অবসান হলো একটি যুগের- ‘লুকা মদ্রিচ যুগ’। রাউন্ড অফ ৩২-এ পর্তুগালের কাছে ২-১ গোলের হৃদয়ভাঙা হারে বিশ্বকাপ মঞ্চ থেকেই বিদায় নিল ক্রোয়েশিয়া। আর এর সঙ্গে শেষ হলো লুকা মদ্রিচের ২০ বছরের অবিশ্বাস্য বিশ্বকাপ ক্যারিয়ার।
৩৯ বছর বয়সী এই মিডফিল্ড জাদুকর টরন্টোর বিএমও ফিল্ডে নিজের শেষ বিশ্বকাপ ম্যাচ খেলে ফেললেন। ম্যাচ শেষে কান্নায় ভেঙে পড়া মদ্রিচকে জড়িয়ে ধরলেন গোটা দল। ক্রোয়েশিয়ার চেকার্ড জার্সিতে আর দেখা যাবে না তাকে।
ম্যাচ: শেষ মিনিটের নাটকীয়তা
প্রথমার্ধে কোনো গোল হয়নি। গোলশূন্য অবস্থায় বিরতিতে যায় দুই দল।
দ্বিতীয়ার্ধে ম্যাচের রং বদলায়। আক্রমণের ধারাবাহিকতায় এগিয়ে যায় ক্রোয়েশিয়া। ১-০ গোলে লিড নিয়ে ফাইনালের স্বপ্ন দেখতে থাকে বালকানরা।
কিন্তু সেই লিড ধরে রাখতে পারেনি ক্রোয়েশিয়া। পরে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর পেনাল্টি গোলে ম্যাচে সমতা ফেরায় পর্তুগাল। ১-১।
ম্যাচ যখন অতিরিক্ত সময়ের দিকে এগোচ্ছে, ঠিক নির্ধারিত সময়ের শেষ মুহূর্তে একটি গোল করে ম্যাচে এগিয়ে যায় পর্তুগাল। স্কোর ২-১। স্তব্ধ হয়ে যায় ক্রোয়াট শিবির।
তবে শেষ হয়নি নাটক। অ্যাডেড টাইমের শেষ দিকে একটি গোল করে ম্যাচে আবার সমতা ফেরায় ক্রোয়েশিয়া। পুরো স্টেডিয়ামে তখন তীব্র উল্লাস।
কিন্তু সেই উল্লাস বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি পরীক্ষা করে অফসাইডের কারণে গোলটি বাতিল করে দেন। আর কিছু সময় পর শেষ বাঁশি। ২-১ গোলের জয় নিয়ে রাউন্ড অফ সিক্সটিন নিশ্চিত করে পর্তুগাল, আর শেষ হয়ে যায় ক্রোয়েশিয়ার বিশ্বকাপ যাত্রা।
মদ্রিচের বিশ্বকাপ অধ্যায়: ২০০৬-২০২৬
২০০৬ সালে জার্মানিতে প্রথম বিশ্বকাপ খেলেছিলেন ২০ বছরের তরুণ মদ্রিচ। এরপর টানা বিশ্বকাপ খেললেন তিনি চলতি আসর পর্যন্ত।
২০১৮ রাশিয়া: সোনালি অধ্যায়
এটাই ছিল মদ্রিচের ক্যারিয়ারের সেরা বিশ্বকাপ। আর্জেন্টিনা, ইংল্যান্ডকে হারিয়ে ক্রোয়েশিয়াকে ফাইনালে তোলেন তিনি। ফাইনালে ফ্রান্সের কাছে হারলেও, টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় হিসেবে ‘গোল্ডেন বল’ জেতেন মদ্রিচ। সেই বছরই জেতেন ব্যালন ডি’অর। মেসি-রোনালদোর একচেটিয়া রাজত্ব ভেঙে দিয়েছিলেন ক্রোয়েশিয়ার এই তারকা।
২০২২ কাতার: ব্রোঞ্জ জয়
চার বছর পর কাতারে আবার সেমিফাইনাল। মরক্কোকে হারিয়ে তৃতীয় স্থান নিশ্চিত করে ক্রোয়েশিয়া। মদ্রিচের নেতৃত্বেই আসে সেই সাফল্য।
২০২৬: নাটকীয় বিদায়
২০ বছর ধরে বিশ্বকাপ মাতানো এক যোদ্ধা। ছয়টি বিশ্বকাপ, ১৯টি ম্যাচ। শেষ ম্যাচেও ৯০ মিনিট ধরে মাঝমাঠ শাসন করেছেন তিনি।
কে এই লুকা মদ্রিচ
যুদ্ধবিধ্বস্ত ক্রোয়েশিয়ার এক রাখাল বালক থেকে বিশ্ব ফুটবলের রাজা। রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে ছয়বার চ্যাম্পিয়নস লিগ জিতেছেন। কিন্তু তার আসল পরিচয়, তিনি মাঝমাঠের সেরা অস্ত্র।
গতি নয়, শক্তি নয়, তার অস্ত্র ছিল মস্তিষ্ক। এক পাসেই প্রতিপক্ষের ডিফেন্স তছনছ করে দেওয়ার ক্ষমতা ছিল তার।
ম্যাচ শেষে রোনালদো এসে জড়িয়ে ধরেন তাকে। দুই কিংবদন্তির শেষ বিশ্বকাপ লড়াই এভাবেই শেষ হলো।
লুকা মদ্রিচ চলে যাচ্ছেন। কিন্তু ক্রোয়েশিয়ার ১০ নম্বর জার্সি আর মাঝমাঠের শিল্প, সবই থেকে যাবে ফুটবল ইতিহাসে।
ধন্যবাদ, ক্যাপ্টেন। এক নক্ষত্রের বিদায়ে ফুটবল বিশ্ব আজ ভারাক্রান্ত।