মুফতি আরিফুল ইসলাম ফয়সাল
ইসলামি বর্ষপঞ্জির প্রথম মাস মুহাররম অত্যন্ত সম্মানিত মাস। এ মাসের দশম দিনকে বলা হয় আশুরা। আশুরা এমন একটি দিন, যার সঙ্গে বহু নবী-রাসুলের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা, ইসলামের মৌলিক শিক্ষা, ত্যাগ ও সত্যের ইতিহাস গভীরভাবে সম্পৃক্ত।
আশুরার অর্থ ও পরিচয়
আশুরা শব্দটি আরবি ‘আশারা’ থেকে এসেছে, যার অর্থ দশ। অর্থাৎ মুহাররম মাসের দশ তারিখ হলো আশুরা। ইমাম ইবনু কাসির (রহ.) বলেন, ‘আশুরা হলো মুহাররম মাসের দশম দিন, যা জাহেলিয়্যাত যুগেও সম্মানিত ছিল।’ আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ
কুরআনের আলোকে মুহাররম ও আশুরার মর্যাদা
আশুরার নাম কুরআনে সরাসরি উল্লেখ না থাকলেও মুহাররম মাসের মর্যাদা কুরআনে স্পষ্টভাবে এসেছে: ‘নিশ্চয়ই আল্লাহর নিকট মাসের সংখ্যা ১২টি... এর মধ্যে চারটি সম্মানিত।’ সুরা আত-তাওবা: ৩৬
মুহাররম সেই চার সম্মানিত মাসের অন্যতম।
হাদিসের আলোকে আশুরার ফজিলত
আশুরার রোজার ফজিলত: রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘আমি আল্লাহর কাছে আশা করি, আশুরার রোজা পূর্ববর্তী এক বছরের গুনাহ মাফ করে দেবে।’ সহিহ মুসলিম: ১১৬২
কেন রোজা রাখা শুরু হলো
যখন রাসুল (স.) মদিনায় আগমন করেন, তিনি দেখেন ইহুদিরা আশুরার দিনে রোজা রাখে। কারণ জিজ্ঞেস করলে তারা বলে, ‘এ দিনে আল্লাহ মুসা (আ.) ও বনি ইসরাইলকে ফেরাউনের কবল থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন।’ তখন রাসুল (স.) বলেন, ‘আমরা মুসার অধিক হকদার।’ সহিহ বুখারি: ২০০৪; মুসলিম: ১১৩০)
আশুরা-সংশ্লিষ্ট ঐতিহাসিক ঘটনাবলি
ইতিহাসবিদ ও মুহাদ্দিসগণ উল্লেখ করেছেন, আশুরার দিনে বহু তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। উল্লেখযোগ্য কিছু ঘটনা:
আল্লাহ তায়ালা আদম (আ.)-এর তওবা কবুল করেন, নূহ (আ.)-এর কিশতি জুদি পাহাড়ে স্থির হয়, ইব্রাহিম (আ.) আগুন থেকে মুক্তি পান, ইউনুস (আ.) মাছের পেট থেকে উদ্ধার হন, মসা (আ.) ও বনি ইসরাইল ফেরাউন থেকে মুক্তি পান। আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ, তারিখুত তাবারি
কারবালার ঘটনা: সত্য ও ত্যাগের শিক্ষা
হিজরি ৬১ সন, মুহাররম মাসে ইসলামের ইতিহাসে এক হৃদয়বিদারক অধ্যায় রচিত হয়, যা কারবালার ঘটনা নামে পরিচিত।
পটভূমি
উমাইয়া শাসক ইয়াজিদ ইবনে মু’আবিয়া খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণের পর জোরপূর্বক বাইআত (আনুগত্যের শপথ) আদায় করতে থাকেন। কিন্তু রাসুল (সা.)-এর প্রিয় দৌহিত্র হুসাইন ইবনে আলী (রা.) ইয়াজিদের চরিত্র ও শাসননীতিকে ইসলামসম্মত মনে না করায় বাইআত দিতে অস্বীকার করেন।
কুফাবাসীর আহ্বান: ইরাকের কুফাবাসী হজরত হুসাইন (রা.)-কে অসংখ্য চিঠি লিখে তাদের নেতৃত্ব দিতে আমন্ত্রণ জানায়। সেই আহ্বানে সাড়া দিয়ে তিনি পরিবার-পরিজন ও অল্পসংখ্যক সাথী নিয়ে মক্কা থেকে কুফার পথে রওনা হন।
কারবালায় অবরোধ: পথিমধ্যে ইয়াজিদের বাহিনী তাঁকে কুফায় প্রবেশে বাধা দেয় এবং কারবালা নামক স্থানে অবরুদ্ধ করে ফেলে। শিশু ও নারীসহ তাঁর কাফেলাকে পানি সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া হয়; মুহাররমের প্রচণ্ড গরমে যা ছিল চরম মানবিক নিপীড়ন।
