তসলিম শিমুল
একসময় তাকে কটাক্ষ করে বলা হতো ‘নেপোকিড’। বাবার পরিচয়ের কারণে বছরের পর বছর শুনতে হয়েছে সমালোচনা। কখনো এক ক্লাব থেকে আরেক ক্লাবে ঘুরেছেন, কখনো ভয়াবহ চোটে পড়ে এমন অবস্থায় পৌঁছেছেন যে অন্যের সাহায্য ছাড়া ঠিকমতো দাঁড়ানো বা হাঁটাও সম্ভব ছিল না। অথচ সেই মিকেল মেরিনোই আজ স্পেনের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য যোদ্ধাদের একজন। তার দুর্দান্ত পারফরম্যান্সেই শক্তিশালী পর্তুগালকে হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করেছে স্পেন।
মিকেল মেরিনোর জন্মই যেন হয়েছিল ফুটবলের পরিবেশে। তার বাবা অ্যাঞ্জেল মেরিনো ছিলেন স্পেনের শীর্ষ লিগের পরিচিত ফুটবলার। প্রায় ১৭ বছর লা লিগায় খেলা বাবার ছেলে হওয়ায় ছোটবেলা থেকেই মিকেলের কাঁধে ছিল বিশাল প্রত্যাশার বোঝা। মাঠে যতটা না নিজের জন্য খেলতেন, তার চেয়েও বেশি শুনতে হতো তিনি নাকি বাবার পরিচয়ের কারণেই সুযোগ পাচ্ছেন। ‘নেপোকিড’ তকমা দীর্ঘদিন তার পিছু ছাড়েনি।
ওসাসুনার জার্সিতে পেশাদার ক্যারিয়ার শুরু হলেও এরপরের পথটা ছিল ঘুরে বেড়ানোর। জার্মানির বরুশিয়া ডর্টমুন্ড, ইংল্যান্ডের নিউক্যাসল ইউনাইটেড- এক ক্লাব থেকে আরেক ক্লাবে গিয়েছেন, কিন্তু কোথাও নিজেকে পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত করতে পারেননি। অবশেষে রিয়াল সোসিয়েদাদে ফিরে যেন নিজের পরিচয় খুঁজে পান। সেখানে ধারাবাহিক পারফরম্যান্স তাকে আবারও স্প্যানিশ ফুটবলের অন্যতম সেরা মিডফিল্ডারে পরিণত করে। স্পেনের ইউরো শিরোপা জয়ের পথেও ছিল তার গুরুত্বপূর্ণ অবদান।
সেই পারফরম্যান্সের পুরস্কার হিসেবে ২০২৪ সালের আগস্টে স্বপ্নের ক্লাব আর্সেনালে যোগ দেন মেরিনো। কিন্তু লন্ডনে তার নতুন অধ্যায়ের শুরুটা ছিল দুঃস্বপ্নের মতো। প্রথম অনুশীলনেই কাঁধে চোট পেয়ে এক মাসেরও বেশি সময় মাঠের বাইরে থাকতে হয়।
চোট কাটিয়ে ফিরে যখন ধীরে ধীরে প্রিমিয়ার লিগের গতি ও শারীরিক লড়াইয়ের সঙ্গে মানিয়ে নিচ্ছিলেন, তখনই আসে আরও বড় ধাক্কা। ডান পায়ের বিরল ধরনের স্ট্রেস ও হেয়ারলাইন ফ্র্যাকচার তার ক্যারিয়ারকেই অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দেয়। কয়েক মাস মাঠের বাইরে থাকতে হয়। এমনও সময় এসেছিল, যখন অন্যের সাহায্য ছাড়া ঠিকমতো দাঁড়ানো কিংবা হাঁটাও সম্ভব ছিল না। সেই কঠিন মুহূর্তে তাকে তাড়া করে ফিরতো একটাই প্রশ্ন- আবার কি কোনোদিন ফুটবল মাঠে ফিরতে পারবেন?
ঠিক সেই সময়েই সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে পাশে দাঁড়ান তার স্ত্রী। আট মাসের অন্তঃসত্ত্বা হয়েও তিনি স্বামীর পাশে থেকেছেন প্রতিটি কঠিন মুহূর্তে। নিজের শারীরিক কষ্ট উপেক্ষা করে মেরিনোকে মানসিকভাবে ভেঙে পড়তে দেননি। পরে মেরিনো নিজেই স্বীকার করেছিলেন, পুনর্বাসনের সবচেয়ে কঠিন সময়ে স্ত্রীর ভালোবাসা ও সমর্থনই তাকে নতুন করে লড়াই করার সাহস জুগিয়েছিল।
অবশেষে সব প্রতিকূলতাকে হার মানিয়ে ফিরেছেন মিকেল মেরিনো। আর্সেনালের হয়ে শিরোপা জয়ের আনন্দ যেমন উপহার দিয়েছেন, তেমনি জাতীয় দলের জার্সিতেও হয়ে উঠেছেন স্পেনের ভরসার নাম।
চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনালে ভিতিনিয়ার দলের কাছে হারতে হয়েছিল তাকে। কিন্তু আন্তর্জাতিক মঞ্চে সেই ভিতিনিয়াদের বিপক্ষেই বদলি হিসেবে নেমে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেন মেরিনো। একসময় যারা তাকে অবহেলা করেছিল, আজ তাদের সামনেই তিনিই স্পেনের জয়ের নায়ক।
সমালোচনা, ব্যর্থতা, ক্লাব বদল, ভয়াবহ চোট আর অনিশ্চয়তায় ভরা পথ পেরিয়ে মিকেল মেরিনো আজ প্রমাণ করেছেন, প্রতিভা শুধু সুযোগে নয়, দৃঢ়তা, ধৈর্য আর অদম্য মানসিক শক্তিতেই নিজের প্রকৃত পরিচয় তৈরি করে।