ফুটবল বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি হলো ১৯৬৬ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালে ইংল্যান্ডের সেই বিখ্যাত ‘ভূতের গোল’। ছয় দশকেও এই গোল নিয়ে বিতর্ক থামেনি। ইংল্যান্ডের একমাত্র বিশ্বকাপ জয়ের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এই ঘটনাকে আজও ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম বিতর্কিত মুহূর্ত হিসেবে দেখা হয়।
১৯৬৬ সালের বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হয়েছিল ইংল্যান্ডে। স্বাগতিক দলটি সেমিফাইনালে পর্তুগালকে ২-১ গোলে হারিয়ে ফাইনালে ওঠে। ববি চার্লটনের জোড়া গোলে এগিয়ে যাওয়ার পর পর্তুগাল একটি গোল শোধ করলেও ইংল্যান্ড জয় নিশ্চিত করে। অন্য সেমিফাইনালে পশ্চিম জার্মানি ২-১ গোলে হারায় তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নকে।
৩০ জুলাই লন্ডনের ওয়েম্বলি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ফাইনালে মুখোমুখি হয় ইংল্যান্ড ও পশ্চিম জার্মানি। প্রায় ৯৭ হাজার দর্শকের উপস্থিতিতে শুরু হওয়া ম্যাচে ১১ মিনিটে এগিয়ে যায় পশ্চিম জার্মানি। তবে মাত্র সাত মিনিট পর জিওফ হার্স্ট গোল করে সমতা ফেরান।
ম্যাচের ৭৮ মিনিটে মার্টিন পিটার্সের গোলে ইংল্যান্ড ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে যায়। কিন্তু ম্যাচের শেষ মুহূর্তে, ৮৯ মিনিটে উলফগ্যাং ওয়েবারের গোলে জার্মানি সমতা ফেরালে খেলা গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে।
অতিরিক্ত সময়ের ১১ অর্থাৎ খেলার ১০১ মিনিটে আসে সেই বিতর্কিত মুহূর্ত। অ্যালান বলের পাস থেকে জিওফ হার্স্ট শট নেন। বলটি ক্রসবারে লেগে নিচে পড়ে দ্রুত বাইরে চলে আসে। প্রশ্ন ওঠে, বলটি কি পুরোপুরি গোললাইন অতিক্রম করেছিল?
জার্মান খেলোয়াড়রা সঙ্গে সঙ্গে গোলের প্রতিবাদ জানান। রেফারি গটফ্রিড ডাইনেস্টও প্রথমে দ্বিধায় ছিলেন। পরে লাইন্সম্যানের সঙ্গে আলোচনা করে তিনি গোলের সিদ্ধান্ত দেন। ইংল্যান্ডের খেলোয়াড়রা উল্লাসে মেতে ওঠেন, আর জার্মানরা হতাশ হয়ে প্রতিবাদ চালিয়ে যান।
ম্যাচের শেষ মুহূর্তে হার্স্ট আরও একটি গোল করে নিজের হ্যাটট্রিক পূর্ণ করেন। ইংল্যান্ড ৪-২ ব্যবধানে জয় পেয়ে প্রথম এবং এখন পর্যন্ত একমাত্র বিশ্বকাপ শিরোপা জেতার স্বাদ পায়। বিশ্বকাপ ফাইনালে হার্স্টের সেই হ্যাটট্রিক দীর্ঘদিন ধরে নজির হয়ে ছিল।
তবে বিতর্ক থামেনি। আধুনিক প্রযুক্তি ও বিভিন্ন বিশ্লেষণেও শতভাগ নিশ্চিতভাবে বলা যায়নি বলটি পুরোপুরি গোললাইন পেরিয়েছিল কি না। অনেকের মতে, বলটি লাইনের ভেতরে না গিয়ে লাইনের ওপর বা বাইরে পড়েছিল। আবার অন্যদের মতে, সেটি বৈধ গোলই ছিল। এমনকি পরে সেই লাইন্সম্যানও বলেছিলেন, ইংল্যান্ডের খেলোয়াড়দের প্রতিক্রিয়া দেখে তার মনে হয়েছিল সেটি গোল হয়েছিল।
শুধু ফাইনালই নয়, সেই বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালেও বিতর্ক ছিল। আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ইংল্যান্ডের ১-০ গোলের জয় নিয়েও প্রশ্ন উঠেছিল। অনেকের দাবি, জিওফ হার্স্টের সেই গোলটি অফসাইড ছিল। এছাড়া আর্জেন্টিনার অধিনায়ক আন্তোনিও রাটিনকে লাল কার্ড দেখানোর সিদ্ধান্তও ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দেয়।
সেই ম্যাচের উত্তেজনা এতোটাই বেড়ে গিয়েছিল যে রাটিনকে মাঠ ছাড়াতে পুলিশ কর্মকর্তার সহায়তা নিতে হয়েছিল। পরে তিনি কর্নার ফ্ল্যাগের কাছে গিয়ে ইংল্যান্ডের পতাকা ছিড়ে ফেলেন, যা পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তোলে। ম্যাচ শেষে ইংল্যান্ড দলের ম্যানেজার স্যার আলফ রামসেও বিতর্কিত মন্তব্য করেন।
সব মিলিয়ে ১৯৬৬ সালের বিশ্বকাপ ইংল্যান্ডকে তাদের একমাত্র বিশ্বকাপ শিরোপা এনে দিলেও সেই সাফল্যের সঙ্গে বিতর্কও চিরস্থায়ী হয়ে গেছে। বিশেষ করে ফাইনালের ‘ভূতের গোল’ আজও ফুটবলপ্রেমীদের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। তাই অনেকের কাছে ইংল্যান্ডের সেই বিশ্বজয় গৌরবের পাশাপাশি বিতর্কেরও প্রতীক হয়ে রয়েছে।
লেখক: ক্রীড়ালেখক