এম জালাল উদ্দীন
, পাইকগাছা (খুলনা)
বর্ষাকাল মানেই বৃক্ষরোপণের উপযুক্ত সময়। আর এই মৌসুমকে ঘিরেই খুলনার পাইকগাছা উপজেলার নার্সারিগুলোতে শুরু হয়েছে কর্মচাঞ্চল্য।
সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ক্রেতাদের ভিড়, আর সেই সঙ্গে ব্যস্ত সময় পার করছেন নার্সারি মালিক, শ্রমিক ও পরিবহনকর্মীরা।
ব্যবসায়ীদের আশা, এবার বর্ষায় একশ’ কোটি টাকার বেশি তাদের বিকিকিনি হবে।
পাইকগাছা উপজেলার গদাইপুর ইউনিয়ন এখন দেশের অন্যতম পরিচিত নার্সারি অঞ্চল হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে গড়ে উঠেছে প্রায় পাঁচ থেকে ছয়শ’ বাণিজ্যিক নার্সারি। এছাড়াও অন্যান্য এলাকায় ছোট-বড় আরও প্রায় দুইশ’য়ের মতো নার্সারি রয়েছে, যেগুলো দশ শতক থেকে এক বিঘা বা তারও বেশি জমির ওপর গড়ে উঠেছে। ফলে, পুরো গদাইপুর এলাকা যেনো এখন এক বিশাল সবুজের গ্রামে পরিণত হয়েছে।
বাড়ির আঙিনা, রাস্তার ধারে কিংবা বসতবাড়ির সামনে-পেছনে ছড়িয়ে থাকা এসব নার্সারিতে চোখে পড়ে বিভিন্ন প্রজাতির গাছের চারা। ফুল, ফল, বনজ, ওষুধি ও মসলাজাতীয় গাছের পাশাপাশি বিদেশি নানা প্রজাতির ফলের চারাও উৎপাদন করা হচ্ছে। সবুজে ঘেরা এসব নার্সারি শুধু ব্যবসার কেন্দ্র নয়, বরং প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্যও হয়ে উঠেছে আকর্ষণীয় স্থান।
নার্সারি মালিকরা জানান, বর্ষাকালেই সবচেয়ে বেশি চারা বিক্রি হয়। কারণ এই সময়ে গাছ লাগালে বৃষ্টির পানির কারণে চারার বেঁচে থাকার হার অনেক বেশি থাকে। ফলে ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি সংস্থা এবং সামাজিক সংগঠনগুলোও এ সময় ব্যাপকভাবে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে থাকে।
এ বিষয়ে গদাইপুর এলাকার স্থানীয় সৌমিতা নার্সারির মালিক দীপংকর অধিকারী জানান, কেবল বর্ষা মৌসুমেই গদাইপুর এলাকার নার্সারিগুলোতে প্রায় একশ’ কোটি টাকার গাছের চারা বিক্রি হয়। আর পুরো বছর মিলিয়ে এই বিক্রির পরিমাণ প্রায় দেড় থেকে দুইশ’ কোটি টাকারও বেশি।
তিনি বলেন, বছরের প্রতিদিনই অনলাইন ও সরাসরি বিক্রি মিলিয়ে প্রায় দশ লাখ টাকার চারা বিক্রি হয়। বর্ষা মৌসুমে এই বিক্রির পরিমাণ কয়েকগুণ বেড়ে যায়। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে পাইকারি ও খুচরা ক্রেতারা এখানে এসে চারা সংগ্রহ করেন।
তিনি আরও জানান, বর্তমানে দেশীয় ফলের পাশাপাশি বিদেশি ফলের চারার চাহিদাও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এখানকার নার্সারিগুলোতে সিডলেস লেবু, মালটা, ক্যারেলা নারিকেল, স্ট্রবেরি, রাম্বুটান, ড্রাগন, থাই পেয়ারা, সফেদা, কতবেল, আশফল, লিচু, সুপারি, নারকেলসহ ৪০ থেকে ৫০ প্রজাতির বিদেশি ফলের চারা উৎপাদন করা হচ্ছে। এসব চারা দেশের বগুড়া, লালমনিরহাট, বাগেরহাট, নড়াইল, চট্টগ্রাম, সিলেট, রংপুর, দিনাজপুর, রাজশাহী, বরিশাল, কুমিল্লাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় নিয়মিত পাঠানো হচ্ছে। পাশাপাশি পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে এ চারা রপ্তানি করা হয় বলে জানান নার্সারি ব্যবসায়ী দীপংকর অধিকারী।
শুধু ফলের চারাই নয়, চুইঝাল, দারুচিনি, তেজপাতা, গোলমরিচ, এলাচ, লবঙ্গসহ বিভিন্ন মসলাজাতীয় গাছের চারারও ব্যাপক উৎপাদন ও বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া আম, কাঁঠাল, জাম, পেয়ারা, আমড়া, জলপাই, কৃষ্ণচূড়া, রাধাচূড়া, মেহগনি, আকাশমনি, নিম, বকুল, শিমুলসহ বিভিন্ন বনজ ও সৌন্দর্যবর্ধনকারী গাছের চারারও রয়েছে ব্যাপক চাহিদা।
নার্সারিগুলো ঘুরে দেখা যায়, কোথাও শ্রমিকরা আগাছা পরিস্কার করছেন, কোথাও চারায় পানি দিচ্ছেন। কেউ নতুন চারা বস্তা ও পলিব্যাগে প্রতিস্থাপন করছেন, আবার কেউ ট্রাক, পিকআপ ও ভ্যানে করে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে চারার চালান পাঠাতে ব্যস্ত। মূলত, বড় চারাগুলো বস্তার ব্যাগে ও ছোট চারাগুলো পলিব্যাগে উৎপাদন করায় পরিবহন সহজ হয় এবং চারার ক্ষতির আশঙ্কাও কম থাকে।
স্থানীয় নার্সারি ব্যবসার সঙ্গে জড়িতরা জানায়, এটি শুধু ব্যবসার ক্ষেত্রই নয়, বরং স্থানীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। শত শত পরিবারের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে এই খাতকে ঘিরে। বছরের বিভিন্ন সময়ে শ্রমিক, পরিবহনকর্মী, মাটি ও সার সরবরাহকারী, বস্তা ও পলিব্যাগ ব্যবসায়ীসহ নানা পেশার মানুষের জীবিকা নির্ভর করছে নার্সারি শিল্পের ওপর।
উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা এসএম মনিরুল হুদা বলেন, নার্সারি ব্যবসা বর্তমানে একটি সম্ভাবনাময় ও লাভজনক কৃষিভিত্তিক উদ্যোগ। পরিকল্পিতভাবে নার্সারি গড়ে তুললে একজন উদ্যোক্তা সহজেই স্বাবলম্বী হতে পারেন। পাশাপাশি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলা এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে বৃক্ষরোপণের বিকল্প নেই বলেও জানান তিনি।
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসার ওয়াসিউজ্জামান চৌধুরী বলেন, বর্ষাকাল গাছ লাগানোর সবচেয়ে উপযুক্ত সময়। এ সময় রোপণ করা চারার বেঁচে থাকার হার বেশি হওয়ায় সবাইকে নিজ নিজ বাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, রাস্তার ধারে ও খালি জায়গায় বেশি বেশি গাছ লাগানোর আহ্বান জানিয়েছেন উপজেলা প্রশাসনের এ কর্মকর্তা।