যশোর, বাংলাদেশ || রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

মাঝমাঠ যাদের ম্যাচও তাদের

তসলিম শিমুল

, যশোর

প্রকাশ : শনিবার, ১৮ জুলাই,২০২৬, ০৩:১৫ পিএম
মাঝমাঠ যাদের ম্যাচও তাদের

বিশ্বকাপের মতো টুর্নামেন্টে আমরা সাধারণত নায়ক খুঁজি গোলদাতাদের মধ্যে। আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকেন লিওনেল মেসি, কিলিয়ান এমবাপ্পে, লামিন ইয়ামাল, জুড বেলিংহ্যাম কিংবা অন্য কোনো তারকা ফরোয়ার্ড। কিন্তু ২০২৬ বিশ্বকাপের দিকে একটু গভীরভাবে তাকালে বোঝা যায়, এই টুর্নামেন্টের প্রকৃত নায়ক ছিলেন মিডফিল্ডাররা। আরও নির্দিষ্ট করে বললে, চারজনের মিডফিল্ড।

আধুনিক ফুটবলে একটি প্রচলিত কথা আছে, ‘যে দল মাঝমাঠ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, সেই দল ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ করে।’ ২০২৬ বিশ্বকাপও তারই বাস্তব প্রমাণ।

ফাইনালে ওঠা দুই দল, আর্জেন্টিনা ও স্পেন, দুটি ভিন্ন ফুটবল সংস্কৃতির প্রতিনিধিত্ব করে। আর্জেন্টিনা বেশি সরাসরি, স্পেন বেশি পজিশনাল। কিন্তু দুটি দলের মধ্যে একটি মৌলিক মিল রয়েছে। দুই দলই পুরো টুর্নামেন্টজুড়ে চারজনের মিডফিল্ডকে কেন্দ্র করে নিজেদের কৌশল নির্মাণ করেছে।

স্কালোনির আর্জেন্টিনা মাঝমাঠে অতিরিক্ত একজন খেলোয়াড় রেখে প্রতিপক্ষের ওপর সংখ্যাগত চাপ তৈরি করেছে। এতে রক্ষণ আরও নিরাপদ হয়েছে, প্রেসিং আরও কার্যকর হয়েছে এবং সবচেয়ে বড় কথা, লিওনেল মেসি বল পেলে তাকে আর নিচে নেমে খেলা গড়তে হয়নি। তিনি মাঠের সবচেয়ে বিপজ্জনক এলাকায় থেকে নিজের সৃজনশীলতা কাজে লাগাতে পেরেছেন।

স্পেনও একই ধরনের অন্য রূপ দেখিয়েছে। তাদের চারজনের মিডফিল্ড ছিল বলের দখল ধরে রাখার মূল অস্ত্র। ছোট ছোট পাস, ক্রমাগত পজিশন পরিবর্তন এবং মাঝমাঠে বাড়তি খেলোয়াড়- এই তিনটি বিষয় প্রতিপক্ষকে প্রায়ই অসহায় করে তুলেছে।

অন্যদিকে, টুর্নামেন্টের বেশ কয়েকটি শক্তিশালী দলের ব্যর্থতার পেছনেও মাঝমাঠের লড়াই বড় কারণ হয়ে উঠেছে।

ব্রাজিল লুকাস পাকেতাকে ঘিরে তুলনামূলক ভারসাম্যপূর্ণ ছিল। কিন্তু নরওয়ের বিপক্ষে কার্যত দুইজন সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার নিয়ে খেলায় তারা মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ হারায়। আধুনিক ফুটবলে দুইজন মিডফিল্ডার দিয়ে খেলা নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন। ব্রাজিল সেই বাস্তবতার শিকার হয়েছে।

