শাহারুল ইসলাম ফারদিন
, যশোর
পাট জাগ দেওয়া, আঁশ ছাড়ানো ও শুকানোর কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন যশোরের কৃষকরা। মাঠে কোথাও পাট কাটা চলছে, কোথাও চলছে জাগ দেওয়া। তবে, সোনালি আঁশ ঘরে তোলার এই মৌসুমেও স্বস্তি নে কৃষকরে। উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, অসময়ের ভারী বৃষ্টি, জলাবদ্ধতা, অপরিপক্ক অবস্থায় পাট কাটতে বাধ্য হওয়া এবং বাজারে প্রত্যাশিত দাম না পাওয়ার আশঙ্কা করছেন কৃষকরা।
চলতি বছর যশোর জেলায় ২৪ হাজার ৪০০ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে। প্রতি হেক্টরে প্রায় সাড়ে তিন টন ফলনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। সেই হিসাবে লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী মোট উৎপাদন দাঁড়াতে পারে প্রায় ৮৫ হাজার ৪০০ টন। তবে মাঠপর্যায়ে আবহাওয়া ও জলাবদ্ধতার প্রভাবে কিছু এলাকায় ফলন কমেছে। বিশেষ করে কেশবপুরের নিম্নাঞ্চলে ভারী বর্ষণের পর পাটের ক্ষেত পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় ক্ষতির পরিমাণ বেড়েছে।
কেশবপুর উপজেলা কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে উপজেলায় ছয় হাজার ছয়শ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে জলাবদ্ধতায় ৬৬ হেক্টর জমির পাট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রতি হেক্টর জমিতে লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী প্রায় তিন দশমিক ১৫ টন পাট উৎপাদন ধরা হলে ৬৬ হেক্টর জমিতে সম্ভাব্য উৎপাদন ছিল প্রায় ২০৮ টন। অর্থাৎ শুধু ক্ষতিগ্রস্ত ওই জমি থেকেই কয়েকশ টন পাটের সম্ভাব্য উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
কৃষকরা বলছেন, ক্ষতির হিসাব শুধু ক্ষেত নষ্ট হওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। পাট চাষের শুরু থেকেই তাদের উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে। বীজ, সার, জমি প্রস্তুত, আগাছা পরিষ্কার, সেচ, শ্রমিকের মজুরি এবং পাট কাটা ও জাগ দেওয়ার খরচ মিলিয়ে বিঘাপ্রতি ব্যয় অনেক ক্ষেত্রে ১০ হাজার টাকা থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত উঠেছে। পানির অভাবে দূরের স্থানে পাট নিয়ে জাগ দিতে হলে পরিবহন ও শ্রমিক বাবদ বাড়তি খরচ হচ্ছে। আবার জলাবদ্ধ এলাকায় পানি জমে থাকায় পাট কাটতেও স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি সময় ও শ্রম লাগছে।
কেশবপুরের নিম্নাঞ্চলের কৃষকদের বড় একটি অংশ এবার নির্ধারিত সময়ের আগেই পাট কাটতে বাধ্য হয়েছেন। কৃষি বিভাগের হিসাবে পাট বপনের প্রায় ১২০ দিন পর পরিপক্ক হয়। ভাদ্র মাসের শেষ দিকে কাটলে পাট পরিপক্ক হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ক্ষেতের পানি বেড়ে যাওয়ায় অনেক কৃষক আগেভাগেই পাট কেটে ফেলেছেন। এতে আঁশের মান ও ফলন দুটোই কমার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
একইসঙ্গে বাজারদর নিয়েও রয়েছে অনিশ্চয়তা।
কৃষকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে প্রতিমণ পাট দুই হাজার ৮০০ টাকা থেকে তিন হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত দরে বিক্রি হচ্ছে। উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে বর্তমান বাজারদরের সামঞ্জস্য নেই। ফলে ভালো ফলন হলেও কাঙ্ক্ষিত আয় হচ্ছে না।
সদরের বিজয় নগর গ্রামের বিষু কর্মকর বলেন, সার, জমি প্রস্তুত, বীজ, সেচ ও শ্রমিকের মজুরি মিলিয়ে বিঘাপ্রতি প্রায় ১০ হাজার টাকা খরচ হচ্ছে। বৃষ্টির কারণে ফলন কমেছে। আবার পাট কাটার সময় শ্রমিকের মজুরি ও পরিবহন খরচও বেড়েছে। প্রতিমণ দুই হাজার ৮০০ টাকা থেকে তিন হাজার ২০০ টাকা দরে বিক্রি করলে সব খরচ বাদ দিয়ে কাঙ্ক্ষিত লাভ থাকে না।
সদরের ডাকাতিয়া গ্রামের রবিউল ইসলাম বলেন, এবার পাটের ফলন মাঠে ভালো দেখা গেলেও খরচ অনেক বেড়েছে। পাট কাটার পর জাগ দেওয়ার জন্য অনেক জায়গায় পানি পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে দূরের জায়গায় পাট নিয়ে যেতে হচ্ছে। এতে পরিবহন ও শ্রমিকের জন্য বাড়তি টাকা দিতে হচ্ছে। বাজারে দাম যদি উৎপাদন খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হয়, তাহলে ভালো ফলন করেও কৃষকের লাভ হবে না।
কেশবপুরের পাজিয়া গ্রামের কৃষক আব্দুস সালাম বলেন, অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে অনেক জমিতে পাট পানির নিচে চলে গেছে। নির্দিষ্ট সময়ে একজন শ্রমিক যে পরিমাণ পাট কাটতে পারেন, পানির মধ্যে তার চেয়ে অনেক কম পাট কাটতে পারছেন। ফলে শ্রমিকের খরচ বাড়ছে। অপরিপক্ক পাট কাটায় আঁশের মানও ভালো হচ্ছে না। এই অবস্থায় ন্যায্য দাম না পেলে কৃষকের লোকসান হবে।
কৃষি বিভাগের তথ্য, গত বছর কেশবপুরে ছয় হাজার ৭০ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছিল। চলতি বছর পাটের দাম ভালো থাকায় আবাদ বাড়িয়ে ছয় হাজার ৫৮৫ হেক্টর জমিতে পাট চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। বাস্তবে আবাদ হয়েছে ছয় হাজার ৬০০ হেক্টর জমিতে। অর্থাৎ, লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১৫ হেক্টর বেশি এবং গত বছরের তুলনায় ৫৩০ হেক্টর বেশি জমিতে পাট আবাদ হয়েছে। চলতি বছর উপজেলায় পাট উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২০ হাজার ৮০৫ মেট্রিক টন। সম্ভাব্য বাজারমূল্য প্রায় ১৬০ কোটি ২০ লাখ ৪৭ হাজার টাকা।
এই হিসাব অনুযায়ী লক্ষ্যমাত্রার প্রতি টন পাটের গড় মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ৭৬ হাজার ৯৫৬ টাকা। প্রতি মণ ৪০ কেজি হিসাবে এটি প্রতি মণে প্রায় তিন হাজার ৭৮ টাকা।
কেশবপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, জলাবদ্ধতায় ৬৬ হেক্টর জমির পাট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পানির কারণে অনেক কৃষক আগেভাগেই পাট কেটে ফেলছেন। পাটের দাম ভালো থাকলেও তারা ভালো ফলন থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
যশোর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. মোশাররফ হোসেন বলেন, অন্যান্য বছরের তুলনায় চলতি বছর পাটের ফলন অত্যন্ত ভালো। কৃষকরা ভালো দামও পাচ্ছেন। সরকারিভাবে যে পাট ক্রয়কেন্দ্রগুলো রয়েছে, সেগুলো আরও কার্যকর করা হলে এবং বিভিন্ন পাটকলের মাধ্যমে পাট কেনা হলে কৃষকরা তাদের কাঙ্ক্ষিত মূল্য পাবেন বলে মনে করি।