তসলিম শিমুল
চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ইতালি। ১৯৩৪, ১৯৩৮, ১৯৮২ এবং ২০০৬ সালে বিশ্ব ফুটবলের মুকুট জেতা আজুরিদের নাম উচ্চারিত হলেই ভেসে ওঠে কাতেনাচ্চো, পাওলো রোসি, ফ্রান্সেসকো তোত্তি, জিয়ানলুইজি বুফনের ছবি। অথচ সেই ইতালিই টানা তিনবার বিশ্বকাপের মূলপর্বের বাইরে। ২০১৮ রাশিয়া, ২০২২ কাতার এবং ২০২৬ আসরেও তাদের দেখা যাচ্ছে না। প্রশ্ন একটাই, চার তারকা জার্সির দেশটির এমন পতন হলো কেন?
পতনের সূচনা: ২০১৮ এর লজ্জা
ইতালির এই দুঃসময়ের শুরু ২০১৭ সালে। ২০১৮ বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের প্লে-অফে সুইডেনের কাছে দুই লেগ মিলিয়ে ০-১ গোলে হেরে যায় তারা। ১৯৫৮ সালের পর এই প্রথম বিশ্বকাপ মিস করে চারবারের চ্যাম্পিয়নরা। ওই পরাজয় শুধু একটি টুর্নামেন্ট মিস নয়, ছিল ইতালিয়ান ফুটবলের আত্মবিশ্বাস ভেঙে দেওয়ার শুরু।
২০২২ এর পুনরাবৃত্তি: ইউরো জয়েও লাভ হলো না
২০২০ ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপ জিতে ইতালি ভেবেছিল ঘুরে দাঁড়িয়েছে। রবার্তো মানচিনির অধীনে দলটিকে অপরাজেয় মনে হচ্ছিল। কিন্তু বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। ২০২২ বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে সরাসরি জায়গা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয় তারা। এরপর প্লে-অফের সেমিফাইনালে ঘরের মাঠে উত্তর মেসিডোনিয়ার কাছে ০-১ গোলে হেরে বিশ্বকে হতবাক করে দেয়। টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপের বাইরে।
কেন এই অধঃপতন? পাঁচটি মূল কারণ
ইতালির এই পতন কোনো একক ঘটনার ফল নয়। কাঠামোগত, কৌশলগত ও প্রজন্মগত সংকটের সম্মিলিত ফলাফল এটি।
ঘরোয়া লিগের দুর্বলতা ও বিদেশিনির্ভরতা
সেরি আ একসময় বিশ্বের সেরা লিগ ছিল। এখন আর্থিক সংকট, স্টেডিয়াম সমস্যা এবং ধীরগতির ফুটবলের কারণে লিগের মান কমেছে। ক্লাবগুলো ইতালিয়ান তরুণের চেয়ে সহজলভ্য বিদেশি ফুটবলার কিনতে বেশি আগ্রহী। ফলে জাতীয় দলের জন্য মানসম্পন্ন ইতালিয়ান স্ট্রাইকার ও ক্রিয়েটিভ মিডফিল্ডার তৈরি হচ্ছে না। ২০০৬ এর টনি, তোত্তি, দেল পিয়েরোর মতো ফিনিশার এখন নেই।
কৌশলগত স্থবিরতা: কাতেনাচ্চোর মৃত্যু
ইতালি মানেই ছিল শক্ত রক্ষণ। কিন্তু আধুনিক ফুটবলে শুধু রক্ষণ দিয়ে জেতা যায় না। জার্মানি, স্পেন, ফ্রান্স যখন হাই-প্রেসিং ও পজিশন বেসড ফুটবলে গেছে, ইতালি তখনও পুরনো ধাঁচে আটকে ছিল। গোল করার মতো পরিকল্পনা ও খেলোয়াড়ের অভাব প্রকট। প্লে-অফে উত্তর মেসিডোনিয়ার বিপক্ষে ৩২টি শট নিয়েও গোল না পাওয়া এর বড় প্রমাণ।
প্রজন্মের শূন্যতা
২০০৬ বিশ্বকাপ জয়ী দলের পর বুফন, পিরলো, কানাভারো, তোত্তিদের বিদায়ে যে শূন্যতা তৈরি হয়, তা পূরণ করতে পারেনি নতুনরা। বর্তমান দলে ফেদেরিকো কিয়েজা, নিকোলো বারেল্লার মতো ভালো ফুটবলার আছেন, কিন্তু বিশ্বকাপ জেতানোর মতো সুপারস্টার নেই। নেতৃত্বের অভাব দলকে ভুগিয়েছে সবচেয়ে বেশি।
বাছাইপর্বের চাপ নিতে না পারা
বড় দল হয়েও ইতালি বাছাইপর্বকে হালকাভাবে নিয়েছে। সুইজারল্যান্ডের সাথে গ্রুপে পয়েন্ট হারানো, নর্থ মেসিডোনিয়ার মতো আন্ডারডগের কাছে হার, এগুলো মানসিক দুর্বলতারই বহিঃপ্রকাশ। নকআউট ম্যাচের চাপ সামলানোর অভিজ্ঞতা দলে নেই।
ফুটবল অবকাঠামোর সংকট
ইতালির বেশিরভাগ স্টেডিয়াম পুরনো ও সরকারি মালিকানাধীন। আধুনিক ট্রেনিং সেন্টার, অ্যাকাডেমি ও যুব উন্নয়নে বিনিয়োগ ইংল্যান্ড, জার্মানি বা ফ্রান্সের তুলনায় অনেক কম। ফলে তৃণমূল থেকে প্রতিভা উঠে আসছে না।
এরপর কী? পুনরুত্থানের পথ
২০২৬ বিশ্বকাপেও ইতালি নেই, কারণ ইউরোপ থেকে ১৬টি দল সরাসরি খেলবে এবং ইতালি বাছাইপর্বে প্রত্যাশিত ফল করতে পারেনি। তবে আশার আলো আছে। লুসিয়ানো স্পালেত্তির অধীনে দল নতুন করে সাজছে। যুব পর্যায়ে বিনিয়োগ বাড়ছে। সেরি আ ক্লাবগুলোও স্টেডিয়াম সংস্কারে মনোযোগী হচ্ছে।
ইতালির টানা তিনবারের বিশ্বকাপবিহীন সময়কাল তাদের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সংকট। এটি প্রমাণ করে, ঐতিহ্য দিয়ে ম্যাচ জেতা যায় না। আধুনিক ফুটবলের সাথে তাল মিলিয়ে নিজেদের বদলাতে না পারলে চার তারকাও মাঠে কোনো কাজে আসে না। আজুরিদের সামনে চ্যালেঞ্জ একটাই, পুরনো গৌরবের ছায়া থেকে বেরিয়ে এসে নতুন করে শুরু করা। নাহলে ২০৩০ বিশ্বকাপও স্বপ্নই থেকে যাবে।