তসলিম শিমুল
, যশোর
কেউ কেউ জন্মগত প্রতিভা নিয়ে আসেন। আবার কেউ নিজের প্রতিভাকে বাঁচিয়ে রাখতে প্রতিদিন যুদ্ধ করেন। উসমান দেম্বেলের গল্পটা দ্বিতীয় দলের। যে গল্পে আছে অশ্রু, হতাশা, অসংখ্য অস্ত্রোপচার, সমালোচনা আর শেষে আছে মাথা উঁচু করে ফিরে আসার এক অবিশ্বাস্য অধ্যায়।
২০২২ বিশ্বকাপের ফাইনালের সেই রাত আজও অনেক ফরাসি সমর্থকের মনে দগদগে ক্ষত। আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ম্যাচের শুরুতেই দেম্বেলের ভুলে পেনাল্টি পায় প্রতিপক্ষ। লিওনেল মেসির স্পটকিকে এগিয়ে যায় আর্জেন্টিনা। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, প্রথমার্ধ শেষ হওয়ার আগেই কোচ দিদিয়ের দেশম তাকে মাঠ থেকে তুলে নিতে বাধ্য হন।
সেদিন মনে হয়েছিল, হয়তো দেম্বেলের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সবচেয়ে অন্ধকার রাত সেটাই।
কিন্তু ফুটবল সবসময় শেষ অধ্যায়টা নিজেই লেখে।
২০২৬ বিশ্বকাপে সেই দেম্বেলেই যেন নতুন মানুষ। প্রথম দুই ম্যাচে একটি গোল করার পর নরওয়ের বিপক্ষে মাত্র ৩২ মিনিটে দুর্দান্ত হ্যাটট্রিক করে পুরো বিশ্বকে আবার মনে করিয়ে দিলেন- প্রতিভা কখনো হারিয়ে যায় না, শুধু সময়ের অপেক্ষায় থাকে।
এখন পর্যন্ত চার গোল করে তিনি যৌথভাবে বিশ্বকাপের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গোলদাতা। গত বিশ্বকাপের হতাশা মুছে এবার তিনি ফ্রান্সের সবচেয়ে বড় ভরসাগুলোর একজন।
এই উত্থান অবশ্য একদিনে আসেনি। বার্সেলোনায় যোগ দেওয়ার পর প্রায় সাত-আট বছর যেন চোটের সঙ্গেই বসবাস করেছেন দেম্বেলে। মাঠের চেয়ে হাসপাতালের বিছানাতেই কাটিয়েছেন বেশি সময়। যখনই ছন্দে ফিরেছেন, তখনই নতুন কোনো ইনজুরি তাকে আবার শুরুতে ফিরিয়ে দিয়েছে। অনেকেই তাকে ‘চিরচোটগ্রস্ত’ তকমা দিয়ে শেষ হিসাব কষে ফেলেছিলেন।
কিন্তু যারা হাল ছাড়ে না, তাদের গল্প আলাদা হয়। নিজের শরীরের সঙ্গে যুদ্ধ জিতে তিনি ফিরলেন। পিএসজির জার্সিতে ইতিহাস গড়লেন, ইউরোপের সেরা মঞ্চে দলকে সাফল্যের শিখরে পৌঁছে দিলেন। ব্যক্তিগত স্বীকৃতিও ধরা দিলো। জিতলেন ব্যালন ডি’অর। আর এখন বিশ্বকাপের মঞ্চেও নিজের শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ রেখে চলেছেন।
দেম্বেলের জীবন যেন শেখায়, ব্যর্থতা কোনো মানুষের পরিচয় নয়। পরিচয় হলো, সেই ব্যর্থতার পর সে কতবার উঠে দাঁড়াতে পারে।
যে ফুটবলার একদিন সমালোচনার কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন, আজ তিনিই কোটি মানুষের অনুপ্রেরণা। যে মানুষ একসময় হাসপাতালের বিছানায় নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত ছিলেন, আজ তিনি বিশ্বকাপের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।
উসমান দেম্বেলে শুধু একজন ফুটবলারের নাম না, তিনি বিশ্বাসের আরেক নাম। তিনি প্রমাণ করে দিয়েছেন, জীবনের সবচেয়ে অন্ধকার রাতের পরেও ভোর আসে।
আর তাই যারা স্বপ্ন দেখে, যারা বারবার হেরে গিয়েও আবার লড়াই শুরু করে, তাদের কাছে উসমান দেম্বেলে চিরকাল এক জীবন্ত অনুপ্রেরণার নাম।