যশোর, বাংলাদেশ || শুক্রবার, ৩ জুলাই ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

বিশ্বকাপের আগে চুরির অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন ইংল্যান্ড অধিনায়ক

তসলিম শিমুল

প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই,২০২৬, ০৫:৩৪ পিএম
বিশ্বকাপের আগে চুরির অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন ইংল্যান্ড অধিনায়ক

ফিফা বিশ্বকাপ শুরুর মাত্র কয়েক দিন আগে ব্রেসলেট চুরির অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন ইংল্যান্ডের অধিনায়ক ও কিংবদন্তি ডিফেন্ডার ববি মুর। ঘটনাটি এতটাই আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল যে, ইংল্যান্ড দলের বিশ্বকাপ প্রস্তুতিতে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটে। পরিস্থিতি সামাল দিতে ব্রিটিশ সরকারকেও কূটনৈতিকভাবে হস্তক্ষেপ করতে হয়।

১৯৬৬ সালের বিশ্বকাপজয়ী ইংল্যান্ড ১৯৭০ সালের বিশ্বকাপেও অন্যতম শিরোপাপ্রত্যাশী দল ছিল। রক্ষণভাগে টেরি কুপার এবং মাঝমাঠে অ্যালান মুলারি ও কলিন বেলের অন্তর্ভুক্তিতে দলটি আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। মেক্সিকোর আবহাওয়া ও উচ্চতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে বিশ্বকাপের আগে কলম্বিয়া ও ইকুয়েডরে দুটি প্রীতি ম্যাচ খেলার পরিকল্পনা করে ইংল্যান্ড। সেই উদ্দেশে দলটি পৌঁছায় কলম্বিয়ার রাজধানী বোগোতায়। সেখানেই ঘটে আলোচিত এই ঘটনা।

১৮ মে সতীর্থ ববি চার্লটনকে সঙ্গে নিয়ে বোগোতার ‘ফুয়েগো ভের্দে’ নামে একটি গয়নার দোকানে যান ববি মুর। দোকানের কর্মী ক্লারা পাদিয়া অভিযোগ করেন, তার চোখের সামনেই ৬০০ পাউন্ড মূল্যের একটি হীরার ব্রেসলেট চুরি করেন ইংল্যান্ড অধিনায়ক। দোকানমালিক দানিলো রোহাস অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশের ওপর চাপ সৃষ্টি করলে মুরকে একাধিকবার জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। পরে ২৫ মে নতুন এক সাক্ষ্যের ভিত্তিতে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।

তবে মুরের দেহ ও মালপত্র তল্লাশি করেও কোনো ব্রেসলেট উদ্ধার করতে পারেনি পুলিশ। তার পক্ষে অবস্থান নেন ইংল্যান্ডের কোচ স্যার আলফ র‌্যামসি।

তিনি বলেন, ‘ববি মুরের সততা নিয়ে আমার মনে কোনো সন্দেহ নেই। তার মতো একজন মানুষের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং অত্যন্ত হাস্যকর।’

মুরকে কলম্বিয়ার একটি কুখ্যাত কারাগারে পাঠানোর পরিকল্পনাও করা হয়েছিল। তবে কলম্বিয়ান ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি আলফোনসো সিনিয়রের হস্তক্ষেপে তাকে কারাগারে না পাঠিয়ে গৃহবন্দী রাখা হয়।

এ সময় কলম্বিয়ার প্রভাবশালী দৈনিক এল তিয়েম্পোও মুরের পক্ষে অবস্থান নেয়। পত্রিকাটি লিখেছিল, যেসব সাক্ষীর বক্তব্য একে অপরের সঙ্গে মেলে না, তাদের চেয়ে ববি মুরের বক্তব্যই বেশি বিশ্বাসযোগ্য।

তদন্ত যত এগোতে থাকে, অভিযোগও তত দুর্বল হয়ে পড়ে। অভিযোগকারী ক্লারা পাদিয়া দাবি করেছিলেন, মুর নিজের ট্র্যাকস্যুটের পকেটে ব্রেসলেটটি লুকিয়েছিলেন। পরে তদন্তে দেখা যায়, ওই ট্র্যাকস্যুটে কোনো পকেটই ছিল না। অন্যদিকে প্রত্যক্ষদর্শী আলভারো সুয়ারেজ স্বীকার করেন, দোকানমালিকের কাছ থেকে অর্থ নিয়ে তিনি মিথ্যা সাক্ষ্য দিয়েছিলেন।

প্রমাণের অভাবে ২৮ মে ববি মুরকে মুক্তি দেওয়া হয়। এরপর ৩০ মে তিনি মেক্সিকোতে গিয়ে ইংল্যান্ড দলের সঙ্গে যোগ দেন তিনি।