ফ্রান্সের সমস্যাটাও একই ধরনের। তাদের আক্রমণভাগ নিঃসন্দেহে বিশ্বের সেরাদের একটি। কিন্তু মাঝমাঠে সংখ্যাগত ঘাটতির কারণে তারা প্রায়ই প্রতিপক্ষের নিয়ন্ত্রণে খেলতে বাধ্য হয়েছে। শক্তিশালী ফরোয়ার্ড থাকা সত্ত্বেও ম্যাচের ছন্দ বারবার হাতছাড়া হয়েছে।

ইংল্যান্ডের ক্ষেত্রেও কাগজে তিনজন মিডফিল্ডার থাকলেও বাস্তবে জুড বেলিংহাম প্রায়ই দ্বিতীয় স্ট্রাইকার হিসেবে খেলেছেন। ফলে মাঝমাঠে প্রকৃতপক্ষে দুইজনের ওপরই চাপ পড়েছে। শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে এই ভারসাম্যহীনতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

সবচেয়ে আকর্ষণীয় উদাহরণ সম্ভবত পর্তুগাল। তাদের মিডফিল্ডে প্রতিভার অভাব ছিল না। বরং অনেকের মতে, এটি ছিল টুর্নামেন্টের সবচেয়ে শক্তিশালী মিডফিল্ড ইউনিট। কিন্তু ফুটবল কেবল ভালো খেলোয়াড়ের সমষ্টি নয়। সমন্বয়, স্পষ্ট ভূমিকা এবং দলগত বোঝাপড়ার অভাবে সেই প্রতিভা কখনোই পূর্ণ শক্তিতে কাজ করতে পারেনি।

জার্মানি এবং নেদারল্যান্ডসের অভিজ্ঞতাও একই শিক্ষা দেয়। দুইজন সেন্ট্রাল মিডফিল্ডারের কাঠামো প্রতিপক্ষকে মাঝমাঠে অতিরিক্ত জায়গা দিয়েছে। মরক্কোর বিপক্ষে নেদারল্যান্ডস দুই ফুল-ব্যাককে আক্রমণে ঠেলে দিয়ে মাঝখানে নিজেরাই সংখ্যাগতভাবে পিছিয়ে পড়েছিল। সেই কৌশল শেষ পর্যন্ত তাদের বিপক্ষেই গেছে।

অবশ্য এখানে একটি সতর্কতা প্রয়োজন। চারজনের মিডফিল্ড কোনো জাদুকরি ফর্মুলা নয়। শুধু একজন অতিরিক্ত মিডফিল্ডার নামিয়ে দিলেই সাফল্য নিশ্চিত হয় না। খেলোয়াড়দের গুণগত মান, তাদের পারস্পরিক বোঝাপড়া, প্রেসিংয়ের শৃঙ্খলা, ট্রানজিশনের গতি এবং কোচের পরিকল্পনা- সবকিছু মিলেই একটি ব্যবস্থা কার্যকর হয়।

তবুও ২০২৬ বিশ্বকাপ একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ফুটবল যত দ্রুত হয়েছে, মাঝমাঠের গুরুত্বও তত বেড়েছে। যে দল মাঝমাঠে একজন অতিরিক্ত খেলোয়াড় রাখতে পেরেছে, সেই দল ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ করেছে, প্রতিপক্ষের প্রেস ভেঙেছে এবং সংকটের মুহূর্তে নিজেদের স্থির রেখেছে।

ফুটবলে ট্রফি জেতানো মুহূর্ত হয়তো তৈরি করেন কোনো মেসি, ইয়ামাল বা বেলিংহাম। কিন্তু সেই মুহূর্ত তৈরির ভিত্তিটা তৈরি হয় মাঝমাঠেই।

সম্ভবত সে কারণেই লিওনেল স্কালোনি পুরো বিশ্বকাপজুড়ে নিজের চারজনের মিডফিল্ড দর্শন থেকে একবারও সরে আসেননি। কারণ তিনি বুঝেছিলেন, আধুনিক বিশ্বকাপ ফুটবলে আক্রমণ ম্যাচ জেতাতে পারে, কিন্তু মিডফিল্ডই টুর্নামেন্ট জেতায়।

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)