আশুরার দিন (১০ মুহাররম): হিজরি ৬১ সনের ১০ মুহাররম (আশুরা) দিনে ইয়াজিদের বিশাল বাহিনীর সঙ্গে হজরত হুসাইন (রা.)-এর মাত্র ৭২ জন সাথীর অসম যুদ্ধ সংঘটিত হয়। একে একে তাঁর সাথী ও পরিবারের সদস্যরা শাহাদাতবরণ করেন।
শেষ পর্যন্ত হজরত হুসাইন (রা.) নিজেও শাহাদাতবরণ করেন। তাঁর শাহাদাত ছিল জুলুমের বিরুদ্ধে সত্যের চূড়ান্ত আত্মত্যাগ; ক্ষমতার লোভ নয়, বরং দ্বীন রক্ষার অনন্য দৃষ্টান্ত।
এই ঘটনা আমাদের শিক্ষা দেয় জুলুমের কাছে মাথা নত না করা, সত্য ও ন্যায়ের পথে অবিচল থাকা, ইসলামের মূলনীতি রক্ষা করতে আত্মত্যাগ করা।
তবে মনে রাখতে হবে, কারবালার শোক পালনের নামে শরিয়তবিরোধী কাজ ইসলাম সমর্থন করে না।
আশুরায় করণীয় আমলসমূহ
রোজা রাখা। উত্তম হলো: ৯ ও ১০ মুহাররম, অথবা: ১০ ও ১১ মুহাররম। সহিহ মুসলিম
নফল ইবাদত, সালাত, কুরআন তিলাওয়াত, দুআ ও ইস্তিগফার, পরিবারে উদারতা দেখানো। এ প্রসঙ্গে হাদিস: ‘যে ব্যক্তি আশুরার দিনে তার পরিবারে প্রশস্ততা করে, আল্লাহ সারা বছর তার রিজিকে বরকত দেন।’ বায়হাকি
আশুরায় বর্জনীয় কাজসমূহ
মাতম, বুক চাপড়ানো, রক্তাক্ত শোক পালন, নিজেকে আঘাত করা, তাজিয়া বানানো, শোকের বিশেষ পোশাক বা শিয়া প্রথা অনুসরণ। ভিত্তিহীন কিচ্ছা ও জাল হাদিস প্রচার। আশুরার দিনকে ঈদ বানানো বা বিশেষ উৎসব করা।
ইসলামে শোক পালনের বিধান
ইসলামে শোক পালন করা স্বভাবগতভাবে বৈধ, তবে তার সময়সীমা, পদ্ধতি ও সীমা নির্ধারিত। সীমা অতিক্রম করলে তা নিষিদ্ধ (হারাম/মাকরুহ) হয়ে যায়। সাধারণ মুসলমানের জন্য ৩ দিন পর্যন্ত শোক করা বৈধ।
হাদিসে এসেছে, ‘কোনো মুসলিম নারীর জন্য আল্লাহ ও আখিরাতে বিশ্বাস থাকলে তিন দিনের বেশি কারো জন্য শোক পালন করা হালাল নয়, স্বামী ছাড়া।’ সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম
এই হুকুম নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য প্রযোজ্য।
স্বামীর মৃত্যু হলে (ইদ্দতের শোক)
স্বামীর মৃত্যুর পর স্ত্রী চার মাস দশ দিন শোক পালন করবে (ইদ্দতকাল)।
দলিল: ‘তোমাদের মধ্যে যারা স্ত্রী রেখে মারা যায়, তাদের স্ত্রীরা চার মাস দশ দিন অপেক্ষা করবে।’ সুরা বাকারা: ২৩৪
বুঝা গেল, প্রতিবছর শোক দিবস পালন করা ইসলামের বিধান নয়। সেই সাথে শোক পালনের নামে শরীরে আঘাত করা, মাতম করা ইত্যাদি ইসলাম সমর্থন করে না। এ প্রসঙ্গে রাসুল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘যে ব্যক্তি গাল চাপড়ায়, জামা ছেড়ে এবং জাহেলিয়াতের ডাক দেয়, সে আমাদের দলভুক্ত নয়। সহিহ বুখারি
মনে রাখতে হবে, আশুরা আমাদের জন্য তাওহিদ ও শোকরের দিন, সত্য ও ত্যাগের শিক্ষা গ্রহণের দিন, সুন্নাহসম্মত আমলে আত্মনিয়োগের দিন। আসুন, আমরা আশুরাকে বিদআত ও বাড়াবাড়ি থেকে মুক্ত রেখে কুরআন-সুন্নাহর আলোকে যথাযথভাবে পালন করি।
হে আল্লাহ! আমাদের সুন্নাহ অনুসরণের তাওফিক দিন এবং আশুরাকে আমাদের জন্য হিদায়াত ও মাগফিরাতের দিন বানান। আমিন
লেখক: সিনিয়র মুহাদ্দিস, আল জামিয়াতুল ইসলামিয়া দড়াটানা মাদরাসা, যশোর