মুক্তি পাওয়ার পর বন্ধু মরিস কেস্টন ও তার স্ত্রীকে একটি টেলিগ্রাম পাঠিয়ে কৃতজ্ঞতা জানান মুর। গ্রেপ্তারের সময় তার স্ত্রী টিনা ডিন চরম উদ্বেগে ছিলেন। সেই কঠিন সময়ে কেস্টন দম্পতি তার পাশে দাঁড়িয়েছিলেন।

উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, কেস্টন দম্পতি ছিলেন টটেনহ্যাম হটস্পারের সমর্থক, আর ববি মুর ছিলেন ওয়েস্ট হ্যাম ইউনাইটেডের কিংবদন্তি ফুটবলার। ক্লাবভিত্তিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা তাদের বন্ধুত্বে কোনো প্রভাব ফেলেনি।

ঘটনার পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পর, মৃত্যুর অল্প আগে অভিযোগকারী ক্লারা পাদিয়া মুখ খোলেন। তিনি বলেন, ‘আমি কখনো মিথ্যা বলিনি। নিজের চোখে যা দেখেছি, সেটাই বলেছি।’

এদিকে ‘এল ক্যাপিতান ই এল ব্রাসালেতে দে এসমেরালদাস’ নামে একটি পডকাস্টে প্রকাশিত কূটনৈতিক নথিতে জানা যায়, ববি মুরকে মুক্ত করতে ব্রিটিশ দূতাবাস ও ব্রিটিশ ফরেন অফিস কলম্বিয়া সরকারের ওপর ব্যাপক কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগ করেছিল।

তৎকালীন ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত রিচার্ড রজার্স লন্ডনে পাঠানো এক বার্তায় লিখেছিলেন, দূতাবাসের সঙ্গে আলোচনা ছাড়া যেন মুরের বিরুদ্ধে কোনো আইনি পদক্ষেপ নেওয়া না হয়। পাশাপাশি বিচারককে বোঝানো হয়েছিল, এ মামলার কারণে কলম্বিয়ার আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

নথিতে আরও উল্লেখ করা হয়, ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপ আয়োজনের দৌড়ে থাকা কলম্বিয়ার আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি যাতে ক্ষুণ্ন না হয়, সে বিষয়টিও সরকারকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এমনকি দেশটির গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান জেনারেল লুইস এতিলিও লেইভাও বিচারকের সঙ্গে দেখা করে ববি মুরকে কারাগারে পাঠানোর রাজনৈতিক প্রভাব সম্পর্কে সতর্ক করেছিলেন।

পডকাস্টটির প্রযোজক কামিলো মাসিয়াসের ভাষ্য, ‘খুব দ্রুত সবাই ধরে নিয়েছিল ক্লারা পাদিয়া মিথ্যা বলছেন। কারণ ববি মুরের পাশে ছিল ব্রিটিশ ও কলম্বিয়ার সরকার, পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থা এবং দুই দেশের সংবাদমাধ্যম। সেই প্রবল চাপের মধ্যে ক্লারার বক্তব্য গুরুত্ব পায়নি।’

বিশ্বকাপ শুরুর মাত্র তিন দিন আগে মুক্তি পান ইংল্যান্ড অধিনায়ক।

এ ঘটনা নিয়ে ববি মুর খুব কমই কথা বলতেন। গ্রেপ্তারের সময় তিনি বলেছিলেন, ‘আমি বুঝতেই পারছি না বিষয়টি কী। অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই। এ ব্যাপারে আমি সম্পূর্ণ নির্দোষ।’

পরে তার স্ত্রী টিনা মেক্সিকোতে এসে তাকে একটি ব্রেসলেট উপহার দেন। অনেকে এটিকে পুরো ঘটনার প্রতীকী জবাব হিসেবে দেখেছিলেন।

বহু বছর পরে হোটেলের জুতা পালিশকর্মী ও প্রত্যক্ষদর্শী হার্নান্দো রোহাস স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘তিনি ছিলেন একজন মহীরুহ। আমার দেখা সবচেয়ে ভদ্র ও মার্জিত বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ছিলেন ববি মুর।’

অন্যদিকে মুরের জীবনীকার জেফ পাওয়েলের ধারণা, ‘সম্ভবত দলের কোনো তরুণ খেলোয়াড় মজা করতে গিয়ে এমন কিছু করেছিল, যা পরে বড় বিতর্কে রূপ নেয়।’
বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে ববি মুরকে ঘিরে এই ঘটনাটি আজও সবচেয়ে বিতর্কিত ও রহস্যময় অধ্যায়গুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হয়।

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)