যশোর, বাংলাদেশ || শনিবার, ২৫ জুলাই ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

রক্তাক্ত জুলাই

‘সবাই তোমাকে শহীদের মা বলবে’

শাহারুল ইসলাম ফারদিন

, যশোর

প্রকাশ : শনিবার, ২৫ জুলাই,২০২৬, ১০:০০ এ এম
‘সবাই তোমাকে শহীদের মা বলবে’

‘‘আমি ওকে অনেক বলেছিলাম, আজকে যাস না বাবা। দেশের অবস্থা ভালো না। কিন্তু ও হেসে বলেছিল, ‘তুমি শুধু আমার কথাই ভাবো, দেশের কথা ভাবো না। আমি যদি শহীদ হই, সবাই তোমাকে শহীদের মা বলবে।”

কথাগুলো বলতে বলতে বারবার থেমে যাচ্ছিলেন রোকনুজ্জামান রাকিবের মা রোজিনা বেগম। দুই বছর পেরতে গেলেও ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের সেই বিকেল যেন এখনও তার কাছে থেমে আছে। যে ছেলে বিজয়ের আনন্দে বাড়ি থেকে বের হয়েছিল, সে আর জীবিত ফিরে আসেনি।

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় প্রকাশিত জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের প্রথম ধাপের সরকারি গেজেটে যশোর জেলার তালিকায় ২৯ নম্বর ক্রমিকে (মেডিকেল কেস আইডি-২৬১) রোকনুজ্জামান রাকিবের নাম রয়েছে। যশোর সদর উপজেলার বালিয়া ভেকুটিয়া গ্রামের জাহাঙ্গীর আলমের ছেলে রাকিব যশোর সরকারি মাইকেল মধুসূদন (এমএম) কলেজের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন।

পরিবার, সহপাঠী ও আন্দোলনের সমন্বয়কদের ভাষ্য অনুযায়ী, ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পদত্যাগের খবরে বের হওয়া বিজয় মিছিল শেষে চিত্রা মোড়ের পাঁচ তারকা হোটেল জাবির ইন্টারন্যাশনালে আগুন লাগলে ভেতরে আটকে পড়াদের উদ্ধারে ছুটে যান রাকিব। সেই আগুন থেকেই আর ফিরতে পারেননি তিনি।

ছেলের ব্যবহৃত জামাকাপড়, জুতা, ডায়েরি ও বিভিন্ন স্মৃতিচিহ্ন দেখাতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন এই নারী।

রাকিবের মা রোজিনা বেগম বলেন, ‘‘সকালে আমি রাকিবকে বলেছিলাম, আজকে মিছিলে যাস না আব্বু, আজকে খুব সমস্যা। ও বলেছিল, ‘ঠিক আছে, যাব না।’ কিন্তু পরে যখন শুনলো হাসিনা পদত্যাগ করেছে, তখন আনন্দে আত্মহারা হয়ে বাসায় এসে বললো, আম্মু, ‘আজকে আমাদের কষ্টের ফল সার্থক হয়েছে।’ ওইদিন ও রুমে ঢুকেই খটের ওপর লাফিয়ে লাফিয়ে এত্তো হাসছিলো যে ওর সামনে যে থাকবে সে-ও হাসতে বাধ্য। এতো হাসতে আমি কখনো দেখিনি এবং আমার দেখা এটাই ছিলো তার জীবনের শেষ হাসি।”

তারপর রাকিব গোসল করে তাড়াতাড়ি বের হওয়ার প্রস্তুতি নিল। আমি টাকা দিতে চাইনি। তখন ও বললো, ‘‘তুমি স্বার্থপর মা, শুধু আমার কথা ভাবো, দেশের কথা ভাবো না? আমি যদি শহীদ হই, সবাই তোমাকে ‘শহীদের মা’ বলবে। আমি শুধু বলেছিলাম, আমি তোকে হারাতে চাই না। কিন্তু ও বললো, ‘আজ আর কোনো সমস্যা হবে না, আজকে বিজয়ের মিছিল।”

“আমি ওর জন্য লাউ, ডিম আর গরুর মাংস রান্না করছিলাম। ও বললো, আম্মু, ‘আমার খাওয়ার সময় নেই। তোমরা খেয়ে নিও, আমার আসতে লেট হবে না।’ ওর পছন্দের গেঞ্জি আর শার্ট পরে ১০০ টাকা নিয়ে বাসা থেকে বের হয়ে গেল। যাওয়ার আগে বলেছিল, ‘আম্মু, তুমি খেয়ে নিও,” চোখের পানি ফেলতে ফেলতে বলছিলেন হতভাগ্য নারী।

