মুফতি আরিফুল ইসলাম ফয়সাল
ইসলামের ইতিহাসে কিছু ঘটনা আছে, যা কেবল একটি যুদ্ধ বা ভূখণ্ড পুনরুদ্ধারের কাহিনি নয়; বরং ইমান, আদর্শ ও নেতৃত্বের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। হিত্তিনের যুদ্ধ এবং এর ধারাবাহিকতায় বায়তুল মুকাদ্দাস (জেরুজালেম) পুনরুদ্ধার তেমনই এক ঐতিহাসিক অধ্যায়, যা আজও মুসলিম উম্মাহকে পথনির্দেশনা দেয়।
হিত্তিনের যুদ্ধ: বিজয়ের পটভূমি
খ্রিস্টান ক্রুসেডাররা ১০৯৯ খ্রিস্টাব্দে বায়তুল মুকাদ্দাস দখল করার পর প্রায় ৮৮ বছর মুসলমানদের জন্য এই পবিত্র ভূমি বেদখলের যন্ত্রণার প্রতীক হয়ে ছিল। মুসলিম বিশ্ব তখন রাজনৈতিক বিভক্তি, নেতৃত্বের দুর্বলতা ও অভ্যন্তরীণ কোন্দলে জর্জরিত।
এই সংকটময় সময়ে ইতিহাসের মঞ্চে আবির্ভূত হন সালাহুদ্দিন আইয়ুবি। তিনি প্রথমে মুসলিম ভূখণ্ডগুলোকে ঐক্যবদ্ধ করেন, শাসনব্যবস্থায় ন্যায় ও তাকওয়ার প্রতিষ্ঠা ঘটান এবং জাতিকে জিহাদের জন্য মানসিক ও নৈতিকভাবে প্রস্তুত করেন। ১১৮৭ খ্রিস্টাব্দে ফিলিস্তিনের তাবারিয়া হ্রদের কাছে হিত্তিনের যুদ্ধ সংঘটিত হয়। কৌশলী নেতৃত্ব, ধৈর্যশীল পরিকল্পনা এবং আল্লাহর ওপর অগাধ তাওয়াক্কুলের মাধ্যমে সালাহুদ্দিন আইয়ুবির বাহিনী ক্রুসেডারদের বিশাল সেনাবাহিনীকে পরাজিত করে। এই যুদ্ধে ক্রুসেডারদের প্রধান শক্তি সম্পূর্ণরূপে ভেঙে পড়ে।
১০৯৯ খ্রিস্টাব্দে ক্রুসেডারদের হাতে জেরুজালেম দখলের সময় সংঘটিত নির্মম হত্যাযজ্ঞের কথা না জানলে হিত্তিনের বিজয় পাঠকের কাছে আবেদন রাখবে না বিধায় খানিকটা উল্লেখ করছি।
জেরুজালেম দখল (১০৯৯): ইতিহাসের এক ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞ
১০৯৯ খ্রিস্টাব্দ। প্রথম ক্রুসেডের শেষ অধ্যায়। দীর্ঘ অবরোধের পর ইউরোপীয় ক্রুসেডার বাহিনী পবিত্র নগরী জেরুজালেম দখল করে নেয়। কিন্তু এই দখল ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছে কোনো বীরত্বের জন্য নয়, বরং নির্মম, নিষ্ঠুর ও বিবেকহীন গণহত্যার জন্য। রক্তে ভেসে গিয়েছিল পবিত্র নগরী। ক্রুসেডাররা শহরে প্রবেশ করেই মুসলমান, ইহুদি এমনকি নিরস্ত্র নারী ও শিশুদের ওপর নির্বিচারে হামলা চালায়। সমসাময়িক খ্রিস্টান ও মুসলিম ইতিহাসবিদদের বর্ণনা অনুযায়ী, শহরের রাস্তায় রাস্তায় লাশের স্তূপ জমে যায়, আল-আকসা মসজিদ প্রাঙ্গণে হাজার হাজার মুসলমানকে হত্যা করা হয়, রক্তের স্রোত এত বেশি ছিল যে, ‘ঘোড়ার হাঁটু পর্যন্ত রক্ত জমেছিল’- এমন বর্ণনাও পাওয়া যায়। ইহুদিদের সিনাগগে আশ্রয় নেওয়ার পর সেখানেও আগুন লাগিয়ে পুড়িয়ে মারা হয়। এই হত্যাযজ্ঞ ছিল এতটাই ভয়াবহ যে মৃতদেহ পরিষ্কার করতে কয়েকদিন লেগে যায়। পবিত্র স্থানেও ছিল না নিরাপত্তা। যে নগরীকে তারা ‘পবিত্র ভূমি’ বলে দাবি করেছিল, সেই নগরীতেই তারা পবিত্রতার সব সীমা লঙ্ঘন করে। আল-আকসা মসজিদে নামাজরত মানুষদের হত্যা, গির্জা ও উপাসনালয়গুলোকে রক্তপাতের স্থানে পরিণত করা, আশ্রয়প্রার্থীদের পর্যন্ত রেহাই না দেওয়া। এই বর্বরতা শুধু সামরিক প্রয়োজন ছিল না; এটি ছিল ঘৃণা, প্রতিশোধ ও ধর্মান্ধতার প্রকাশ।
