ম্যারাডোনার অমর কীর্তি
তসলিম শিমুল
ফুটবল বিশ্বকাপের ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আছে, যা সময়ের গণ্ডি পেরিয়ে দীর্ঘকাল ধরে মানুষ মনে রাখে। ১৯৮৬ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপ তেমনই একটি আসর, যেখানে আর্জেন্টিনার অধিনায়ক দিয়েগো আরমান্দো ম্যারাডোনা একাই যেন ফুটবল ইতিহাসের নতুন অধ্যায় লিখেছিলেন। বিশেষ করে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে তার দুটি গোল- একটি বিতর্কিত ‘হ্যান্ড অব গড’ এবং অন্যটি ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’- আজও বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর মধ্যে অন্যতম।
মেক্সিকো বিশ্বকাপ ১৯৮৬: প্রেক্ষাপট
১৩তম ফিফা বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হয় ৩১ মে থেকে ২৯ জুন ১৯৮৬ পর্যন্ত। আয়োজক দেশ ছিল মেক্সিকো। মোট ২৪টি দল অংশগ্রহণ করেছিল এই আসরে। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নানা চ্যালেঞ্জের মধ্যেও বিশ্বকাপটি ছিল অত্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ।
আর্জেন্টিনা দলটির নেতৃত্বে ছিলেন ২৫ বছর বয়সী দিয়েগো ম্যারাডোনা। তার আগেই তিনি বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম সেরা তারকা হিসেবে পরিচিত ছিলেন, কিন্তু ১৯৮৬ বিশ্বকাপ তাকে কিংবদন্তির আসনে বসিয়ে দেয়।
আর্জেন্টিনা বনাম ইংল্যান্ড: ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত ম্যাচ
১৯৮৬ সালের ২২ জুন মেক্সিকো সিটির অ্যাজটেকা স্টেডিয়ামে কোয়ার্টার ফাইনালে মুখোমুখি হয় আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ড। ম্যাচটি শুধু ফুটবল লড়াই ছিল না; এর পেছনে ছিল ১৯৮২ সালের ‘ফকল্যান্ড যুদ্ধের’ তিক্ত স্মৃতি, যা দুই দেশের জনগণের আবেগকে আরও উসকে দিয়েছিল।
‘হ্যান্ড অব গড’ গোল
ম্যাচের ৫১তম মিনিটে ম্যারাডোনা ইংল্যান্ডের ডিফেন্ডারদের সঙ্গে বলের জন্য লড়াই করেন। গোলরক্ষক পিটার শিলটনের সঙ্গে বলের দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ে তিনি হাতে স্পর্শ করে বলটি জালে পাঠান। রেফারি আলী বিন নাসের এবং লাইন্সম্যান ঘটনাটি দেখতে না পাওয়ায় গোলটি বৈধ ঘোষণা করা হয়।
ম্যাচ শেষে ম্যারাডোনা বিখ্যাত সেই মন্তব্য করেন, ‘এটা ছিল কিছুটা ম্যারাডোনার মাথা এবং কিছুটা ঈশ্বরের হাত (হ্যান্ড অব গড)।’
এই মন্তব্যের পর থেকেই গোলটি ‘হ্যান্ড অব গড’ নামে পরিচিত হয়ে যায়।
‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’
বিতর্কিত গোলের মাত্র চার মিনিট পর ম্যারাডোনা এমন একটি গোল করেন, যা অনেকের মতে ফুটবল ইতিহাসের সর্বকালের সেরা গোল।
নিজেদের অর্ধ থেকে বল নিয়ে তিনি একে একে ইংল্যান্ডের পাঁচজন খেলোয়াড় এবং গোলরক্ষক শিলটনকে পেছনে ফেলে জালে বল পাঠান। মাত্র দশ সেকেন্ডের সেই দৌড়ে তিনি প্রায় ৬০ মিটার পথ অতিক্রম করেন।
২০০২ সালে ফিফা পরিচালিত এক ভোটে এই গোলকে ‘শতাব্দীর সেরা গোল’ হিসেবে নির্বাচিত করা হয়।
ম্যারাডোনার বিশ্বকাপ
১৯৮৬ বিশ্বকাপে ম্যারাডোনা ছিলেন আর্জেন্টিনার প্রাণভোমরা। পুরো টুর্নামেন্টে তিনি পাঁচটি গোল করেন এবং পাঁচটি গোলে সহায়তা দেন। তার নেতৃত্বে আর্জেন্টিনা গ্রুপ পর্ব পেরিয়ে নকআউট পর্বে দুর্দান্ত ফুটবল উপহার দেয়।
গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচসমূহ
শেষ ষোল: আর্জেন্টিনা ১-০ উরুগুয়ে
কোয়ার্টার ফাইনাল: আর্জেন্টিনা ২-১ ইংল্যান্ড (ম্যারাডোনার দুটি বিখ্যাত গোল)
সেমিফাইনাল: আর্জেন্টিনা ২-০ বেলজিয়াম (দুটি গোলই ম্যারাডোনার)
ফাইনাল: আর্জেন্টিনা ৩-২ পশ্চিম জার্মানি
ফাইনালের নাটকীয়তা
২৯ জুন ১৯৮৬, অ্যাজটেকা স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ফাইনালে আর্জেন্টিনা প্রথমে ২-০ গোলে এগিয়ে যায়। কিন্তু পশ্চিম জার্মানি দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তন করে ২-২ সমতা ফেরায়।
এরপর ৮৪তম মিনিটে ম্যারাডোনার অসাধারণ পাস থেকে জর্জে বুরুচাগা গোল করে আর্জেন্টিনাকে ৩-২ ব্যবধানে এগিয়ে দেন। শেষ পর্যন্ত সেই স্কোরই বজায় থাকে এবং আর্জেন্টিনা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ জয় করে।
গোল্ডেন বল বিজয়ী ম্যারাডোনা
পুরো টুর্নামেন্টে অসাধারণ পারফরম্যান্সের জন্য ম্যারাডোনা জেতেন গোল্ডেন বল, যা বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড়কে দেওয়া হয়। অনেক ফুটবল বিশ্লেষকের মতে, কোনো একক খেলোয়াড়ের সবচেয়ে প্রভাবশালী বিশ্বকাপ পারফরম্যান্সগুলোর একটি ছিল এটি।
১৯৮৬ বিশ্বকাপের কথা উঠলেই দুটি দৃশ্য সবার আগে চোখে ভাসে- ’হ্যান্ড অব গড’ এবং ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’। একটি বিতর্কের, অন্যটি নিখুঁত ফুটবল সৌন্দর্যের প্রতীক। আর এই দুই মুহূর্তের কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন একজনই- দিয়েগো ম্যারাডোনা।
চার দশক পরও ১৯৮৬ সালের সেই বিশ্বকাপ ফুটবলপ্রেমীদের কাছে শুধু একটি টুর্নামেন্ট নয়; এটি এক মহাকাব্য, যেখানে ম্যারাডোনা একাধারে নায়ক, শিল্পী এবং কিংবদন্তি হয়ে অমর হয়ে আছেন।
লেখক: ক্রীড়ালেখক