“বাসা থেকে বের হওয়ার আগে আমি বলেছিলাম, সাবধানে যাস। তখন ও আমার দিকে তাকিয়ে বললো, ‘আম্মু, যার যেখানে মৃত্যু লেখা থাকবে, সে সেখানেই মরবে। আমার মৃত্যু যেন শহীদের মতো হয়, আমার জন্য দোয়া করবা।’ কথাগুলো এখনো কানে বাজে।”

সুবর্ণভূমি প্রতিবেদককে তিনি বলছিলেন, “দুপুরের পর থেকে আমি বারবার ফোন করছিলাম। ওকে পাইনি। ওর বন্ধুদেরও প্রায় ২২ বার ফোন দিয়েছিলাম, কিন্তু কেউ ধরেনি। পরে জানতে পারি তখনই ওখানে ভয়াবহ ঘটনা ঘটেছিল। বিকেলে একটি মেয়ে ফোন করে বললো, ‘আন্টি, আপনার রাকিব আমাদের মাঝে নেই।’ আমি বিশ্বাসই করতে পারিনি। পরে হাসপাতালে গিয়ে আগুনে পোড়া মুখ দেখে ছেলেকে চিনতে পারিনি। শেষ পর্যন্ত ওর জুতা দেখে বুঝেছি, এটাই আমার ছেলে। পরে ওর একটি ভয়েস রেকর্ড শুনি। সেখানে ও কালেমা পড়ছিল আর বলছিল, ‘আমার আব্বু-আম্মুকে দেখে রাখিস। আমি মনে হয় আর ফিরবো না। আমার আম্মুকে বলিস, আমাকে মাফ করে দিতে। ওই রেকর্ড শোনার পর আমি আর স্বাভাবিক থাকতে পারিনি। ছয় মাস আমার কোনো হুঁশ ছিল না।”

“রাকিব সবসময় বলতো, ‘আমি আমার জীবনের পরোয়া করি না। দেশের জন্য যদি শহীদ হতে পারি, ইতিহাসের পাতায় আমার নাম থাকবে।’ ওর ডায়েরিতেও এসব লেখা ছিল। এখনো যখন ওর কথা মনে পড়ে বা সেই ভয়েস শুনি, মনে হয় সেদিনের হাসিটাই ছিল আমার ছেলের শেষ হাসি। ও প্রতিদিন সব কথা এসে আমাকে বলতো।”

কথা হয় রাকিবের বাবা জাহাঙ্গীর আলমের সাথে। তিনি বলেন, ‘ছেলে শুধু আমাদের সন্তানই ছিল না, পুরো পরিবারের ভরসা ছিল। পড়াশোনা শেষ করে ভালো চাকরি করে সংসারের দায়িত্ব নিতে চেয়েছিল। ওর কথাটাই আমরা শুনতাম। কারণ ও কখনো ভুল সিদ্ধান্ত নেয়নি। আমরা কোনো বিষয়ে ভুল করলে ও আমাদের বুঝিয়ে দিতো।’

ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকা পরিচিতদের কাছ থেকে জাহাঙ্গীর ৫ আগস্টে তার ছেলের মৃত্যুর ঘটনা শুনেছেন। সেই বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি বলছিলেন, ‘জাবির হোটেলে আগুন লাগার পর সামনেই দাঁড়িয়ে ছিল রাকিব। তখন ভেতর থেকে মানুষের আর্তচিৎকার শুনে কয়েকজনের সঙ্গে উদ্ধারকাজে ঢুকে পড়ে। আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় নিচে নামার পথ বন্ধ হয়ে যায়। পরে সিঁড়িঘরেই তারা আটকা পড়ে।’

তার ভাষ্য, ছেলের বন্ধুদের কাছ থেকে তিনি জেনেছেন, শেষ মুহূর্তেও রাকিব নিজের কথা নয়, বাবা-মায়ের কথাই ভেবেছিল। বন্ধুদের মোবাইল কলে বলেছিল, ‘আমার আব্বু-আম্মুকে দেখে রাখিস। মনে হয় আমি আর ফিরতে পারবো না।’

‘ছেলেটা আর ফিরে আসেনি। কিন্তু আজ সবাই তাকে শহীদ বলছে। ও যা বলেছিল, শেষ পর্যন্ত সেটাই সত্যি হলো।’

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)