সুবর্ণভূমি ডেস্ক
আমরা সবাই শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে বাঁচতে ও নিরাপদ থাকতে চাই। কিন্তু দৈনন্দিন জীবনে মানুষ প্রায়শই শয়তানের নানা কুমন্ত্রণা ও ষড়যন্ত্রের জালে আবদ্ধ হয়ে নানাবিধ অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। এতে আমাদের আমলের খাতায় গুনাহ লেখা হয় এবং গুনাহের পাল্লা ভারী হতে থাকে। তবে শয়তানের এই অনিষ্ট থেকে বাঁচার চমৎকার একটি উপায় স্বয়ং শয়তানের মাধ্যমেই প্রকাশ পেয়েছিল। শয়তান নিজে সাহাবি হজরত আবু হুরায়রা (রা.) কে তার কুমন্ত্রণা থেকে বাঁচার জন্য পবিত্র কোরআনের একটি আয়াতের কথা জানিয়েছিল। আয়াতটি হলো 'আয়াতুল কুরসি'। এটি সুরা বাকারার ২৫৫ নম্বর আয়াত।
হজরত মুহাম্মদ (সা.) একে কোরআনের শ্রেষ্ঠ আয়াত বলেছেন। তিনি এই আয়াত দিনে ও রাতে পড়ার নির্দেশ দিয়েছেন। সকালে এই আয়াত পড়লে সারাদিন শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে বেঁচে থাকা যায়। আবার সন্ধ্যায় এই আয়াত পড়লে সকাল পর্যন্ত শয়তান থেকে নিরাপদ থাকা যায়।
এ প্রসঙ্গে হাদিসে একটি চমৎকার ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাকে রমজানের জাকাত (সদকাতুল ফিতরের খেজুর) পাহারা দেওয়ার দায়িত্ব দিয়েছিলেন। রাতে এক আগন্তুক এসে স্তূপীকৃত খেজুর থেকে মুঠি ভরে নিতে লাগল। আমি তাকে ধরে ফেললাম এবং বললাম, তোমাকে আল্লাহর রাসুলের কাছে হাজির করব। সে বলল, দেখুন, আমি একজন চরম অভাবী। আমার তীব্র প্রয়োজন রয়েছে এবং আমি পরিবার-পরিজনের ভারগ্রস্ত লোক। তার কথা শুনে আমার দয়া হলো এবং আমি তাকে ছেড়ে দিলাম। সকালে নবী (সা.) আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, আবু হুরায়রা, তোমার গত রাতের বন্দির কী হলো? আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসুল, সে তার অভাব-অনটন ও পরিবারের ভারগ্রস্ততার কথা বলায় আমার মনে দয়া জেগেছিল, তাই তাকে ছেড়ে দিয়েছি। নবী (সা.) বললেন, সে তোমাকে মিথ্যা বলেছে। সে আবারও আসবে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) যখন বলেছেন আসবে, তখন অবশ্যই সে আসবে এই ভেবে আমি দ্বিতীয় রাতে তার অপেক্ষায় প্রস্তুত হয়ে রইলাম। এর মধ্যে সে আবার এসে স্তূপীকৃত খেজুর থেকে মুঠি ভরে নিতে লাগল। আমি তাকে ধরে বললাম, এবার তোমাকে আল্লাহর রাসুলের কাছে হাজির করবই। সে তখন অনুনয় করে বলতে লাগল, আমাকে ছেড়ে দিন। আমি সত্যিই অভাবী লোক এবং পরিবারের ভারগ্রস্ত, আমি আর আসব না। তার এ কথায় আবারও আমার দয়া হলো এবং ছেড়ে দিলাম। সকালে রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, তোমার বন্দির কী হলো? বললাম, হে আল্লাহর রাসুল, সে তার প্রচণ্ড অভাব ও পরিবারের কষ্টের কথা বলছিল, তাই তাকে ছেড়ে দিয়েছি। তিনি বললেন, দেখ, সে তোমাকে মিথ্যা বলেছে। সে আবারও আসবে।
