ফলোআপ: ধর্ম অবমাননার অভিযোগে পিটিয়ে হত্যা
প্রকাশ্যে দায় স্বীকার অথচ অধরা, নিহত যুবক ছিলেন ‘মাসসিক ভারসাম্যহীন’
আসাদুজ্জামান সরদার
, সাতক্ষীরা
দেবহাটায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে ফেসবুক লাইভ ও পোস্টের মাধ্যমে উসকানি ছড়িয়ে ওয়াহিদুজ্জামান শামীম নামে এক যুবককে পিটিয়ে হত্যার মূল হোতা এখনো আটক হয়নি।
এই ঘটনার মূল প্ররোচনাকারী ফজলুল হক আমিনী ফেসবুক ভিডিওতে জনতা জড়ো করা ও চিকিৎসাধীন ব্যক্তিকে হাসপাতাল থেকে ছিনিয়ে নিয়ে পিটিয়ে হত্যার দায় প্রকাশ্যে স্বীকার করেছেন। কিন্তু পুলিশ তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।
প্রকাশ্য স্বীকারোক্তি ও প্রশাসনকে চ্যালেঞ্জ করার পরও অভিযুক্ত আইনের আওতার বাইরে থাকায় স্থানীয় সচেতন নাগরিক ও নেটিজেনদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
নিহতের পরিবার ও স্থানীয়রা জানিয়েছেন, গত সোমবার সন্ধ্যায় পারিবারিক কলহের জেরে স্ত্রীর সঙ্গে কথাকাটাকাটির একপর্যায়ে মানসিক রোগাক্রান্ত ওয়াহিদুজ্জামান কিছু গালিগালাজ করেন। স্থানীয় এক ব্যক্তি সেই অডিও রেকর্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিলে তা নিয়ে দেবহাটার ফজলুল হক আমিনী ফেসবুকে লাইভ করে জনতাকে জড়ো হওয়ার আহ্বান জানান।
এরপর ‘ক্ষুব্ধ জনতা’ ওয়াহিদুজ্জামানের বাড়ি ভাঙচুর করে তাকে সুবর্ণাবাদ বাজারে এনে মারধর করে। আশঙ্কাজনক অবস্থায় বাড়িতে ফিরে তিনি বিষপান করায় তাকে কুলিয়া এলাকার এক গ্রাম্য চিকিৎসকের চেম্বারে নিয়ে ওয়াশ করানো হয়।
মঙ্গলবার রাতে ফজলুল হক আমিনীসহ একদল ‘বিক্ষুব্ধ লোক’ চিকিৎসাধীন শামীমকে ওই চেম্বার থেকে বের করে আবারও মারধর করে।
খবর পেয়ে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে সখীপুর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে দেয়। পরবর্তীতে ফজলুল হক আমিনীর নেতৃত্বে সহস্রাধিক লোক সখীপুর হাসপাতালে চড়াও হয়ে চিকিৎসাধীন ওয়াহিদুজ্জামানকে দেয়ালের সাথে আছাড় মারে এবং বাইরে এনে এলোপাতাড়ি পিটিয়ে ফেলে রেখে যায়।
পুলিশ উদ্ধার করে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
নিহতের ছোট ভাই তাহসিভ রহমান সাগর জানান, তার ভাই মাদরাসা থেকে কামেল পাস এবং জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স-মাস্টার্স সম্পন্ন করেছিলেন। পারিবারিক সমস্যার কারণে তিনি দীর্ঘ ১০-১২ বছর ধরে মানসিক ভারসাম্যহীন ছিলেন এবং চিকিৎসকের অধীনে চিকিৎসাধীন ছিলেন। মঙ্গলবার রাতে জানাজা শেষে তার দাফন সম্পন্ন হয়েছে। এই বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের বিচার চেয়ে তারা মামলা দায়েরের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
এদিকে, নিজের অবস্থান পরিষ্কার করে অভিযুক্ত ফজলুল হক আমিনী দাবি করেন, ওয়াহিদুজ্জামান দীর্ঘদিন ধরে ইসলাম নিয়ে ‘আপত্তিকর মন্তব্য’ করে আসছিলেন এবং এটি কোনো পাগলের লক্ষণ হতে পারে না। নিজের ইমানি দায়িত্ব থেকেই তিনি ফেসবুক লাইভ ও স্ট্যাটাস দিয়ে মানুষ জড়ো করার বিষয়টি স্বীকার করেছেন।
এই ঘটনায় তার ফাঁসি বা জেল হলেও কোনো পরোয়া নেই এবং তিনি বাজারে এসে প্রশাসনের জন্য অপেক্ষা করছেন বলে প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছেন। পেশাগত জীবনে তিনি পারুলিয়া বাজারের কসাইখানার দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি মোটরসাইকেল চালক সমিতির সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন।
দেবহাটা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এইচ এম শাহীন জানান, এই ঘটনায় এখন পর্যন্ত নিহতের পরিবার থেকে কোনো লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি, তবে তারা মামলা করবেন বলে পুলিশকে আশ্বস্ত করেছেন।
ফেসবুকে লাইভ ও উসকানিমূলক স্ট্যাটাসের বিষয়টি পুলিশের নজরে এসেছে। সিসিটিভি ফুটেজ ও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও বিশ্লেষণ করে জড়িতদের শনাক্তে পুলিশ ছায়া তদন্ত শুরু করেছে এবং দ্রুত আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে তিনি জানান।
মানবাধিকার কর্মী ও সাধারণ জনগণের মতে, সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ্য উসকানি দিয়ে হাসপাতাল থেকে রোগী ছিনিয়ে হত্যার পর মূল অভিযুক্ত এভাবে প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ানো আইনি কাঠামোর চরম ব্যর্থতা।
উসকানিদাতাসহ এই মব কালচারের মূল হোতাদের অবিলম্বে আটক করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় না আনলে আইনের শাসনের ওপর মানুষের আস্থা রাখা কঠিন হবে।