ইউরোপীয় ইতিহাসবিদদের স্বীকারোক্তি
এটি শুধু মুসলিম ইতিহাসবিদদের বক্তব্য নয়। বহু ইউরোপীয় ও খ্রিস্টান ঐতিহাসিকও স্বীকার করেছেন, জেরুজালেম দখলের সময় ক্রুসেডারদের আচরণ ছিল ‘অমানবিক’। এই হত্যাকাণ্ড মধ্যযুগের ইতিহাসে অন্যতম নৃশংস ঘটনা। ধর্মের নামে পরিচালিত হলেও এতে ধর্মীয় নৈতিকতার কোনো চিহ্ন ছিল না। অর্থাৎ, এই হত্যাযজ্ঞ ইতিহাসে অস্বীকারযোগ্য নয়, বরং প্রামাণ্য সত্য।
জেরুজালেম দখলের সময় ক্রুসেডারদের হত্যাযজ্ঞ ইতিহাসের এক কলঙ্কিত অধ্যায়। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ধর্মের নাম ব্যবহার করলেই কেউ নৈতিক হয়ে যায় না। বরং ন্যায়, মানবিকতা ও সংযমই ধর্মীয় নৈতিকতার প্রকৃত মানদণ্ড।
তাই হিত্তিনের যুদ্ধ শুধু সামরিক বিজয়ের ইতিহাস নয়; এটি মানবিকতা, ন্যায়পরায়ণতা ও ইসলামি আদর্শের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এই যুদ্ধে বিজয়ী সেনাপতি সালাহুদ্দিন আইয়ুবি এমন কিছু মহানুভব আচরণ প্রদর্শন করেন, যা শত্রুর হৃদয়েও গভীর ছাপ ফেলেছিল।
ঘটনা এক: বন্দী রাজা গাই দ্য লুসিগনানকে জীবনদান
হিত্তিন যুদ্ধে পরাজয়ের পর জেরুজালেমের ক্রুসেডার রাজা গাই দ্য লুসিগনান (এুঁ ড়ভ খঁংরমহধহ) সালাহুদ্দিনের হাতে বন্দী হন। যুদ্ধের পরবর্তী সময়ে প্রচণ্ড তৃষ্ণায় কাতর বন্দী রাজাকে সালাহুদ্দিন নিজ হাতে ঠান্ডা পানি পান করান। রাজা পানি পান করার পর সেটি পাশের আরেক বন্দী কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধী রেনাল্ড অব শাতিলোঁ-কে দিতে চাইলে সালাহুদ্দিন স্পষ্টভাবে বলেন, আমি তাকে পানি দেইনি’।
আরব রীতি অনুযায়ী, কাউকে পানি পান করানো মানে তাকে নিরাপত্তা দেওয়া। সালাহুদ্দিন এই নীতির প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা রেখে রাজা গাইকে নিরাপত্তা এবং পরবর্তীতে তাকে মুক্তিও দেন।
এ ঘটনা প্রমাণ করে, শত্রু হলেও মানবিকতা ও প্রতিশ্রুতির মর্যাদা রক্ষা ইসলামের অপরিহার্য শিক্ষা।
ঘটনা দুই: সাধারণ ক্রুসেডার বন্দীদের প্রতি দয়া ও চিকিৎসার ব্যবস্থা
হিত্তিনের যুদ্ধের পর হাজার হাজার ক্রুসেডার সৈন্য মুসলিম বাহিনীর হাতে বন্দী হয়। বিজয়ী সেনাপতি হয়েও সালাহুদ্দিন আইয়ুবি সাধারণ বন্দীদের ওপর প্রতিশোধমূলক আচরণ করেননি। বরং আহত বন্দীদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন, তৃষ্ণার্তদের পানি পান করান, অনেক বন্দীকে পণ ছাড়াই মুক্তি দেন, দরিদ্র বন্দীদের পরিবার-পরিজনের কথা বিবেচনায় নেন।
