রূপক মুখার্জি
, লোহাগড়া (নড়াইল)
বর্ষা মৌসুমে নড়াইলের বিভিন্ন এলাকার বিলের পানিতে হাঁস পালনে ঝুঁকছেন বেকার তরুণরা। এসব মৌসুমি খামারিরা মাত্র ছয়-সাত মাস হাঁস পালন করে বছরে আয় করছেন দুই থেকে দশ লাখ টাকা। প্রতি মৌসুমে খামারিরা প্রায় দেড় কোটি হাঁসের ডিম উৎপাদন করছেন, যার বাজারমূল্য ২২ কোটি টাকার বেশি।
জেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, নড়াইলে প্রতি বছর প্রায় সাড়ে ১৩ কোটি হাঁস-মুরগির ডিম উৎপাদন হয়। এর মধ্যে কেবল হাঁসের ডিমই প্রায় দেড় কোটি, বর্তমানে যার বাজারমূল্য অন্তত ২২ কোটি টাকা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রতিদিন সকালে খামার থেকে সংগৃহীত ডিম ব্যবসায়ীদের কাছে ১৫ টাকা পিস হিসেবে বিক্রি করা হয়। প্রতিটি খামারের প্রায় ৯০ শতাংশ হাঁসই নিয়মিত ডিম পাড়ে। বছরে টানা সাত-আট মাস পর্যন্ত এসব খামার থেকে পর্যাপ্ত ডিম পাওয়া যায়, যা স্থানীয় ও জাতীয় অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখছে।
কৃষিপ্রধান জেলা নড়াইলের আয়তন ৯৬৮ বর্গকিলোমিটার। প্রায় আট লাখ মানুষের বসবাস এ জেলা বিল ও মাছের ঘেরবেষ্টিত। এ জনপদের মানুষের প্রধান জীবিকার উৎস কৃষিকাজ ও মৎস্য চাষ। জেলায় তেমন কোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে না ওঠায় ৮২ শতাংশ মানুষ কৃষিকাজের ওপর নির্ভরশীল। বিসিক শিল্প নগরীবিহীন এ জেলায় ব্যাপক সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও তেমন কোনো উদ্যোক্তা গড়ে ওঠেনি। তবে বেশ কয়েক বছর ধরে নিজ উদ্যোগে তিন শতাধিক কৃষক ও তরুণ বর্ষা মৌসুমে অস্থায়ী খামার করে হাঁস পালন করছেন।
জেলার লোহাগড়া উপজেলার সরশুনা গ্রামের খামারি মো. তুহিন শেখ। পাঁচ বছর আগে তিনি দেড়শ’ হাঁস নিয়ে খামার শুরু করেন। ওই বছর তার লাভ হয় লক্ষাধিক টাকা। প্রতি বছর তার খামার বড় হচ্ছে। বর্তমানে তার খামারে হাঁসের সংখ্যা চার শতাধিক। এ বছর তিনি অন্তত তিন লাখ টাকা লাভের আশা করছেন।
একই এলাকার খামারি আলিম মোল্যা জানান, একসময় কৃষিকাজ করে সংসার চালাতেন। কৃষিকাজে তেমন লাভ হচ্ছিল না। এক প্রতিবেশীর পরামর্শে তিন বছর আগে শুরু করেন বর্ষা মৌসুম হাঁসের খামার। প্রথম বছরে মাত্র দুইশ’ হাঁস দিয়ে শুরু। লাভ ভালো হওয়ায় প্রতিবছর খামারে হাঁসের সংখ্যা বাড়িয়েছেন। বর্তমানে তার খামারে হাঁসের সংখ্যা প্রায় সাড়ে তিনশ’। প্রতিদিন এ খামার থেকে তিনশ’ ডিম উৎপাদন হচ্ছে। চলতি মৌসুমে অন্তত তিন লাখ টাকা লাভের আশা করছেন তিনি।
জেলার লোহাগড়া, কালিয়া ও সদর উপজেলার ইছামতি, শোলপুর, কলোড়া, কুমড়ির বিল, পাটেশ্বরী, সরশুনাসহ ১৫-১৬টি বিলের আশপাশের গ্রামের অসংখ্য কৃষক ও যুবক এভাবে অস্থায়ী খামার করে হাঁস পালন করছেন।
কৃষকরা জানান, প্রতিদিন সকালে বিলের মধ্যে হাঁস ছেড়ে দেন তারা। সারাদিন বিলের পানিতে দল বেঁধে ঘুরে বেড়ায় হাঁস। বিলে থাকা প্রাকৃতিক খাবার খায় আর বিল ভরা পানিতে মনের আনন্দে খেলা করে। সন্ধ্যার আগে একসঙ্গে আবার খামারে ফেরে।
কালিয়া উপজেলার চাঁচুড়ি বিল এলাকার কৃষক আসলাম শেখ বলেন, এলাকার প্রতিটি ঘরে হাঁস পালন করা হয়। মূলত ডিম উৎপাদনের জন্য হাঁস পালন করা হচ্ছে। খামারের প্রায় ৯০ শতাংশ হাঁস প্রতিদিন ডিম দেয়। বছরের সাত-আট মাস এসব হাঁস ডিম পাড়ে।
শোলপুর গ্রামের খামারি মো. জিহাদ বলেন, প্রতিবেশী বড় ভাইদের দেখে পাঁচ বছর আগে দুইশ’ হাঁস নিয়ে খামার শুরু করি। প্রথম বছরই ভালো লাভ হয়। প্রতি বছর খামারে হাসের সংখ্যা বাড়িয়েছি। বর্তমানে হাঁসের সংখ্যা এক হাজার ২০০। আশা করছি, এ বছর ছয়-সাত লাখ টাকা লাভ হবে।
একই গ্রামের খামারি হাসান আলী বলেন, বিলের পানিতে হাঁস পালন করায় খাবারের খরচ নেই বললেই চলে। উৎপাদন খরচ অনেক কম ও লাভ বেশি।
রেজাউল ইসলামের বলেন, বিল অঞ্চলের প্রতিটি খামারে দুইশ’ থেকে দুই হাজারের মতো ক্যাম্বেল হাঁস রয়েছে। অস্থায়ী খামার ছাড়াও বিল এলাকার প্রতিটি বাড়িতে এ সময় হাঁস পালন করা হয়।
জেলা প্রাণিসম্পদ অফিসার ডা. রাশেদুল ইসলাম বলেন, হাঁস পালন একটি লাভজনক ব্যবসা। হাঁসের মাংস ও ডিম উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য খামারিদের প্রশিক্ষণ, কারিগরি সহযোগিতা ও ভ্যাকসিনসহ বিভিন্ন সহযোগিতা করা হয়। বর্তমানে জেলায় তিন লাখ ৫১ হাজার ৩৭টি হাঁস রয়েছে। প্রতি বছর এ জনপদে হাঁসের খামারের সংখ্যা বাড়ছে।