তসলিম শিমুল
ট্রফি নিয়ে কথা হবে। মেসির গোল নিয়ে পাতার পর পাতা লেখা হবে। কিন্তু আজ আমি কথা বলতে চাই একটা মানুষকে নিয়ে, যার নাম উচ্চারিত হয় কম। তিনি লিওনেল স্কালোনি। পুজাতোর এক ছোট্ট শহর থেকে উঠে আসা এক নীরব মানুষ।
২০১৮ সাল। আর্জেন্টিনা ফুটবল ফেডারেশন যখন অনভিজ্ঞ এই মানুষটার হাতে জাতীয় দলের চাবি তুলে দিলো, গোটা ফুটবল দুনিয়া হেসেছিল। স্বয়ং দিয়েগো ম্যারাডোনাও হেসেছিলেন। খেলোয়াড়রা নিজেরাই জানতেন না, এই লোকটা পারবেন কি না। ফেডারেশনও ভরসা পায়নি; দিলো মাত্র ছয় মাসের কন্ট্র্যাক্ট।
ছয় মাস থেকে আজ আট বছর। এই আট বছরে স্কালোনি যা করেছেন, সেটা শুধু ট্রফির হিসাব দিয়ে বোঝানো যায় না।
ট্রফির খাতা
দুটি কোপা আমেরিকা, একটি বিশ্বকাপ, একটি ফিনালিসিমা। আর্জেন্টিনাকে ফিফা র্যাংকিং-এর এক নম্বরে তোলা, ৩৬ বছরের বিশ্বকাপ খরা ঘোচানো। যে ম্যারাডোনা একদিন হেসেছিলেন, সেই ম্যারাডোনার দেশেরই সবচেয়ে সফল কোচ এখন তিনি।
নীরবতার কোচ
স্কালোনিকে আপনি কখনো টাচলাইনে চিৎকার করতে দেখবেন না। রেফারিকে গালি দিতে দেখবেন না। ক্যামেরার সামনে প্রতিপক্ষকে ছোট করতে দেখবেন না।
ডাগআউটে দাঁড়িয়ে তিনি শুধু পানি খান। চুপচাপ দেখেন। গেমপ্ল্যান মাঠে কাজ করছে কিনা দেখেন। না করলে, নীরবে সেটা পাল্টে দেন। তার ভাষা কম, কিন্তু কাজ অনেক।
তিনি আর্জেন্টিনা দলের ভেতর থেকে সব ‘নয়েজ’ সরিয়ে দিয়েছেন। একটা ভাঙা, মানসিকভাবে বিধ্বস্ত দলকে তিনি শান্ত, স্থির, আত্মবিশ্বাসী একটা পরিবার বানিয়ে দিয়েছেন।
মেসির জন্য যে সম্মান
২০২৬ বিশ্বকাপের আগে মেসি হাঁটুর চোটে ভুগছিলেন। বেশিরভাগ কোচ নিজেই সিদ্ধান্ত নিয়ে বলতেন, ‘খেলবে’ বা ‘খেলবে না’।
স্কালোনি প্রেসের সামনে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘এটা আমার সিদ্ধান্ত নয়। সে সেই অধিকার অর্জন করেছে নিজে সিদ্ধান্ত নেওয়ার।’
তারপর পুরো প্রি-টুর্নামেন্ট শিডিউল সাজালেন একজনের রিকভারি ঘিরে। কারণ তিনি জানেন, মেসি শুধু একটা নাম না, আর্জেন্টিনার হৃদস্পন্দন।
পুরস্কার আর বিনয়
কাতারে বিশ্বকাপ জেতার পর আইএফএফএইচএস তাকে ২০২২ সালের সেরা জাতীয় দলের কোচ বললো। ফিফা দিলো দ্য বেস্ট মেনস কোচ-এর পুরস্কার।
পুরস্কার হাতে নিয়েও এই মানুষটার চোখে-মুখে এক বিন্দু অহংকার নেই। যেন বলছেন, ‘আমি কিছু করিনি। ছেলেরা করেছে।’
২০২৬-এর চ্যালেঞ্জ
এখন সামনে নতুন পাহাড়। ১৯৬২ সালের পর প্রথম কোচ হিসেবে টানা দুটো বিশ্বকাপ জেতার চ্যালেঞ্জ। পারবেন কিনা জানি না। ফুটবলে নিশ্চয়তা নেই।
তবে একটা কথা নিশ্চিত: স্কালোনি যদি ব্যর্থও হন, ইতিহাস তাকে ভুলবে না। কারণ ট্রফি অনেক কোচ জেতাতে পারেন, কিন্তু একটা জাতির ভাঙা হৃদয় জোড়া লাগিয়ে দিতে পারেন খুব কম মানুষ। স্কালোনি সেই কাজটাই করেছেন।
মেসি গোল করছেন, স্পটলাইট তার ওপর। কিন্তু পর্দার আড়ালে যে মানুষটা গোটা দলটাকে গড়ে তুললেন, তার নামটা আজ আমরা কৃতজ্ঞতায় উচ্চারণ করি।
ধন্যবাদ, লিওনেল স্কালোনি।
লেখক: ক্রীড়ালেখক