তসলিম শিমুল
বিশ্বকাপের ফাইনাল মানেই কোটি মানুষের চোখ এক মুহূর্তের অপেক্ষায়- শেষ বাঁশি বাজতেই কোন অধিনায়কের হাতে উঠবে সোনালি সেই ট্রফি। কিন্তু ফুটবলের সবচেয়ে কাক্সিক্ষত এই বিশ্বকাপ ট্রফির জন্মকাহিনি, নকশার দর্শন এবং ইতিহাস অনেকেরই অজানা।
বর্তমানে ব্যবহৃত বিশ্বকাপ ট্রফিটির নকশা তৈরি করেছিলেন ইতালির খ্যাতনামা ভাস্কর সিলভিও গাজ্জানিগা। ১৯৭০ সালে ব্রাজিল তৃতীয়বার বিশ্বকাপ জিতে আগের জুলে রিমে ট্রফি স্থায়ীভাবে নিজেদের দখলে নেওয়ার পর নতুন ট্রফি তৈরির উদ্যোগ নেয় ফিফা। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ৫০টিরও বেশি নকশা জমা পড়লেও গাজ্জানিগার নকশাই নির্বাচিত হয়।
মিলানের ব্রেরা এলাকায় নিজের স্টুডিওতে ট্রফিটির নকশা তৈরি করেন গাজ্জানিগা। এতে দেখা যায়, দুটি মানবমূর্তি সর্পিল ভঙ্গিতে উপরে উঠে পৃথিবীর প্রতীকী গোলককে ধারণ করে আছে।
গাজ্জানিগার ছেলে জর্জিওর ভাষ্য, তার বাবা এমন একটি নকশা চেয়েছিলেন, যেখানে পৃথিবী, মানুষের শক্তি এবং ডিএনএ-সদৃশ গতিশীলতার প্রতিফলন থাকবে।
গাজ্জানিগার মতে, ট্রফিটি শুধু একটি পুরস্কার নয়; এটি ফুটবলারদের কঠোর পরিশ্রম, সংগ্রাম, জয়ের আকাক্সক্ষা এবং সমর্থকদের উচ্ছ্বাসের প্রতীক। মানবমূর্তির প্রসারিত হাত বিজয়ের আনন্দকে ধারণ করে, আর উপরের পৃথিবীর গোলক ফুটবলের বৈশ্বিক আবেদনকে তুলে ধরে।
বর্তমান বিশ্বকাপ ট্রফির উচ্চতা ৩৬ সেন্টিমিটার। এটি ১৮ ক্যারেট সোনা দিয়ে তৈরি এবং নিচের অংশে রয়েছে সবুজ ম্যালাকাইট পাথরের দুটি বলয়, যা ফুটবল মাঠের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়।
তবে বিশ্বকাপজয়ী দল আসল ট্রফিটি স্থায়ীভাবে নিজেদের কাছে রাখতে পারে না। ফাইনাল শেষে ট্রফিটি ফিফার সুইজারল্যান্ডের সদর দপ্তরে ফিরিয়ে নেওয়া হয়। চ্যাম্পিয়ন দলকে দেওয়া হয় আসল ট্রফির একটি উচ্চমানের প্রতিরূপ (রেপ্লিকা)।
বিশ্বফুটবল জয়ীদের জন্য প্রথমে ছিল জুলে রিমে ট্রফি। ১৯৩০ সালে প্রথম বিশ্বকাপ উপলক্ষে তৈরি ওই ট্রফিতে গ্রিক বিজয়ের দেবী নাইকি’র প্রতিকৃতি ছিল। ১৯৬৬ সালে ইংল্যান্ডে একটি প্রদর্শনী থেকে ট্রফিটি চুরি হয়ে যায়। পরে ‘পিকলস’ নামে একটি কুকুর দক্ষিণ লন্ডনের একটি ঝোপের নিচে সেটি খুঁজে পায়। কিন্তু ১৯৮৩ সালে ব্রাজিল ফুটবল ফেডারেশনের সদর দপ্তর থেকে দ্বিতীয়বার চুরি হওয়ার পর ট্রফিটি আর উদ্ধার করা যায়নি। ধারণা করা হয়, সেটি গলিয়ে ফেলা হয়েছিল।
সিলভিও গাজ্জানিগা শুধু বিশ্বকাপ ট্রফিই নয়, উয়েফা কাপ ও ইউরোপিয়ান সুপার কাপসহ আরও বেশ কয়েকটি মর্যাদাপূর্ণ ট্রফির নকশাও তৈরি করেছিলেন। তিনি ২০১৬ সালে মৃত্যুবরণ করেন।
১৯৭৪ সালের বিশ্বকাপে প্রথমবার গাজ্জানিগার তৈরি ট্রফি বিজয়ী পশ্চিম জার্মানির হাতে ওঠে। সেই দৃশ্য টেলিভিশনে পরিবারের সঙ্গে দেখেছিলেন তার ছেলে জর্জিও। তার কথায়, ‘মিউনিখে যখন জার্মান অধিনায়ক ট্রফিটি উঁচিয়ে ধরলেন এবং পুরো স্টেডিয়াম উল্লাসে ফেটে পড়লো, ঠিক সেই মুহূর্তেই এটি একটি সাধারণ বস্তু থেকে ফুটবলের চিরন্তন আইকনে পরিণত হয়।’
১৯৭৪ সাল থেকে ২০২৬ পর্যন্ত মোট ১৪টি বিশ্বকাপে এই ট্রফিই ব্যবহৃত হয়েছে। ফিফা জানিয়েছে, অন্তত ২০৩৮ সালের বিশ্বকাপ পর্যন্ত একই ট্রফি ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। ফলে আগামী দিনেও বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ গৌরবের প্রতীক হয়ে থাকবে সিলভিও গাজ্জানিগার সেই কালজয়ী সৃষ্টি।