যশোর, বাংলাদেশ || শুক্রবার, ৯ অক্টোবর ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

বন্ধ সরকারি মৎস্য হ্যাচারি, পোনা সংকটে মেহেরপুরের চাষিরা

জুলফিকার আলী কানন

, মেহেরপুর

প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর,২০২৬, ১০:০০ এ এম
বন্ধ সরকারি মৎস্য হ্যাচারি, পোনা সংকটে মেহেরপুরের চাষিরা

মাছ চাষে অপার সম্ভাবনার জেলা মেহেরপুর। জেলার প্রায় প্রতিটি গ্রামেই কমবেশি মাছের চাষ হচ্ছে। তৈরি হয়েছে বাণিজ্যিক মাছের খামার, গড়ে উঠেছে মৎস্যনির্ভর গ্রামও। প্রতিবছর উৎপাদন হচ্ছে হাজার হাজার মেট্রিক টন মাছ। কিন্তু এই সম্ভাবনাময় খাতের অন্যতম প্রধান উপকরণ মানসম্মত রেণু ও পোনা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে সংকটে রয়েছেন চাষিরা।

জেলার দু’টি সরকারি মৎস্য হ্যাচারির একটি প্রায় ২০ বছর ধরে বন্ধ। অন্যটিও দীর্ঘদিন ধরে উৎপাদনের বাইরে। ফলে, স্থানীয় চাষিদের মানসম্মত পোনার জন্য নির্ভর করতে হচ্ছে যশোর, ঝিনাইদহ, নওগাঁ ও সান্তাহারসহ দূর-দূরান্তের বেসরকারি হ্যাচারির ওপর। এতে বাড়ছে পোনা কেনা ও পরিবহন ব্যয়। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে গিয়ে পোনা মারা যাওয়ার ঝুঁকিও থাকছে। সব মিলিয়ে বেড়ে যাচ্ছে মাছ উৎপাদনের খরচ, কমছে চাষিদের লাভ।

মেহেরপুরের গাংনী উপজেলা সরকারি মৎস্য হ্যাচারিটি ২০০৫ সাল পর্যন্ত চালু ছিল বলে জানান স্থানীয় মৎস্য উদ্যোক্তারা। সে সময় এখানে বিভিন্ন প্রজাতির মাছের রেণু ও পোনা উৎপাদন করা হতো। স্থানীয় চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি চুয়াডাঙ্গা, কুষ্টিয়াসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকাতেও সরবরাহ করা হতো এসব পোনা। কিন্তু এরপর দীর্ঘ সময় ধরে হ্যাচারিটি বন্ধ পড়ে আছে।

দীর্ঘদিনের অযত্ন ও অব্যবস্থাপনায় সরকারি এই হ্যাচারির অবকাঠামোও এখন অনেকটা পরিত্যক্ত। নষ্ট হয়ে গেছে পোনা উৎপাদনের প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি। সরকারি খামারের জমির একটি অংশও বেদখল হয়ে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। ফলে একসময় যে প্রতিষ্ঠানটি স্থানীয় মৎস্য চাষিদের ভরসার জায়গা ছিল, সেটিই এখন কার্যত অচল।

বাড়ছে খরচ, ঝুঁকি

মাছ চাষের মৌসুম শুরু হলেই মেহেরপুরের চাষিদের ব্যস্ততা বাড়ে পোনা সংগ্রহে। স্থানীয়ভাবে পর্যাপ্ত মানসম্মত পোনা না পাওয়ায় অনেকেই ছুটছেন বাইরের জেলার হ্যাচারিতে।

গাংনীর ষোলটাকা গ্রামের মাছ চাষি খাইরুল ইসলাম ৬০ বিঘা জমির পুকুরে মাছ চাষ করেন। তার ভাষ্য, রেণু-পোনা সংগ্রহের জন্য তাকে কখনো নওগাঁর সান্তাহার, আবার কখনো যশোর যেতে হয়। এতে পোনা কেনার পাশাপাশি যুক্ত হয় পরিবহন ব্যয়। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে গিয়ে পোনা মারা যাওয়ার আশঙ্কাও থাকে। কখনো কখনো গুণগত মান নিয়েও সমস্যায় পড়তে হয়।

তিনি বলেন, একসময় গাংনী সরকারি হ্যাচারি থেকেই পোনা সংগ্রহ করতেন তারা। স্থানীয়ভাবে মানসম্মত পোনা পাওয়া গেলে পরিবহন খরচ যেমন কমবে, তেমনি ঝুঁকিও কমবে। তাই দ্রুত সরকারি হ্যাচারিটি চালুর দাবি তার।

ষোল টাকা গ্রামের রেণু-পোনা ব্যবসায়ী ইব্রাহিম হোসেন প্রতি মৌসুমে প্রায় ৩০ থেকে ৪০ লাখ টাকার পোনা নওগাঁর সান্তাহার ও যশোর থেকে সংগ্রহ করে স্থানীয় চাষিদের কাছে বিক্রি করেন। তার মতে, দূর থেকে পোনা আনতে গিয়ে একদিকে পরিবহন খরচ বাড়ছে, অন্যদিকে রয়েছে পথে দুর্ঘটনা, অর্থের নিরাপত্তা এবং পোনার মৃত্যুর ঝুঁকি।

তেরাইল গ্রামের মাছ চাষি রহমত আলী বলেন, একসময় গাংনী সরকারি হ্যাচারি থেকেই বিভিন্ন জাতের সাদা মাছের মানসম্মত পোনা পাওয়া যেত। এখন হ্যাচারি বন্ধ থাকায় বেশি দাম দিয়ে দূরের জেলা থেকে পোনা আনতে হচ্ছে।

