তসলিম শিমুল
, যশোর
একদিন এই মুহূর্ত আসবেই। সবাই জানতেন। তবু যখন সত্যি সত্যিই সেই মুহূর্ত সামনে এসে দাঁড়ালো, তখন সেটিকে মেনে নেওয়া যেন সবচেয়ে কঠিন হয়ে উঠলো। স্পেনের বিপক্ষে হারের সঙ্গে শেষ হলো ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর বিশ্বকাপ যাত্রা। ফুটবলকে এখনও বিদায় জানাননি তিনি, কিন্তু বিশ্বকাপের মঞ্চে পর্তুগিজ মহাতারকার অধ্যায় শেষ হয়ে গেল চোখের জলেই।
ম্যাচের আগেই রোনালদো জানিয়ে দিয়েছিলেন, ২০২৬ বিশ্বকাপই হবে তার শেষ বিশ্বকাপ। কিন্তু শেষ বাঁশি বাজার পর যখন তাকে অশ্রুসিক্ত চোখে মাঠ ছাড়তে দেখা গেল, তখন কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীর মনেও নেমে এলো এক অন্যরকম শূন্যতা।
বিশ্বকাপ ট্রফি- একমাত্র এই স্বপ্নটিই অধরা থেকে গেল। এই অপূর্ণতাকে ঘিরেই হয়তো আবারও শুরু হবে ‘সর্বকালের সেরা’ বিতর্ক। অনেকে বলবেন, বিশ্বকাপ না জিতলে আর কীসের পূর্ণতা! কিন্তু একটি ট্রফি কি একজন ফুটবলারের দুই দশকের অসাধারণ লড়াই, আত্মত্যাগ আর অনুপ্রেরণার গল্পকে মুছে দিতে পারে?
২০৩০ বিশ্বকাপে পর্তুগাল হয়তো আবারও খেলবে। নতুন প্রজন্মের ফুটবলাররা দেশের জার্সি গায়ে স্বপ্ন দেখবেন। কিন্তু তখন সাত নম্বর জার্সি পরে মাঠে নামবেন না রোনাল্ডো। হয়তো গ্যালারিতে বসে নতুনদের উৎসাহ দেবেন, গোল হলে হাততালি দেবেন, গোল মিস হলে আক্ষেপ করবেন। কিন্তু মাঠের নায়ক হিসেবে তাকে আর দেখা যাবে না।
স্পেনের বিপক্ষে ম্যাচটিই তাই বিশ্বকাপে রোনাল্ডোর শেষ অধ্যায় হয়ে রইলো।
এই দীর্ঘ যাত্রাপথে রোনালদো শুধু গোল করেননি, গড়েছেন অসংখ্য ইতিহাস। আন্তর্জাতিক ফুটবলে ১৪৬ গোল, ক্যারিয়ারে এক হাজার গোলের মাইলফলকের খুব কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়া, পাঁচটি উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, পাঁচটি ব্যালন ডি’অর, ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপ এবং উয়েফা নেশনস লিগের শিরোপা-তার অর্জনের তালিকা ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সমৃদ্ধ অধ্যায়।
তবু সংখ্যার বাইরেও আরেকজন রোনালদো আছেন। যিনি ব্যর্থতার পর ঘুরে দাঁড়ানোর নাম, যিনি প্রতিটি সমালোচনাকে নতুন চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করেছেন। ভালোবাসা তাকে যেমন শক্তি দিয়েছে, তেমনি সমালোচনা ও বিদ্রূপও তাকে আরও দৃঢ় করেছে।
পর্তুগালের মাদেইরার এক সাধারণ পরিবার থেকে উঠে আসা ছেলেটির পথচলা কখনোই সহজ ছিল না। দারিদ্র্য, সংগ্রাম আর প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করেই নিজেকে বিশ্বের অন্যতম সেরা ফুটবলারে পরিণত করেছেন তিনি। সেই কারণেই রোনালদো শুধু একজন সফল ফুটবলারই নন, অধ্যবসায়, আত্মবিশ্বাস আর অবিরাম পরিশ্রমেরও প্রতীক।
বিশ্বকাপের শেষ মঞ্চেও তিনি শেষ পর্যন্ত লড়াই করেছেন। কিন্তু ফুটবল সব সময় রূপকথার সফল সমাপ্তি লেখে না। কখনো কখনো সবচেয়ে বড় কিংবদন্তির গল্পেও থেকে যায় একটি অপূর্ণতা।
হয়তো বিশ্বকাপ ট্রফি তার হাতে ওঠেনি। কিন্তু কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ে যে ভালোবাসা, অনুপ্রেরণা আর শ্রদ্ধার জায়গা তিনি তৈরি করেছেন, তার মূল্য কোনো ট্রফি দিয়ে মাপা যায় না।
ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর বিশ্বকাপ অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটেছে। কিন্তু তার সংগ্রাম, জেদ, অদম্য মানসিকতা এবং নিজেকে প্রতিদিন নতুন করে প্রমাণ করার যে শিক্ষা, তা ফুটবল ইতিহাসে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে অনুপ্রেরণা হয়ে বেঁচে থাকবে।
বিশ্বকাপের মঞ্চ থেকে বিদায় নিলেন এক মহাতারকা। শেষ হলো একটি অধ্যায়, কিন্তু শেষ হলো না একটি কিংবদন্তির গল্প।