যশোর, বাংলাদেশ || বুধবার, ১ জুলাই ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

রাজমিস্ত্রির ছেলের দিকে তাকিয়ে গোটা জাতি

তসলিম শিমুল

প্রকাশ : মঙ্গলবার, ৩০ জুন,২০২৬, ০৪:০৬ পিএম
আপডেট : মঙ্গলবার, ৩০ জুন,২০২৬, ০৫:০১ পিএম
রাজমিস্ত্রির ছেলের দিকে তাকিয়ে গোটা জাতি

কখনও কখনও ফুটবল শুধু একটি খেলা নয়। এটি মানুষের ভাঙা স্বপ্ন জোড়া লাগানো, অপমানের জবাব দেওয়া কিংবা চোখের জলকে হাসিতে বদলে দেওয়ার গল্প। মরক্কোর ইসমায়েল সাইবারির জীবন ঠিক তেমনই অবিশ্বাস্য, নাটকীয়।

বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে টাইব্রেকারের শেষ শট নিতে যখন তিনি এগিয়ে এলেন, তখন যেন পুরো মরক্কোর নিঃশ্বাস আটকে গিয়েছিল। কোটি কোটি মানুষের স্বপ্ন তখন তার এক পায়ের ওপর দাঁড়িয়ে।

সাইবারি শান্ত। ঠোঁট নড়ছে। হয়তো প্রার্থনা করছেন। তারপর একটি নিখুঁত শট...

বল জড়িয়ে গেল জালে।

মুহূর্তেই উল্লাসে ফেটে পড়লো পুরো মরক্কো। টাইব্রেকারে জয় নিশ্চিত করে শেষ ষোলোর টিকিট এনে দিলেন তিনিই, যিনি ইসমাইল সাইবারি, এই বিশ্বকাপে দেশের নতুন নায়ক।

কিন্তু এই হাসির পেছনে লুকিয়ে আছে এক দীর্ঘ সংগ্রামের গল্প।

যে কথায় ভেঙে গিয়েছিল হৃদয়

এক সময় সপ্তাহে মাত্র ১৯ হাজার ২০০ ইউরো আয় করতেন সাইবারি। তখন তার প্রেমিকা নাকি সরাসরি বলেছিলেন, ‘আমার খরচ চালানোর সামর্থ্য তোমার নেই।’
কথাটি ছিল শুধু প্রত্যাখ্যান নয়, ছিল আত্মসম্মানে গভীর আঘাত।

অনেকেই হয়তো সেই অপমানের পর ভেঙে পড়তেন। কিন্তু সাইবারি ভাঙেননি। বরং সেই কষ্টকেই শক্তিতে রূপ দিয়েছিলেন। দিনের পর দিন কঠোর পরিশ্রম করেছেন। নিজের খেলাকে আরও ধারালো করেছেন। অবশেষে ইউরোপের অন্যতম সেরা ক্লাব বায়ার্ন মিউনিখে বড় অঙ্কের চুক্তিতে যোগ দেন।

শোনা যায়, সাফল্যের পর সেই পুরনো প্রেমিকা আবার তার জীবনে ফিরতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সাইবারি আর পেছনে তাকাননি।

রাজমিস্ত্রির ছেলের বিশ্বজয়ের স্বপ্ন

স্পেনের তেরাসায় এক সাধারণ শ্রমজীবী পরিবারে জন্ম তার। বাবা হাসান ছিলেন একজন রাজমিস্ত্রি। মা ফাতিমা সামলাতেন সংসার। অভাব ছিল নিত্যসঙ্গী। কিন্তু সেই অভাব কখনো ছেলের স্বপ্ন কেড়ে নিতে পারেনি। রাস্তায়, পার্কে, খোলা মাঠে- যেখানেই সুযোগ পেয়েছেন, সেখানেই ফুটবল নিয়ে ছুটেছেন সাইবারি।

২০০৭ সালে অর্থনৈতিক সংকটে পরিবারটি আরও বিপদে পড়ে। বাবার কাজ চলে যায়। জীবিকার সন্ধানে পরিবার পাড়ি জমায় বেলজিয়ামে। সেখানেই শুরু হয় নতুন লড়াই। আন্ডারলেখট ও জেঙ্কের যুব অ্যাকাডেমিতে নিজেকে গড়ে তোলেন। এরপর ২০২০ সালে যোগ দেন পিএসভি আইন্দহোভেনে। সেখান থেকেই ইউরোপীয় ফুটবলে শুরু হয় তার উত্থান।