বাইরের পোনায় নির্ভরতা

গাংনী উপজেলার ষোলটাকা গ্রাম ইতিমধ্যে ‘মৎস্য গ্রাম’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। গ্রামের প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে মাছ চাষ, মাছ পরিবহন এবং মৎস্য খামারে শ্রমের সঙ্গে যুক্ত। বড় পরিসরে মাছ চাষ হলেও এই গ্রামের চাষিদেরও রেণু-পোনার জন্য নির্ভর করতে হচ্ছে বাইরের জেলার ওপর।

স্থানীয় মৎস্য উদ্যোক্তা আনসারুল ইসলাম বলেন, ২০০৫ সাল পর্যন্ত গাংনী সরকারি হ্যাচারিতে বিভিন্ন প্রজাতির মাছের পোনা উৎপাদন হতো। স্থানীয় চাহিদা পূরণের পাশাপাশি আশপাশের জেলাতেও পোনা সরবরাহ করা হতো। সরকারি উদ্যোগে হ্যাচারিটি আবার চালু করা গেলে মেহেরপুরের পাশাপাশি আশপাশের জেলার চাষিরাও উপকৃত হবেন।

তিনি অভিযোগ করেন, ঠুনকো অজুহাতে গাংনীর এই সরকারি মৎস্য হ্যাচারিটি বন্ধ রাখা হয়েছে। ইতিমধ্যে হ্যাচারির জায়গা দখল করে নিয়েছে এক শ্রেণির প্রভাবশালী। এছাড়া রেনু পোনা উৎপাদনের সাথে বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ছিল সেগুলোও খোয়া গেছে। কর্তৃপক্ষের অবহেলা আর অযত্নে সরকারি বাসভবনটিও এখন পরিত্যক্ত। ঘরের জানালা, দরজা ও মূল্যবান জিনিসপত্র চুরি হয়ে গেছে। এই ভবনটিতে এখন সন্ধ্যার পর নিয়মিত মাদকের আখড়া বসে।

মৎস্যখাতে বড় সম্ভাবনা

মৎস্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, মেহেরপুরে ১৪টি সরকারি বিল, একটি বাঁওড়, তিনটি নদী এবং প্রায় সাড়ে চার হাজার হেক্টর পুকুরে মাছ চাষ হচ্ছে। এসব জলাশয় থেকে বছরে প্রায় ১৩ হাজার মেট্রিক টন মাছ উৎপাদন হয়। জেলায় রুই, কাতলা, মৃগেল, বাটা, মনোসেক্স, গ্রাসকার্প, পাঙ্গাস ও সিলভার কার্পসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছের চাষ হচ্ছে।

চাষের পরিধি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে পোনার চাহিদাও। কিন্তু স্থানীয়ভাবে সরকারি হ্যাচারি কার্যকর না থাকায় সেই চাহিদার বড় একটি অংশ পূরণ হচ্ছে বাইরের জেলার হ্যাচারি থেকে।

চাষিদের মতে, সরকারি হ্যাচারি চালু হলে শুধু পোনা সরবরাহের সংকটই কাটবে না; কমবে পরিবহন ব্যয়, কমবে পোনা মারা যাওয়ার ঝুঁকি এবং স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত মানসম্মত পোনার সরবরাহ বাড়বে। এতে মাছ চাষের উৎপাদনশীলতা ও লাভ দু’টিই বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

মৎস্য বিভাগের বক্তব্য

মেহেরপুর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. রবিউল ইসলাম বলেন, গাংনী সরকারি হ্যাচারিটি বন্ধ থাকার পেছনে প্রধান সমস্যা হচ্ছে লোকবল সংকট, পুকুরে পর্যাপ্ত পানি না থাকা এবং প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি নষ্ট হয়ে যাওয়া। এসব কারণে দীর্ঘদিন ধরে হ্যাচারিটি উৎপাদনে নেওয়া সম্ভব হয়নি। এতে স্থানীয় মাছ চাষিরা সমস্যায় পড়ছেন।

তিনি জানান, জেলা সদরের সরকারি মৎস্য হ্যাচারিটি আগামী বছর উৎপাদনে নেওয়ার জন্য প্রস্তুতি চলছে। সরকারি দুটি হ্যাচারি কার্যকরভাবে চালু করা গেলে মেহেরপুরে মাছের উৎপাদন বাড়ার পাশাপাশি দেশীয় প্রজাতির মাছের উৎপাদনও বৃদ্ধি পাবে।

সামনে বড় বাধা

মেহেরপুরে মাছ চাষের পরিধি ও বাজার দু’টিই বাড়ছে। মৎস্য গ্রাম থেকে শুরু করে ছোট-বড় অসংখ্য খামারে চলছে বাণিজ্যিক মাছ চাষ। অথচ এই সম্ভাবনাময় খাতের অন্যতম মৌলিক উপকরণ রেণু-পোনার জন্য এখনো বাইরের জেলার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে চাষিদের।

প্রায় দুই দশক ধরে বন্ধ থাকা সরকারি হ্যাচারি যদি দ্রুত সংস্কার করে উৎপাদনে ফিরিয়ে আনা যায়, তাহলে একদিকে স্থানীয় চাষিদের পোনা সংকট দূর হবে, অন্যদিকে কমবে উৎপাদন ব্যয়। বাড়বে মাছ চাষের লাভজনকতা এবং জেলার মৎস্য অর্থনীতিতে আসতে পারে নতুন গতি।

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)