তসলিম শিমুল
, যশোর
বিশ্বকাপের সবচেয়ে বেদনাদায়ক রাতগুলোর একটি কাটালেন মিশরের অধিনায়ক মোহাম্মদ সালাহ। দুর্দান্ত নেতৃত্ব, অসাধারণ পারফরম্যান্স এবং দলকে ঐতিহাসিক জয়ের স্বপ্ন দেখিয়েও শেষ পর্যন্ত খালি হাতে মাঠ ছাড়তে হলো তাকে। বিতর্কিত ভিএআরের সিদ্ধান্ত, আর্জেন্টিনার দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তন এবং শেষ মুহূর্তের রক্ষণভাগের ভুল- সব মিলিয়ে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিল মিশর।
ম্যাচ শেষে সালাহর চোখে ছিল হতাশার জল। ৩৪ বছর বয়সী এই তারকাকে আর কখনও বিশ্বকাপের মঞ্চে দেখা যাবে কি না, সেই প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে মিশরের কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীর মনে।
লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনার বিপক্ষে শুরু থেকেই দারুণ পরিকল্পনা নিয়ে মাঠে নামে মিশর। প্রথম কয়েক মিনিট বাদ দিলে পুরো প্রথমার্ধে প্রতিপক্ষের আক্রমণ ঠেকিয়ে দ্রুত পাল্টা আক্রমণে যাওয়ার কৌশল নিখুঁতভাবে বাস্তবায়ন করে সালাহর দল। শুধু প্রথমার্ধ নয়, ম্যাচের প্রায় ৭০ মিনিট পর্যন্ত সেই পরিকল্পনাই সফল ছিল।
১৫তম মিনিটে ইয়াসের ইব্রাহিমের দুর্দান্ত গোলে এগিয়ে যায় মিশর। এরপর ৫৮তম মিনিটে আসে ম্যাচের সবচেয়ে আলোচিত মুহূর্ত। হাসিম হাসান মাঝমাঠ থেকে দুই আর্জেন্টাইন খেলোয়াড়কে কাটিয়ে বল তুলে দেন সালাহর কাছে। নিজের স্বভাবসুলভ গতিতে বক্সে ঢুকে নিখুঁত পাস বাড়ান তিনি মোস্তফা জিকোর উদ্দেশে। জিকো এমিলিয়ানো মার্টিনেজকে পরাস্ত করে বল জালে জড়ালে মিশর ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে গেছে বলেই উল্লাসে ফেটে পড়ে গ্যালারিতে থাকা সমর্থকরা।
কিন্তু সেই আনন্দ স্থায়ী হয়নি। ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (ভিএআর) জানায়, গোল হওয়ার আগে আর্জেন্টিনার লিসান্দ্রো মার্টিনেজকে ফাউল করেছিলেন মিশরের মারওয়ান আত্তিয়া। রিপ্লেতে দেখা যায়, আত্তিয়ার পা মার্টিনেজের পায়ের ওপর উঠে যায়। ভিএআরের পরামর্শে মাঠের রেফারি গোলটি বাতিল করে দেন।
এক মুহূর্তেই ২-০ ব্যবধানের স্বস্তি হারিয়ে মিশর ফিরে যায় ১-০ ব্যবধানে। এই সিদ্ধান্তই ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয় বলে মনে করছেন অনেকেই।
যদিও এরপর আরও একটি গোল করে মিশর আবার ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে যায়, তবু শেষদিকে আর্জেন্টিনার তীব্র আক্রমণের সামনে সেই লিড ধরে রাখতে পারেনি তারা। লিওনেল মেসিকে সামনে রেখে দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তন করে আর্জেন্টিনা এবং নাটকীয় জয় তুলে নিয়ে নিশ্চিত করে শেষ আটের টিকিট।
ম্যাচের পর স্বাভাবিকভাবেই সবচেয়ে বড় আক্ষেপ হয়ে দাঁড়িয়েছে ৫৮তম মিনিটের সেই বাতিল হওয়া গোল। অনেকের মতে, গোলটি বহাল থাকলে ম্যাচের ফল ভিন্নও হতে পারতো। মিশরের ফুটবল ইতিহাসে এই ভিএআরের সিদ্ধান্ত দীর্ঘদিন বিতর্কের বিষয় হয়ে থাকবে।
এই ম্যাচে সালাহ শুধু অধিনায়ক হিসেবেই নন, একজন সৃজনশীল নেতা হিসেবেও নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছেন। একটি গোল তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন তিনি, পুরো ম্যাচজুড়েই আক্রমণে ছিলেন সবচেয়ে বড় ভরসা। কিন্তু ভাগ্য শেষ পর্যন্ত তার পক্ষে কথা বলেনি।
২-০ ব্যবধানে এগিয়ে থেকেও শেষ কয়েক মিনিটের রক্ষণভাগের দুর্বলতায় অবিশ্বাস্য পরাজয় বরণ করতে হয়েছে মিশরকে। বিশ্বকাপের স্বপ্ন শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হয়তো শেষ হয়ে গেল মোহাম্মদ সালাহর বিশ্বকাপ অধ্যায়ও।
ম্যাচ শেষে একরাশ হতাশা আর চোখের পানি নিয়েই মাঠ ছাড়েন মিশরের এই মহাতারকা। যে রাতটি তার বীরত্বগাথা হয়ে থাকার কথা ছিল, সেটিই পরিণত হলো অপূর্ণতার এক বেদনাদায়ক স্মৃতিতে। এখন প্রশ্ন একটাই- ফারাওদের ফুটবলের সবচেয়ে বড় তারকাকে কি বিশ্বকাপের মঞ্চে আর কখনও দেখা যাবে?