হৃদয় ছিল শুধু মরক্কোর জন্য

যোগ্যতা থাকায় বেলজিয়ামের হয়েও আন্তর্জাতিক ফুটবল খেলার সুযোগ ছিল তার সামনে। কিন্তু সাইবারির হৃদয় বলেছিল অন্য কথা। তিনি বেছে নেন নিজের শেকড়, নিজের দেশ মরক্কোকে। আজ সেই দূরদর্শী সিদ্ধান্তই তাকে মরক্কোর লাখো মানুষের হৃদয়ের সবচেয়ে উজ্জ্বল নাম বানিয়েছে।

বিশ্বকাপে নতুন নক্ষত্রের জন্ম

চলতি বিশ্বকাপে দুর্দান্ত ছন্দে রয়েছেন সাইবারি। গ্রুপ পর্বেই করেছেন তিনটি গোল। নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে যখন সবচেয়ে বড় চাপের মুহূর্তটি এলো, তখনও তিনি বিচলিত হননি। কিন্তু সাইবারির বীরত্বের গল্প শুধু টাইব্রেকারের সেই শেষ শটেই শেষ হয় না।

ম্যাচের এক পর্যায়ে ভয়াবহ সংঘর্ষে মাথায় আঘাত পান তিনি। কপাল ফেটে রক্ত ঝরতে থাকে। চিকিৎসকরা ছুটে আসেন, মাথায় ব্যান্ডেজ করে দেন। তবু মাঠ ছাড়তে রাজি হননি সাইবারি। রক্তাক্ত অবস্থায় লড়াই চালিয়ে গেছেন পুরো ১২০ মিনিট, যেন নিজের শরীরের ব্যথার চেয়েও দেশের স্বপ্নটাই ছিল তার কাছে বড়।

অবশেষে এলো টাইব্রেকারের সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। পাহাড়সম চাপ, কোটি সমর্থকের থমকে থাকা নিঃশ্বাস-সবকিছুকে পেছনে ফেলে শেষ শটটি জালে জড়িয়ে মরক্কোকে পৌঁছে দিলেন শেষ ষোলোয়।

তবে ম্যাচের সবচেয়ে আবেগঘন দৃশ্যটি দেখা গেল শেষ বাঁশির পর। গ্যালারি থেকে ছুটে এলেন তার মা। ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরতেই আর নিজেদের ধরে রাখতে পারেননি কেউ। একে অপরকে শক্ত করে আঁকড়ে ধরে অঝোরে কেঁদে ফেললেন মা আর ছেলে।

সেই কান্না ছিল না শুধু জয়ের আনন্দে। সেটি ছিল বছরের পর বছর অভাব, সংগ্রাম, অপমান, ত্যাগ আর অদম্য লড়াইয়ের পর স্বপ্নপূরণের কান্না।

রক্ত ঝরেছিল মাঠে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত জয় লিখেছিল সাইবারির পায়ের জাদু। আর ইতিহাসের পাতায় আরও একবার সোনালি অক্ষরে লেখা হয়ে গেল ইসমায়েল সাইবারির নাম। শেষ পেনাল্টিটি জালে পাঠিয়ে শুধু একটি ম্যাচই জেতাননি তিনি, নতুন করে স্বপ্ন দেখিয়েছেন পুরো মরক্কোকে।

আজ ইসমায়েল সাইবারি শুধু একজন ফুটবলারের নাম নয়। তিনি প্রমাণ করে দিয়েছেন, অভাব মানুষকে থামাতে পারে না, অপমান কোনো মানুষের শেষ পরিচয় নয়, আর স্বপ্ন যদি সত্যিকারের হয়, তবে একদিন না একদিন তা বাস্তবের আলোয় ফুটবেই।

রাজমিস্ত্রির সেই ছেলেটিই আজ মরক্কোর গর্ব, আফ্রিকার অহংকার এবং বিশ্বফুটবলের আকাশে উদীয়মান এক উজ্জ্বল নক্ষত্র।

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)