নবীজির এ কথায় তৃতীয় রাতেও আমি ওত পেতে রইলাম। একপর্যায়ে সে এসে মুঠি ভরে খাদ্য নিতে লাগল। আমি তাকে শক্ত করে ধরে ফেলে বললাম, এবার তোমাকে রাসুলুল্লাহর কাছে হাজির করেই ছাড়ব। এ নিয়ে তিনবার হলো যে তুমি বলো আসবে না, কিন্তু আবার আসো। তখন সে বলল, আমাকে ছেড়ে দিন। আপনাকে এমন কিছু কথা শিখিয়ে দেব, যা দিয়ে আল্লাহ আপনার উপকার করবেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম, কী সেই কথা? সে বলল, যখন আপনি বিছানায় ঘুমাতে যাবেন, তখন আয়াতুল কুরসি পড়বেন। তাহলে আল্লাহর পক্ষ থেকে সকাল পর্যন্ত আপনার জন্য একজন রক্ষাকর্তা নিযুক্ত থাকবেন এবং সকাল পর্যন্ত কোনো শয়তান আপনার কাছে ঘেঁষতে পারবে না। এরপর আমি তাকে ছেড়ে দিলাম।
সকালে রাসুলুল্লাহ (সা.) জিজ্ঞেস করলেন, গত রাতে তোমার বন্দির কী হলো? আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসুল, সে দাবি করল যে আমাকে এমন কিছু কথা শিখিয়ে দেবে, যা দিয়ে আল্লাহ আমার উপকার করবেন। তাই তাকে ছেড়ে দিয়েছি। রাসুলুল্লাহ (সা.) জিজ্ঞেস করলেন, সেই কথাগুলো কী? আমি বললাম, সে বলেছে, যখন বিছানায় যাবে তখন আয়াতুল কুরসি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পাঠ করবে। সে আরও বলেছে, এর ফলে আল্লাহর পক্ষ থেকে সকাল পর্যন্ত একজন রক্ষাকর্তা নিযুক্ত থাকবেন আর কোনো শয়তান কাছে ভিড়বে না। (সাহাবিরা কল্যাণের বিষয়ে খুবই লালায়িত ছিলেন)। সব শুনে নবী (সা.) বললেন, শোনো, সে তোমাকে সত্য কথাই বলেছে, যদিও সে মস্ত বড় মিথ্যুক। এরপর নবীজি জিজ্ঞেস করলেন, আবু হুরায়রা, তুমি কি জানো পরপর তিন রাত তুমি কার সঙ্গে কথা বলেছ? আমি বললাম, না। নবী (সা.) বললেন, সে ছিল স্বয়ং এক শয়তান।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৩১১)
আয়াতুল কুরসির বাংলা উচ্চারণ:
আল্লাহু লা ইলাহা ইল্লা হুয়াল হাইয়ুল কাইয়ুম, লা তা'খুযুহু সিনাতুও ওয়ালা নাওম। লাহু মা ফিস-সামাওয়াতি ওয়ামা ফিল আরদ। মান যাল্লাযি ইয়াশফাউ 'ইন্দাহু ইল্লা বি-ইযনিহ। ইয়া'লামু মা বাইনা আইদিহিম ওয়ামা খালফাহুম, ওয়ালা ইউহিতুনা বিশাইয়িম-মিন 'ইলমিহি ইল্লা বিমা শা-আ। ওয়াসি'আ কুরসিইউহুস-সামাওয়াতি ওয়াল আরদ, ওয়ালা ইয়াউদুহু হিফযুহুমা, ওয়াহুয়াল 'আলিয়্যুল 'আজিম।
আয়াতুল কুরসির অর্থ:
আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো উপাস্য নেই। তিনি চিরঞ্জীব, সবকিছুর ধারক। তাকে তন্দ্রাও স্পর্শ করতে পারে না এবং নিদ্রাও নয়। আসমান ও জমিনে যা কিছু রয়েছে, সবই তার। কে আছে এমন যে সুপারিশ করবে তার কাছে তার অনুমতি ছাড়া? দৃষ্টির সামনে কিংবা পেছনে যা কিছু রয়েছে, সে সবই তিনি জানেন। তার জ্ঞানসীমা থেকে তারা কোনো কিছুকেই পরিবেষ্টিত করতে পারে না, তবে যতটুকু তিনি ইচ্ছা করেন। তার কুরসি (সিংহাসন) সমস্ত আসমান ও জমিনকে পরিবেষ্টিত করে আছে। আর সেগুলোকে ধারণ করা তাঁর পক্ষে কঠিন নয়। তিনিই সর্বোচ্চ এবং সর্বাপেক্ষা মহান।