এই আচরণ ইউরোপীয় ইতিহাসবিদদের কাছেও বিস্ময়ের কারণ হয়ে ওঠে। তারা স্বীকার করতে বাধ্য হন, ক্রুসেডাররা জেরুজালেম দখলের সময় যে নির্মম হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিল, তার তুলনায় সালাহুদ্দিনের আচরণ ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত ও অতুলনীয় মানবিক।
বায়তুল মুকাদ্দাস মুক্তি
হিত্তিনের ঐতিহাসিক বিজয়ের পর মুসলিম বাহিনীর জন্য বায়তুল মুকাদ্দাস পুনরুদ্ধারের পথ সুগম হয়। দীর্ঘ অবরোধের পর ১১৮৭ খ্রিস্টাব্দের অক্টোবর মাসে পবিত্র নগরী মুসলমানদের হাতে ফিরে আসে।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, বায়তুল মুকাদ্দাসে প্রবেশের সময় সালাহুদ্দিন আইয়ুবি প্রতিশোধ নয়, বরং ক্ষমা ও মানবিকতার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। ১০৯৯ সালে ক্রুসেডাররা যে নির্মম হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিল, তার বিপরীতে তিনি সাধারণ খ্রিস্টানদের নিরাপত্তা দেন, বন্দীদের মুক্তিপণ দিয়ে যাওয়ার সুযোগ দেন এবং পবিত্র স্থানগুলোকে সম্মান প্রদর্শন করেন। এভাবেই তিনি প্রমাণ করেন, ইসলাম বিজয়ের সঙ্গে ন্যায় ও মানবতার শিক্ষা বহন করে।
আমাদের জন্য শিক্ষণীয় দিক
১. ঐক্যের শক্তি: মুসলিম উম্মাহর বিভক্তিই ছিল পরাজয়ের মূল কারণ, আর ঐক্যই বিজয়ের চাবিকাঠি। সালাহুদ্দিন আইয়ুবি প্রথমে ঐক্য গড়েছেন, তারপর যুদ্ধ করেছেন।
২. ইমান ও নৈতিকতা: হিত্তিনের বিজয় কেবল অস্ত্রের জোরে নয়; বরং ইমান, তাকওয়া ও আত্মশুদ্ধির ফল। নৈতিকভাবে শক্ত জাতিই টেকসই বিজয় অর্জন করতে পারে।
৩. আদর্শ নেতৃত্ব: একজন ন্যায়পরায়ণ, আল্লাহভীরু ও দূরদর্শী নেতা পুরো জাতির ভাগ্য পরিবর্তন করতে পারেন, সালাহুদ্দিন তার জীবন্ত প্রমাণ।
৪. বিজয়ের পরও মানবিকতা: ক্ষমতার শীর্ষেও ইনসাফ ও ক্ষমাশীলতা বজায় রাখা ইসলামের মৌলিক শিক্ষা। শত্রুর প্রতিও ন্যায়বিচার ইসলামের সৌন্দর্য।
হিত্তিনের যুদ্ধ আরও শেখায়, ইসলাম বিজয়ের ধর্ম হলেও প্রতিশোধের ধর্ম নয়। শক্তির সঙ্গে নৈতিকতার সমন্বয়ই প্রকৃত নেতৃত্ব।
শত্রুর প্রতিও ন্যায় ও মানবিকতা ইসলামের সৌন্দর্য। সালাহুদ্দিন আইয়ুবির এই মহানুভবতা ইতিহাসে তাকে শুধু একজন বিজয়ী সেনাপতি নয়, বরং একজন আদর্শ মুসলিম শাসক হিসেবে অমর করে রেখেছে।
হিত্তিনের যুদ্ধ ও বায়তুল মুকাদ্দাসের মুক্তি ইতিহাসের পাতায় শুধু অতীতের গল্প নয়, বরং বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্য এক জীবন্ত পাঠ। আজকের মুসলিম সমাজ যদি ঐক্য, ইমান, ন্যায় ও আদর্শ নেতৃত্বকে ধারণ করতে পারে, তবে ইতিহাস আবারও নতুনভাবে লেখা সম্ভব।
লেখক: সিনিয়র মুহাদ্দিস, আল জামিয়াতুল ইসলামিয়া দড়াটানা মাদরাসা, যশোর