্ছ কথা নয়, এটি ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজ ধ্বংসের নীরব অস্ত্র। ইসলাম আমাদের শিখিয়েছে, মানুষের সম্মান রক্ষা করা ইবাদত, আর অপবাদ দেওয়া মারাত্মক গুনাহ।
রাসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ও আখিরাতে বিশ্বাস করে, সে যেন ভালো কথা বলে অথবা চুপ থাকে।’ সহিহ বুখারি
আজকের ডিজিটাল ও গুজবনির্ভর সমাজে কজফের ক্ষতি বহুগুণ বেড়েছে। ইসলামের সোনালি যুগের ঘটনাগুলো আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, প্রমাণ ছাড়া কথা বলা জুলুম, আর অপবাদ ছড়ানো ইমানের জন্য মারাত্মক হুমকি। ইসলামের কজফ বিধান বাস্তবায়নই পারে একটি নিরাপদ, নৈতিক ও সম্মানিত সমাজ গড়ে তুলতে।
তাই একজন সচেতন নাগরিক ও ঈমানদার মুসলিম হিসেবে আমাদের করণীয় হলো, যাচাই ছাড়া কোনো অভিযোগ না ছড়ানো, গুজব ও চরিত্রহননমূলক সংবাদ এড়িয়ে চলা, সামাজিক মাধ্যমে দায়িত্বশীল আচরণ এবং নিজের জিহ্বা ও কলম সংযত রাখা।
লেখক: সিনিয়র মুহাদ্দিস, আল জামিয়াতুল ইসলামিয়া দড়াটানা মাদরাসা
ইমাম ও খতিব, নলডাঙ্গা রোড জামে মসজিদ, যশোর