তসলিম শিমুল
‘৭-১’। একটি স্কোরলাইন যা ফুটবল ইতিহাসে চিরকাল লেখা থাকবে। ২০১৪ সালের মিনেইরাজোতে ব্রাজিলকে বিধ্বস্ত করে সেমিফাইনালে ওঠা জার্মানি সেবারই চতুর্থবারের মতো বিশ্বকাপ জিতেছিল। জোয়াকিম লোর সেই ‘মেশিন’ দল ছিল অপ্রতিরোধ্য। অথচ সেই ঐতিহাসিক জয়ের পর থেকে কেটে গেছে এক দশক। আর এই এক দশকেই চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা হারিয়েছে তাদের ঐতিহ্য, ধারাবাহিকতা, আর নকআউট ফুটবলের আত্মবিশ্বাস।
২০১৪-র পর জার্মানি আর কোনো বিশ্বকাপেই সেমিফাইনালের দরজা ছুঁতে পারেনি। বরং নকআউট পর্বের শুরু থেকেই তাদের বিদায়ের ঘটনা বারবার ফিরে এসেছে। ২০১৮, ২০২২, প্যারাগুয়ে এর কাছে হারের মাধ্যমে ২০২৬ বিশ্বকাপেও একই চিত্র।
২০১৮ রাশিয়া: চ্যাম্পিয়ন থেকে বিদায়ী নায়ক
২০১৪-র গৌরব নিয়ে রাশিয়ায় গিয়েছিল ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন জার্মানি। কিন্তু গ্রুপ পর্বেই ঘটলো বিপর্যয়।
মেক্সিকোর কাছে ০-১ গোলে হার দিয়ে শুরু। এরপর সুইডেনকে শেষ মুহূর্তের গোলে হারালেও, গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে দক্ষিণ কোরিয়ার কাছে ০-২ গোলে বিধ্বস্ত হয়ে বিদায়।
ব্যর্থতার কারণ: অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস, ধীরগতির মিডফিল্ড, আর টনি ক্রুস-মেসুত ওজিল বিতর্ক দলের ভেতরের পরিবেশ নষ্ট করে দেয়। ১৯৩৮ সালের পর প্রথমবার গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায় নেয় জার্মানি। ‘মিনেইরাজোর পর পতনের’ শুরুটা এখান থেকেই।
২০২২ কাতার: টানা দ্বিতীয় লজ্জা
রাশিয়ার ক্ষত ভোলাতে কাতারে এসেছিল নতুন প্রজন্ম। হান্সি ফ্লিকের অধীনে আশা ছিল পুনরুত্থানের। কিন্তু ফিরে এলো ব্যর্থতা।
গ্রুপ পর্বে জাপানের কাছে ১-২ গোলে হারের পর স্পেনের সাথে ড্র। কোস্টারিকাকে ৪-২ গোলে হারিয়েও গোল ব্যবধানে ছিটকে যায় তারা।
ব্যর্থতার কারণ: ফিনিশিংয়ের চরম অভাব। জাপানের বিপক্ষে ২৬টি শট নিয়েও মাত্র ১ গোল। দলে ছিল না কোনো ক্লিনিক্যাল স্ট্রাইকার। লেরয় সানে, কাই হাভার্টজরা সুযোগ মিসের মহড়া দিয়েছেন। মানসিকভাবেও দল ভেঙে পড়েছিল ‘ওয়ান লাভ’ বিতর্কের চাপে। টানা দ্বিতীয়বার গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায় মানে জার্মান ফুটবলে কাঠামোগত সংকটের প্রমাণ।
২০২৬: নকআউটের শুরু থেকেই শেষ
২০২৬ বিশ্বকাপেও চিত্র বদলায়নি। এবার গ্রুপ পর্বের গণ্ডি পেরোলেও, নকআউট পর্বের শুরুতেই, অর্থাৎ রাউন্ড অফ ৩২-তেই থেমে যেতে হয়েছে চার তারকা জার্সিধারীদের।
ব্যর্থতার কারণ: ২০১৪-র পর জার্মানি যে সমস্যাগুলো সমাধান করতে পারেনি, ২০২৬-এ সেগুলো আরও প্রকট।
প্রজন্মের শূন্যতা: মুলার, ক্রুস, ন্যুয়ার-পরবর্তী নেতৃত্ব তৈরি হয়নি।
ট্যাকটিক্যাল জড়তা: আধুনিক হাই-প্রেসিং ও ট্রানজিশন ফুটবলের সাথে তাল মেলাতে পারেনি জার্মানি। মানসিক দুর্বলতা: নকআউট ম্যাচের চাপ নিতে না পারা। ২০১৪-র সেই নির্মম, নিষ্ঠুর, জেতার মানসিকতা উধাও।
কোথায় হারালো ‘ডাই ম্যানশাফট’?
২০১৪-র ৭-১ জয়টি ছিল জার্মান ফুটবলের চূড়া। এরপরই শুরু পতন। কারণ তিনটি:
কৌশলগত স্থবিরতা: ২০১৪-র ‘ফলস নাইন’ ও কাউন্টার-প্রেসিং মডেলকে সবাই কপি করে ফেলে। জার্মানি নিজেদের আপগ্রেড করতে পারেনি। স্পেন, ফ্রান্স যখন পজিশনাল ফুটবলে গেছে, জার্মানি আটকে ছিল পুরনো ফর্মুলায়।
তরুণ প্রতিভা তৈরির সংকট:২০১৪ দলে ক্রুস, মুলার, ন্যুয়াররা ছিলেন ২৫-৩০ এর পিক বয়সে। এরপর জামাল মুসিয়ালা ছাড়া বিশ্বমানের কোনো সুপারস্টার তৈরি হয়নি। সেরি আ-এর মতো বুন্দেসলিগাও তরুণদের সুযোগ দিতে ব্যর্থ হয়েছে।
চার তারার চাপ: চারটি তারকা জার্সিতে বয়ে আনা চাপ নতুন প্রজন্ম নিতে পারেনি। ২০১৪-র দল ছিল ক্ষুধার্ত। ২০১৮-র পর থেকে দল হয়ে গেছে ‘ঐতিহ্য রক্ষা’র। তারা যেন জেতার জন্য খেলে না, হার এড়াতে খেলে।
মিনেইরাজোর সেই রাতে জার্মানি ব্রাজিলকে শুধু হারায়নি, নিজেদেরও একটা স্ট্যান্ডার্ড সেট করে ফেলেছিল। কিন্তু সেই স্ট্যান্ডার্ড ধরে রাখতে পারেনি তারা। ২০১৮, ২০২২, ২০২৬- টানা তিনটি বিশ্বকাপে নকআউট পর্বের শুরুতেই বিদায় চারবারের চ্যাম্পিয়নদের জন্য শুধু পরিসংখ্যান নয়, এটি একটি সতর্কবার্তা।
ঐতিহ্য দিয়ে ম্যাচ জেতা যায় না। আধুনিক ফুটবলে টিকে থাকতে হলে প্রতি চার বছর পরপর নিজেদের ভাঙতে হয়, গড়তে হয়। জার্মানি সেই কাজটা করতে পারেনি বলেই ২০১৪-র পর থেকে সেমিফাইনাল তাদের কাছে অধরা স্বপ্ন।
২০৩০ বিশ্বকাপ কি এই অভিশাপ কাটাতে পারবে? নাকি মিনেইরাজোই হবে জার্মানির শেষ হাসি? উত্তর সময়ের হাতে।