তারিক মোহাম্মদ
, ঝিকরগাছা (যশোর)
অদম্য ইচ্ছাশক্তি, কঠোর পরিশ্রম আর আত্মবিশ্বাস থাকলে একজন অতি সাধারণও হয়ে উঠতে পারে অসাধারণ। যশোরের ঝিকরগাছা পৌরসভার মোবারকপুর এলাকার সুমাইয়া ইয়াসমিন বিন্তু তেমনই একজন।
জুডো খেলায় একের পর এক সাফল্য অর্জন করে ইতিমধ্যে তিনি দেশের ক্রীড়াঙ্গনে নিজের অবস্থানটি শক্তপোক্ত করে তুলেছেন।
বিন্তুর বাবার নাম মুজিবুল এলাহী মিঠু এবং মা নুরুন্নাহার রুবী। ২০০৭ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি তিনি জন্মগ্রহণ করেন।
ছোটবেলা থেকেই খেলাধুলার প্রতি ছিল তার প্রবল আগ্রহ। ঝিকরগাছা সরকারি পাইলট বালিকা বিদ্যালয়ে ষষ্ঠ শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন। স্কুলজীবনে ফুটবল খেলায়ও ছিলেন অত্যন্ত দক্ষ ও পারদর্শী।
২০১৯ সালে বিন্তু ফুটবল খেলোয়াড় হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে বিকেএসপিতে ট্রায়াল দিতে যান। সেখানে তার শারীরিক গঠন, আত্মবিশ্বাস এবং উদ্যমী মানসিকতা দেখে বিকেএসপি কর্তৃপক্ষ তাকে জুডো খেলায় সুযোগ করে দেন। এরপর থেকেই শুরু হয় তার নতুন পথচলা।
শুরুটা কিন্তু এতো সহজ ছিল না। প্রথম দিকে তার বাবা-মা এই খেলাকে ভালো চোখে দেখতেন না। মেয়েদের জন্য এই খেলা অনেকটা কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ মনে করতেন তারা। কিন্তু অদম্য ইচ্ছাশক্তি এবং স্বপ্নপূরণের আকাঙ্ক্ষা তাকে থামিয়ে রাখতে পারেনি। এ সময় সবচেয়ে বেশি উৎসাহ ও সাহস জুগিয়েছেন তার বড় বোন মারুফা ইয়াছমিন অন্তু। বোনের অনুপ্রেরণায় তাকে সামনে এগিয়ে যেতে শক্তি-সাহস জুগিয়েছে। বর্তমানে বিন্তুর ধারাবাহিক সাফল্যে তার বাবা-মাও গর্ববোধ করেন এবং সবসময় তাকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছেন।
করোনা মহামারির কারণে প্রায় দুই বছর তার অনুশীলন ও প্রতিযোগিতামূলক যাত্রায় কিছুটা বিরতি পড়ে। কিন্তু দমে যাননি। ২০২১ সাল থেকে নতুন উদ্যমে আবারও শুরু করেন স্বপ্নপূরণের সেই লড়াই। আর খুব অল্প সময়েই তিনি কামিয়াব হন। একে একে সাফল্য ধরা দেয় তার ঝুলিতে।
মাত্র দুই বছরের মধ্যেই ২০২৩ সালে তিনি শেখ কামাল বাংলাদেশ ইয়ুথ গেমসে চ্যাম্পিয়ন হয়ে গোল্ড মেডেল অর্জন করেন। একই বছরে বিকেএসপি কাপ ইন্টারন্যাশনাল জুডো প্রতিযোগিতায় ব্রোঞ্জ পদক লাভ করেন। এছাড়াও ২০২৩ সালে তিনি ৩৮তম ন্যাশনাল জুডো চ্যাম্পিয়নশিপে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করেন।
এরপর ২০২৪ সালে অনুষ্ঠিত ২৯তম জাতীয় যুব জুডো প্রতিযোগিতায় আবারও চ্যাম্পিয়ন হয়ে নিজের ধারাবাহিক সাফল্যের প্রমাণ দেন। ২০২৫ সালে ফের বিকেএসপি কাপ ইন্টারন্যাশনাল প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে সিলভার পদক অর্জন করেন।
শুধু পদকই নয়, বাংলাদেশ জুডো ফেডারেশন থেকেও তিনি অর্জন করেছেন হলুদ, নীল, কমলা, বাদামি, সবুজ ও ব্ল্যাক বেল্টের সনদপত্র—যা তার দক্ষতা ও অধ্যবসায়ের স্বীকৃতি বহন করে।
বর্তমানে বাংলাদেশের জুডো অঙ্গনে প্রথম সারির খেলোয়াড়দের মধ্যে দিপু দেওয়ান অন্যতম। ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চাইলে বিন্তু বলেন,
‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে চাই। এরপর বিশ্ববিদ্যালয়ের হয়ে খেলাধুলায় অংশ নেওয়ার ইচ্ছা রয়েছে । ভবিষ্যতে সাফ গেমসেও দেশের প্রতিনিধিত্ব করার স্বপ্ন দেখি।’
জুডো খেলাকে কেন বেছে নিয়েছেন- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘জুডো একটি আত্মরক্ষামূলক খেলা। তাই এই খেলাটিকেই নিজের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত মনে করেছি।’
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে বিন্তু বলেন, ‘ঝিকরগাছায় জুডো খেলার তেমন প্রচলন নেই। তাই ভবিষ্যতে এখানে একটি জুডো ক্লাব গড়ে তুলতে চাই, যাতে নতুন প্রজন্ম এই খেলায় আগ্রহী হয়ে ওঠে।’
সুমাইয়া ইয়াসমিন বিন্তু বর্তমানে বিকেএসপিতে এইচএসসি পরীক্ষার্থী। পড়াশোনার পাশাপাশি কঠোর অনুশীলনের মাধ্যমে এগিয়ে চলেছেন নিজের স্বপ্নপূরণের পথে। দেশের ক্রীড়াঙ্গনে তিনি আরও বড় সাফল্য বয়ে আনবেন- এমন প্রত্যাশা তার পরিবার ও এলাকাবাসীর।