তসলিম শিমুল
বিশ্ব ফুটবল দাঁড়িয়ে আছে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বাঁকের মুখে। ২০২৬ বিশ্বকাপের মাঝপথেই দুই কিংবদন্তি বিদায় নিয়েছেন। ব্রাজিলের নেইমার কাঁদতে কাঁদতে বলেছেন ‘এখন সব শেষ’। পর্তুগালের ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো ৪১ বছর বয়সে শেষ বিশ্বকাপ খেলে ফেলেছেন। তার বিদায়ও হয়েছে কান্নায়। আর লিওনেল মেসি? আর্জেন্টিনা এখনো টুর্নামেন্টে আছে, কিন্তু ৩৯ বছর বয়সী মেসির শরীর আর চার বছর পরের বিশ্বকাপের ধকল নিতে পারবে কিনা তা নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে।
অর্থাৎ, ধরে নেওয়া যায়, ২০৩০ সালে স্পেন, পর্তুগাল ও মরক্কোতে অনুষ্ঠিতব্য বিশ্বকাপই হবে প্রথম বিশ্বকাপ যেখানে মাঠে থাকবেন না ফুটবলের এই তিন মহাতারকা। প্রশ্ন উঠছে, এই লিজেন্ডদের ছাড়া বিশ্বকাপের আবেদন কতটা থাকবে? ফুটবলের ভবিষ্যৎই বা কোন দিকে মোড় নেবে?
একটি যুগের সমাপ্তি
গত ১৮ বছর ধরে বিশ্ব ফুটবল ঘুরেছে এই তিনজনকে কেন্দ্র করে। মেসির নান্দনিকতা, রোনালদোর অমানুষিক পরিশ্রম আর নেইমারের সৃষ্টিশীলতা। ক্লাব থেকে জাতীয় দল, বিজ্ঞাপন থেকে ফ্যানদের আবেগ, সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন তারা।
নেইমারের বিদায়টা সবচেয়ে বেদনার। হালান্ডের জোড়া গোলে ব্রাজিল ১-২ গোলে হেরে যাওয়ার পর ১৩০ ম্যাচে ৮০ গোলের ক্যারিয়ার নিয়ে মাঠ ছাড়েন তিনি। রোনালদোর পর্তুগালও স্পেনের কাছে হেরে বিদায় নিয়েছে। আর মেসি? তিনি এখনো লড়ছেন। সাত গোল করে গোল্ডেন বুট রেসে আছেন। কিন্তু ২০৩০ সালে তার বয়স হবে ৪৩। বয়সের ভারে শরীর সায় দেবে কিনা, নাকি ২০২২ এর মতো ‘শেষ বিশ্বকাপ’ বলেই ২০২৬-কেই বিদায়ী মঞ্চ বানাবেন, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।
২০৩০: নতুন নায়কদের মঞ্চ
মেসি-রোনালদো-নেইমার না থাকলে বিশ্বকাপ অচল হয়ে যাবে না। বরং নতুনদের হাতেই এখন ব্যাটন যাচ্ছে। ২০২৬ বিশ্বকাপেই তার প্রমাণ মিলেছে।
নরওয়ের আরলিং হালান্ড ব্রাজিলকে হারিয়ে দলকে প্রথমবার কোয়ার্টারে তুলেছেন। সাত গোল করে তিনি এখন এমবাপ্পে ও মেসির সঙ্গে যুগ্মভাবে সর্বোচ্চ গোলদাতা। ২০৩০ সালে ২৭ বছর বয়সী হালান্ড থাকতে পারেন তার ক্যারিয়ারের সেরা সময়ে।
ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপ্পেও সাত গোল নিয়ে আছেন। ২০৩০ এ তার বয়স হবে ৩১। অভিজ্ঞতা ও তারুণ্যের মিশ্রণে তিনিই হয়তো হবেন ফ্রান্সের কান্ডারি। আর স্পেনের লামিন ইয়ামাল! মাত্র ১৮ বছর বয়সে যে ফুটবল খেলছেন ২০৩০-এ ২২ বছরের ইয়ামাল হতে পারেন টুর্নামেন্টের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ।
এদের সঙ্গে যোগ দেবেন ভিনিসিয়ুস, বেলিংহ্যাম, ফ্লোরিয়ান ভির্টজরা। অর্থাৎ তারকার অভাব হবে না, শুধু চরিত্রগুলো পাল্টাবে।
বাণিজ্য ও কৌশলে বড় ধাক্কা
কিন্তু চ্যালেঞ্জও কম নয়। মেসি-রোনালদো-নেইমার শুধু ফুটবলার ছিলেন না। তারা ছিলেন গ্লোবাল ব্র্যান্ড। তাদের কারণেই বিশ্বকাপের টিভি রেটিং, স্পন্সরশিপ ও সোশ্যাল মিডিয়ার আলোচনা তুঙ্গে থাকতো। ২০৩০ বিশ্বকাপের জন্য ফিফাকে নতুন মুখ, নতুন গল্প তৈরি করতে হবে। ‘শেষবার মেসিকে দেখবো’- এই আবেগ দিয়ে আর টিকিট বিক্রি হবে না।
কৌশলগতভাবেও পরিবর্তন আসছে। গত দুই দশক আমরা দেখেছি দলগুলো একজনকে ঘিরে দল সাজিয়েছে। আর্জেন্টিনা মেসিকে, পর্তুগাল রোনালদোকে, ব্রাজিল নেইমারকে। কিন্তু ২০৩০ এর ফুটবল হবে অনেক বেশি দলগত। স্পেনের পাসিং, ফ্রান্সের গতি, ইংল্যান্ডের ফিজিক্যালিটি। কোনো একক জাদুকরের ওপর ভরসা করে আর বিশ্বকাপ জেতা যাবে না।
ব্রাজিলের জন্য সংকটটা সবচেয়ে বেশি। নেইমারের বিকল্প এখনো তৈরি হয়নি। ভিনিসিয়ুস প্রতিভাবান, কিন্তু দলকে টানার মতো নেতা এখনো হয়ে উঠতে পারেননি।
ফুটবল থেমে থাকবে না
তবুও আশার কথা হলো, ফুটবল কখনো একজনের ওপর নির্ভর করে না। পেলে গেছেন, ম্যারাডোনা গেছেন, ফুটবল এগিয়েছে। মেসি-রোনালদো-নেইমারের পরও নতুন কেউ আসবে। হয়তো তিনি হালান্ড, নয়তো ইয়ামাল, অথবা এমন কেউ যার নাম আমরা আজও জানি না।
২০৩০ বিশ্বকাপ হবে আরও দ্রুত, আরও ফিজিক্যাল এবং আরও প্রযুক্তিনির্ভর। এআই রেফারি, রিয়েল টাইম ডাটা, সেমি-অটোমেটেড অফসাইড। মাঠের লড়াইয়ের পাশাপাশি লড়াই হবে ডাগআউট ও ল্যাবেও।
মেসি খেলবেন কিনা সেটা সময়ই বলবে। কিন্তু একটা বিষয় নিশ্চিত, ২০৩০ বিশ্বকাপে আমরা নতুন রাজার মুকুট পরানো দেখবো। সেই মুকুট কার মাথায় ওঠে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।